ডাঃ ফুয়াদ হালিম
দাবি করা হয় যে গত এক দশকে ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেছে। তার যে কিছুটা বাস্তবতা নেই এমনটা নয়। সরকার হাসপাতাল, স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প এবং স্বাস্থ্য কাঠামোয় বিনিয়োগ করেছে, স্বাস্থ্যে কর্পোরেটের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বিপুল হারে। যেকারণে স্বাস্থ্যে বিজ্ঞাপনের বহর বেড়েছে। বিভিন্নভাবে জনপরিসরেও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য এক গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতার ইঙ্গিত করেছে: বর্তমানে ভারতে প্রায় অর্ধেক মৃত্যুই প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর চিকিৎসা-পর্যবেক্ষণ ছাড়াই ঘটছে। অর্থাৎ চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুর বৃদ্ধি ঘটছে।
সাম্প্রতিক নমুনা নিবন্ধন ব্যবস্থা (Sample Registration System বা SRS)-এর পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে ২০২৪ সালে নথিভুক্ত মোট মৃত্যুর ৪৫.৫ শতাংশই প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মীর তত্ত্বাবধান ছাড়াই ঘটেছে। কোভিড-১৯ মহামারীর সূচনার পর থেকে এই সমস্যা শুধু বৃদ্ধি পেয়েছে তাই নয়, বহু বছর ধরে তা স্থায়ীও হয়ে রয়েছে। এই বৃদ্ধির মাত্রা এতটাই তীব্র যে তা শুধুমাত্র জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যু বলতে এমন এক বিষয় বোঝানো হয় যাঁরা মৃত্যুর সময় কোনও প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর চিকিৎসা পাননি, অথবা যাঁদের শেষ চিকিৎসা শুধুমাত্র অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের দ্বারা করা হয়েছিল অথবা চিকিৎসার সুযোগই পাননি। যদিও এই ধরনের বহু মৃত্যু বাড়িতেও ঘটে, তবুও এই তথ্য বৃহত্তর স্বাস্থ্যসেবা-প্রাপ্তি ও ব্যবহারের ব্যর্থতার দিকও ইঙ্গিত করে।
এই সঙ্কটের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে। ২০২০ ও ২০২১ সালে ভারতের হাসপাতালগুলি করোনা রোগীতে উপচে পড়েছিল। বিপুল সংখ্যক শয্যা কোভিড রোগীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল, নিয়মিত অস্ত্রোপচার স্থগিত করা হয়েছিল, বহির্বিভাগীয় পরিষেবা সীমিত করা হয়েছিল এবং সংক্রমণের ভয়ে বহু মানুষ হাসপাতাল এড়িয়ে চলেছিলেন।
যেসব রোগীর ধারাবাহিক চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল, বিশেষত ডায়ালিসিস-নির্ভর রোগীরা, তাঁরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন কারণ লকডাউনের সময় গণপরিবহণ বন্ধ ছিল। পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়মিত হেমোডায়ালিসিস-নির্ভর দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগীদের প্রায় ২৫ শতাংশকে চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতা থেকে হারিয়ে ফেলা হয়েছিল। বহু ক্যানসার রোগী সময়মতো কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও ফলো-আপ চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেননি। নতুন ক্যানসার রোগীরাও সময়মতো রোগ নির্ণয়ের সুযোগ না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই রোগের পর্যায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল হয়ে ওঠে, যার ফলে এড়ানো সম্ভব ছিল এমন মৃত্যুহার ও রোগভোগ বৃদ্ধি পায়।
নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থা (Civil Registration System)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে ২০২০ সালে নথিভুক্ত মৃত্যুর ৪৫ শতাংশই চিকিৎসা ছাড়াই ঘটেছিল, যেখানে ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৩৪.৫ শতাংশ। একই সময়ে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে অবশ্য মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কারণ সেই সময় মানুষ চিকিৎসা কেন্দ্রেই পৌঁছেচ্ছিলেন না। চিকিৎসা কেন্দ্রের অবস্থাও তখন সংকটময়। এই তথ্যগুলি মহামারীর সময় সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার উপর যে বিপর্যয় নেমে এসেছিল তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মহামারী কমে যাওয়ার পরেও চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুর এই উচ্চ হার কমেনি। বরং ২০২১ সালের পর থেকে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই এখনও চিকিৎসা পরিষেবার বাইরে থেকেই ঘটছে। এর থেকে বোঝা যায় যে মহামারী ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলিকে শুধু উন্মোচিতই করেনি, বরং আরও গভীর করেছে।
