রাজ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, রুগ্ন শিল্প এবং চা-শ্রমিকদের বঞ্চনার অবসান ঘটাতে বামপন্থীদের শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। সোমবার জলপাইগুড়ি জেলার দুটি পৃথক কর্মীসভায় দাঁড়িয়ে এই ভাষাতেই তৃণমূল ও বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ শানালেন সিপিআই(এম) নেতা তথা এসএফআই-এর সর্বভারতীয় সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য। তাঁর সাফ কথা, "তৃণমূল ও বিজেপি আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। যারা তৃণমূলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বিজেপিকে বিকল্প ভাবছেন, তাঁরা ভুল করছেন। বিজেপিকে দুর্বল না করলে তৃণমূলকে শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।"
এদিন সিপিআই(এম)’র ডাকে দুপুরে রাজগঞ্জ বিধানসভার বেলাকোবা বাজারে এবং বিকেলে ময়নাগুড়িতে বামফ্রন্টের ডাকে কর্মীসভা আয়োজিত হয়। দুটি সভাতেই সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজগঞ্জের সভায় সৃজন ভট্টাচার্য ছাড়াও বক্তব্য রাখেন পার্টির জেলা সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য কৌশিক ভট্টাচার্য। উপস্থিত ছিলেন জেলা সম্পাদক পীযুষ মিশ্র, জেলা কমিটির সদস্য রিনা সরকার, রতন রায় সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। সভায় সভাপতিত্ব করেন মোক্তাল হোসেন।
অন্যদিকে, ময়নাগুড়ির সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন সিআইটিইউ নেতা তথা পার্টির রাজ্য সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য জিয়াউল আলম এবং সৃজন ভট্টাচার্য। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পীযুষ মিশ্র, জ্যোতিপ্রকাশ ঘোষ, প্রকাশ রায়, সন্তোষ সরকার, নরেশ চন্দ্র রায় সহ বামফ্রন্টের জেলা ও লোকাল নেতৃবৃন্দ। সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ বাম নেতা হরিহর রায় বসুনীয়া।
রাজগঞ্জ ও ময়নাগুড়ির সভা থেকে তৃণমূল এবং বিজেপি উভয় শক্তির বিরুদ্ধেই তীব্র আক্রমণ শানান বাম নেতৃত্ব। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বাম প্রতিনিধিরা স্পষ্ট জানান, মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এবং ভোটার তালিকায় নাম বাদ দেওয়ার নামে যে হয়রানি বিজেপি চালাচ্ছে, সাধারণ মানুষ তা আর মেনে নেবে না। বক্তব্য রাখতে গিয়ে সৃজন অভিযোগ করেন, রাজ্যে তৃণমূলের আকাশছোঁয়া দুর্নীতির পরেও কেন তারা টিকে আছে, তা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। দিল্লির বিজেপি নেতৃত্ব চায় না এ রাজ্যে বামপন্থীরা বিকল্প শক্তি হিসেবে উঠে আসুক। তিনি বলেন, "ওরা চায় তৃণমূল প্রথম হোক আর বিজেপি দ্বিতীয়; যাতে বামপন্থীরা কোনোভাবেই জনসমক্ষে মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে। এটা আসলে দুই দলের গটআপ গেম।"
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপির মধ্যে গোপন আঁতাতের অভিযোগ তুলে সৃজন ভট্টাচার্য বলেন, মমতা ব্যানার্জি বিজেপিকে সন্তুষ্ট করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চান। তিনি ব্যাখ্যা করেন, মুখ্যমন্ত্রীর সাথে কেন্দ্রের এক অলিখিত চুক্তি হয়েছে যার মূল লক্ষ্য হলো ‘ভাইপো’কে বাঁচানো এবং দুর্নীতির তদন্ত রোখা। বিনিময়ে বামপন্থীদের ঠেকিয়ে রেখে বিজেপির জন্য রাজনৈতিক জমি ছেড়ে দেওয়া এবং সরকারি টাকায় বিভাজনের রাজনীতিকে মদত দেওয়া হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সৃজন বলেন, "যারা মধ্যপ্রদেশে ব্যাপম কেলেঙ্কারি করেছে কিংবা পিএম কেয়ার্স নিয়ে দুর্নীতিতে লিপ্ত, তাদের দিয়ে এরাজ্যের কয়লা, বালি, গরু বা শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়। চোর ধরতে এবং তৃণমূলের দুর্নীতিবাজদের শ্রীঘরে পাঠাতে লাল ঝান্ডাকেই জয়যুক্ত করতে হবে।" তিনি আরও যোগ করেন, বিজেপিকে বাংলা ছাড়া করলেই বামপন্থীরা শক্তিশালী হবে এবং তবেই "তৃণমূলের গলার ভিতর হাত ঢুকিয়ে দুর্নীতির টাকা বের করে আনা যাবে।"
জিয়াউল আলম তাঁর বক্তব্যে চা-বলয়ের শ্রমিকদের দুর্দশা ও মজুরি বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বামপন্থীরা রাজনীতির ময়দানে থাকা মানেই রুটি-রুজি, জিনিসের দাম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ১০০ দিনের কাজের অধিকারের লড়াই সামনে আসা। আর এই জনস্বার্থের ইস্যুগুলোকে ধামাচাপা দিতেই দুই পক্ষ মিলে হিন্দু-মুসলমান, মন্দির-মসজিদ এবং ভারত-বাংলাদেশ ভাগাভাগির রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এদিনের সভা থেকে বাম নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দেন যে, আসন্ন লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার হবে মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। তৃণমূলের ‘লুঠতরাজ’ এবং বিজেপির ‘সাম্প্রদায়িক বিভাজনের’ বিরুদ্ধে লাল ঝান্ডাই সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা।
CPIM
ময়নাগুড়ি, রাজগঞ্জে নির্বাচনী কর্মীসভা সিপিআই(এম)’র
×
Comments :0