অনিন্দিতা দত্ত
অবিরাম বৃষ্টিতে ভাসছে দার্জিলিঙ পাহাড় ও পাহাড় লাগোয়া সমতলের শিলিগুড়ি সহ উত্তরের জেলাগুলি। এরই মাঝে রাতভর প্রবল বর্ষনে শুক্রবার ভোরে ফের মিরিকের অস্থায়ী লোহার সেতুর একাংশ ভেঙে পড়েছে। যা ২০২৫সালের অক্টোবর মাসের ৪ তারিখের রাতের সেই ভয়াবহতার কথা স্মরন করিয়ে দিয়েছে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ফের অস্থায়ী সেতুটি ভেঙে পড়ায় দুধিয়া এলাকায় প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, টানা বৃষ্টিতে নতুন করে ধস বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছে পাহাড়। কার্শিয়াঙ মহকুমার মহানদী এলাকা ধসের কবলে পড়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে প্রবল বর্ষনে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে গিয়ে মহানদীর কাছে জাতীয় সড়কের ওপরে বড় ধরনের ধস নামার খবর মিলেছে। ফলে শিলিগুড়ির সঙ্গে কার্শিয়াঙের সরাসরি যোগযোগ ব্যবস্থাও এই মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। ইতিমধ্যেই দুধিয়ার অস্থায়ী হিউমপাইপের সেতু মেরামতির কাজ শুরু করেছে পূর্তদপ্তর।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যে থেকে শুরু হয়ে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত এক নাগাড়ে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষনের জেরে কার্শিয়াঙ মহকুমার বালাসন নদী অতি খরস্রোতা হয়ে উঠেছে। ভয়ঙ্কর রূপ ধারন করেছে বালাসন। নদীর প্রবল জলচ্ছ্বাসে শুক্রবার ভোরে দুধিয়াস্থিত বালাসন নদীর ওপরে অস্থায়ী হিউম পাইপের সেতুটি ভেঙে পড়েছে। ফলে মিরিক—শিলিগুড়ি সড়কে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্নভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকদিন ধরে দার্জিলিঙ পার্বত্য এলাকা, পাহাড় লাগোয়া সমতলের শিলিগুড়ি সহ উত্তরের জেলাগুলিতে কম বেশী বৃষ্টি চলছেই। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে দার্জিলিঙ জেলার পাহাড় ও সমতলে মুষলধারে ভারি বৃষ্টি হয়। সারারাতে বৃষ্টি বিরতি ঘটেনি। ফলে বালাসনের জলস্ফীতি ঘটে। বালাসন দিয়ে জল প্রবল বেগে বইতে শুরু করে। বৃষ্টি নামতেই আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে রাত কাটছিলো বালাসন নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের। বিপদের আশঙ্কা সত্যি হলো। ভোরের দিকে নদীর জলের তোড়ে ভেসে যায় দুধিয়ার অস্থায়ী সেতুটি। পাহাড়ে বৃষ্টির জেরে জল বাড়ছে বালাসনে। দুধিয়াবাসীর আতঙ্কও বাড়ছে। শুধু তাই নয়, বৃষ্টির কারনে মহানন্দা নদীতে জলস্তর বাড়ার কারনে ১১০নম্বর জাতীয় সড়কের একাধিক জায়গা ধসে গেছে।
প্রসঙ্গত, গত ২০২৫সালের ৪ অক্টোবর রাতের প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে প্রচন্ড বৃষ্টিতে বালাসনের জলচ্ছ্বাসে মিরিক ও দুধিয়া সংযোগকারী ১৯৬৫ সালের তৈরী প্রাচীন ঐতিহাসিক লোহার সেতুটি ভেঙে পড়ে শিলিগুড়ি—মিরিক সরাসরি যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়ে পড়েছিলো। মিরিক ও দুধিয়া সংযোগকারী লোহার সেতুটির তিন নম্বর পিলারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। এমনকি সেই পরিস্থিতিতে দার্জিলিঙ শহরের সাথেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেই সময় দুধিয়ার সেতু বিপর্যয়ে আশপাশের একাধিক গ্রামের সাথে জনসংযোগ বিচ্ছিন্ন পড়ে। নদীপাড় লাগোয়া বেশ কিছু বাড়িঘর সম্পূর্ন ধসে যায়। সেতুটি দার্জিলিঙ বিভাগের রাজ্য সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছিলো। দুধিয়াতে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো। সেই