সবচেয়ে বেশি চাপ গ্রামীণ ভারতের উপর। তথ্যগুলি তীব্র ভৌগোলিক বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরে। ২০২৪ সালে গ্রামীণ ভারতে ৪৮.৯ শতাংশ মৃত্যু প্রশিক্ষিত চিকিৎসা-সেবার বাইরে ঘটেছে, যেখানে শহরাঞ্চলে এই হার ছিল ৩৬.১ শতাংশ। এই পার্থক্য দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য কাঠামোর বৈষম্য, চিকিৎসকের অভাব, পরিবহণ সমস্যা এবং জরুরি পরিষেবার সীমাবদ্ধতাকে প্রতিফলিত করে।
গ্রাম ভারতে এখনও চিকিৎসক, নার্স, রোগনির্ণয় কেন্দ্র এবং অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার বিপুল ঘাটতিতে ভুগছে। এমনকি যেখানে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে, সেখানেও বহু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কর্মী বা সরঞ্জামের অভাব দেখা যায়। বহু পরিবারের জন্য জেলা হাসপাতালে পৌঁছতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ পেরোতে হয়। তাতে বিপুল অর্থব্যয় হয়।
ভারতে স্বাস্থ্যব্যয়ের ব্যক্তিগত বোঝা সবচেয়ে বেশি। যা বিশ্ব তালিকার প্রথম দিকে। অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্র বা কৃষিনির্ভর পরিবারের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অনেক সময়ই আর্থিক বিপর্যয়ের সমান। ফলে অনেকেই চিকিৎসা নিতে দেরি করেন অথবা সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসা পরিষেবার বাইরে থেকে যান।
রাজ্যভিত্তিক বৈষম্যও প্রবল। এই সমস্যা গোটা দেশে সমানভাবে বিস্তৃত নয়। SRS রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিহারে চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুর হার ছিল সর্বোচ্চ—৬৭.৮ শতাংশ। ঝাড়খণ্ডে এই হার ছিল ৬১.৮ শতাংশ এবং ছত্তীসগড়ে ৬০.৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, কেরলে এই হার ছিল সর্বনিম্ন—২৬.৮ শতাংশ। এরপর রয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর, যেখানে হার ২৯.২ শতাংশ।
এই পার্থক্যগুলি জনস্বাস্থ্য বিনিয়োগ, শিক্ষার হার, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক এবং সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নের বৈষম্যকে প্রতিফলিত করে। কেরলের তুলনামূলকভাবে উন্নত স্বাস্থ্য সূচক দেখায় যে পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা থাকলে চিকিৎসা-সেবাবিহীন মৃত্যু কমানো সম্ভব।
ভারতের স্বাস্থ্য-অগ্রগতির ঘটনাক্রমে এক গভীর বৈপরীত্য রয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির সম্প্রসারণের পরও চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।
গত এক দশকে ভারত স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প, হাসপাতাল নির্মাণ কর্মসূচি, ডিজিটাল স্বাস্থ্য মিশন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের মতো একাধিক বড় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের উপস্থিতিতে চিকিৎসা হলে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে তথ্য সেকথাও বলছে।
এর থেকে প্রমাণ হয় যে, কেবল পরিকাঠামো নির্মাণ করলেই স্বাস্থ্যসেবা মানুষের নাগালে পৌঁছে যায় না। আর্থিক প্রতিবন্ধকতা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অসম বণ্টন, প্রশিক্ষিত কর্মীর ঘাটতি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা—সবই এর কারণ হতে পারে। সবচেয়ে বড় বাধা স্বাস্থ্যে বানিজ্যিকিকরণ, ফলে স্বাস্থ্য পরিষেবা চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে।
সরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প, যেমন আয়ুষ্মান ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যসাথী, নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে যে ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক ৪০ শতাংশ মানুষ এই প্রকল্পগুলির পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন না। প্রকল্পগুলির ব্যবহার দেশের বিদ্যমান শ্রেণি ও জাতভিত্তিক বৈষম্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একইসঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যখাতের অর্থের একটি অংশ এই বিমাভিত্তিক প্রকল্পগুলিতে সরিয়ে নেওয়ায় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুণমান ও বিস্তারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রধান ভরসা ছিল এই সরকারি হাসপাতালগুলিই। SRS-এর তথ্য ইঙ্গিত করছে যে গুরুতর ও মরণাপন্ন অসুস্থতার ক্ষেত্রে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি দরিদ্র মানুষের আস্থা কোভিড-পরবর্তী সময়েও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি।
মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের সঙ্কট
চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুর বৃদ্ধি ভারতের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত—মৃত্যুর চিকিৎসাগত কারণের যথাযথ নির্ধারণের অভাব। সরকারি তথ্য বারবার দেখিয়েছে যে ভারতে মোট মৃত্যুর মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশের চিকিৎসাগত কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে দেখানো হয়। ফলে নীতিনির্ধারকদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব থাকে—মানুষ কেন মারা যাচ্ছে, কোথায় স্বাস্থ্য হস্তক্ষেপ জরুরি, কিংবা কোন রোগ সবচেয়ে বেশি প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে জানা যায় না।
স্বাভাবিকভাবেই যখন মৃত্যু স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাইরে ঘটে, তখন সেগুলির বিস্তারিত চিকিৎসাগত অনুসন্ধানও হয় না। এর ফলে রোগ নজরদারি দুর্বল হয়, মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিকৃত হয় এবং জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা ব্যাহত হয়। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় অতিরিক্ত মৃত্যুহার নিয়ে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছিল, তা ভারতের মৃত্যু সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা ও চিকিৎসাগত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল।
পরিসংখ্যানের বাইরে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও জড়িত। চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুর বৃদ্ধি কেবল একটি প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এখানে মূলত সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠে যায়। স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আয়, জাত, লিঙ্গ, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যারা চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুবরণ করেন, তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই দরিদ্র, প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা, একাকী প্রবীণ ব্যক্তি অথবা সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য। এই মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা এখনও একটি মৌলিক অধিকার নয়, বরং এক ধরনের বিশেষ সুবিধা। চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যু কোনও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল নয়, বরং সুলভ ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবার অভাবের প্রতিফলন।
সাম্প্রতিক SRS তথ্য ভারতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। মহামারী শেষ হয়ে গেলেও দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্কট কাটেনি। বর্তমানে নথিভুক্ত মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই প্রশিক্ষিত চিকিৎসা এবং পর্যবেক্ষণ ছাড়াই ঘটছে, যা মহামারীর আগের সময়ের তুলনায় নাটকীয়ভাবে অনেক বেশি । যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন, তথাপি তথ্যগুলি স্পষ্টভাবে দেখায় যে স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার এখনও অসম, বিশেষত গ্রামীণ ও দরিদ্র অঞ্চলে।
হাসপাতাল নির্মাণ ও স্বাস্থ্যবিমা সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও, কেবল এই পদক্ষেপগুলি যথেষ্ট নয়। চিকিৎসা-সেবাবিহীন মৃত্যু কমাতে হলে শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সরকারি স্বাস্থ্যখাতে অধিক বিনিয়োগ, গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার সম্প্রসারণ, সাশ্রয়ী চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের সর্বত্র তা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যথায়, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্ত্বেও, লক্ষ লক্ষ ভারতীয় অসুস্থতা ও মৃত্যুর মুখোমুখি হবেন স্বাস্থ্যব্যবস্থার নাগালের বাইরে থেকেই।
Death without Medical Attention
চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুর উদ্বেগজনক বৃদ্ধি
×
Comments :0