পরিস্থিতিতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ১০অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করে যান চলাচল সচল রাখতে দূর্যোগ পরবর্তী পনেরো দিনের মধ্যেই বালাসন নদীবক্ষেই তৈরী করা হয় বিকল্প অস্থায়ী হিউম পাইপের সেতু। সেই অস্থায়ী সেতু দিয়েই মিরিক ও শিলিগুড়ির মধ্যে যানবাহন চলাচল করতো। যদিও খরস্রোতা বালাসনের ওপরে অস্থায়ী হিউম পাইপের সেতু নির্মানের প্রথমদিন থেকে সেতুটির পরিকাঠামোগত স্থায়ীত্ব নিয়ে প্রশ্ন ছিলোই। এক বছর পার না হতেই বর্ষার শুরুতেই এক রাতের বৃষ্টিতে সেই অস্থায়ী সেতুটিও ভেঙে পড়লো।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাষ অনুযায়ী পাহাড়ি অঞ্চলে আগামী কয়েকদিন বৃষ্টির ব্যাপকতা বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল। ফলে ধসের আশঙ্কাও বাড়ছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত পাহাড় সমতলে প্রায় ২০০মিলিলিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। রাতের দিকে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তেই পাহাড়ের গা বেয়ে বিশালাকার ধস আছড়ে পড়ে কার্শিয়াঙ মহকুমার মহানদী এলাকায় জাতীয় সড়কের ওপরে। ধসের মাটি, পাথর, পাথরের বড় বড় চাঁই জাতীয় সড়কের ওপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকায় ওই রাস্তায় যানবাহন চলাচল পুরোপুরিভাবে বন্ধ রয়েছে। ফলে শিলিগুড়ি থেকে কার্শিয়াঙ ও দার্জিলিঙ গামী সমস্ত ছোট বড় যানবাহন বিভিন্ন প্রান্তে আটকে পড়েছে। ভোগান্তি বাড়ছে সাধারন মানুষ সহ নিত্যযাত্রীরা। চরম হয়রানির মুখে পড়েছেন পর্যটকরা। পর্যটকদের আটকে থাকার খবর মিলেছে। বৃষ্টি চলছেই। ফলে অবিরাম পাহাড়ের গা বেয়ে কম বেশী ধস নামছেই।
গত কয়েকদিন ধরেই উত্তরবঙ্গে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত চলছে। আগামী ২৪ঘন্টা পাহাড়ে বৃষ্টির তীব্রতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনার কথাই আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানানো হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরেই বৃষ্টি চলছে পাহাড় জুড়ে। আগামী কয়েকদিনও ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাষ জারি করা হয়েছিলো। আবহাওয়া দপ্তরের পক্ষ থেকে দার্জিলিঙ ও কালিম্পঙের উঁচু পার্বত্য এলাকায় ভারি থেকে অতিভারি বর্ষনের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। পার্বত্য এলাকার পাশাপাশি সমতলেও অস্বাভাবিক বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিলোই।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মহানন্দার ফুলবাড়ি ব্যারেজের একাধিক লকগেট খুলে দেওয়া হয়। প্রবল গতিতে জল বইতে থাকে। বৃষ্টিতে তিস্তা নদী ফুঁসছে। তিস্তা নদীই নয়, মহানন্দা, জলঢাকা সহ উত্তরের জেলাগুলির বিভিন্ন নদীতে জল বেড়েছে। হু হু করে জল বয়ে চলেছে। প্রবল বৃষ্টিতে শিলিগুড়িতে জনজীবন একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাতভরের বৃষ্টিতে শিলিগুড়ি শহরের ১৩নম্বর ওয়ার্ড, শহরের ৪৬নম্বর ওয়ার্ডের চম্পাসারির বিস্তীর্ন এলাকা সহ রাজীবনগর, ঢাকনিকাটা সহ একাধিক ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বাড়িঘরে জল ঢুকে পড়েছে। শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়িতে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মাটিগাড়া সহ বিস্তীর্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।
Comments :0