Education

আলো আঁধারিতে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা

সম্পাদকীয় বিভাগ

নিলয়কুমার সাহা
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র নির্দেশিত রোডম্যাপ অনুযায়ী স্থায়ী, প্রযুক্তি নির্ভর, দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রমের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করে শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের, আধুনিক এবং সার্বিক শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকার ২০২২ সালে ‘প্রধানমন্ত্রী স্কুলস ফর রাইজিং ইন্ডিয়া’ সংক্ষেপে ‘পি এম শ্রী স্কুলস’ শিরোনামে এক অভিনব প্রকল্পের সূচনা করে। এই প্রকল্পের সাহায্যে ১৪,৫০০ স্কুলকে ‘মডেল স্কুলে’ উন্নীত করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। প্রস্তাবিত মডেলে স্কুলগুলিকে এমনভাবে প্রস্তুত করা হবে, যাতে বিদ্যালয়গুলি অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে নির্দিষ্ট অঞ্চলে উচ্চমানের শিক্ষাদান এবং সামগ্রিক শিক্ষার প্রসারে নেতৃত্বদানে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। ঘোষণা অনুযায়ী ২০২২-২৩ থেকে ২০২৬-২৭ পাঁচ বছর ব্যাপী এই প্রকল্পে সরকারি, কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় সহ জওহরলাল নেহরু বিদ্যালয়গুলির মানোন্নয়নের পাশাপাশি পরীক্ষামূলক, সামগ্রিক এবং অনুসন্ধানমূলক শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সি সকল শিশুর জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা সুনিশ্চিত করতে ২০০১ সালে ভারত সরকার সূচনা করেছিল ‘সর্বশিক্ষা অভিযান’ শীর্ষক একটি প্রকল্প। বিদ্যালয় শিক্ষার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অংশে অবস্থিত রাজ্য সরকার পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক ‘ন্যাশনাল হায়ার এডুকেশন মিশন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প ঘোষণা করেছিল, যেটি ‘রাষ্ট্রিয় উচ্চশিক্ষা অভিযান’ (RUSA) নামেই অধিক জনপ্রিয় হয়েছিল। রাজ্য সরকার পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষার পরিধি প্রসারিত করতে, উন্নত গবেষণা এবং উদ্ভাবনী শক্তিকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের বাইরে জীবনে অপরিহার্য এমন বহু বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রন্থাগার, গবেষণাগার সহ বিভিন্ন স্বশাসিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রিত করে, সমন্বিত শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে সর্বোচ্চ মানের শিক্ষাদানের পরিসর সুনিশ্চিত করতেই এই প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০’র পাঁচটি স্তম্ভের – সহজলভ্যতা, সমতা, দায়বদ্ধতা, সাধ্যতা এবং গুণমান— সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাজ্য সরকার পরিচালিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মানোন্নয়নয়ের লক্ষ্যে ২০২৩ সালের জুন মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রক ঘোষণা করে ‘প্রধানমন্ত্রী উচ্চতর শিক্ষা অভিযান’ (PM-USHA) প্রকল্প। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এক দশক আগে অর্থাৎ ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্য পোষিত বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলির গুণগতমান বৃদ্ধি এবং সমতা নিশ্চিত করতে RUSA প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্পে কেন্দ্র ও রাজ্যের ৬০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ অনুপাতে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির পরিকাঠামোগত, প্রযুক্তিগত, গবেষণাগার এবং গবেষণার উন্নয়নকল্পে ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। এমতাবস্থায় দেশের বিদ্যালয় শিক্ষার মানোন্নয়ন, সমতাবিধান এবং প্রসারে ‘পি এম শ্রী স্কুলস’ প্রকল্পের পাশাপাশি একই লক্ষ্যে নাম বদল করে ‘প্রধানমন্ত্রী উচ্চতর শিক্ষা অভিযান’ প্রকল্পের ঘোষণা দেশের সরকার পোষিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নতির কোন স্তরে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর, সে বিষয়ে আলোকপাত অত্যন্ত জরুরি।
দেশের মোট বিদ্যালয়ের ৬.৪ শতাংশ বিদ্যালয় পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। সংখ্যার হিসাবে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত ৯৩,৭১৫টি বিদ্যালয়ের ৭৯.৩ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং এই বিদ্যালয়গুলির ৮৭.৭ শতাংশ সরকার পোষিত। রাজ্যের এই বৃহদায়তন সরকার পোষিত বিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থা কোভিড-উত্তর পরিস্থিতিতে গভীর সঙ্কটে নিমজ্জিত। ‘সমগ্র শিক্ষা মিশন’-এর ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের প্রতিবেদনে রাজ্য শিক্ষাদপ্তর পরিবেশিত তথ্য অনুসারে রাজ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৬,৭৪৪টি, যার মধ্যে ১১,৫১৫টি বিদ্যালয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা ৩০ জনেরও কম আর ১৫ জনের কম পড়ুয়া নিয়ে পরিচালিত বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩,৬৬৯টি। রাজ্যের ২২টি জেলায় অবস্থিত ২,২১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই অথবা একজন শিক্ষক আছেন। যদিও ২০০৯ সালের ‘রাইট অব চিল্ড্রেন টু ফ্রি অ্যান্ড কম্পালসারি এডুকেশান অ্যাক্ট’ অনুসারে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০জন পর্যন্ত শিক্ষার্থীর জন্য কমপক্ষে ২জন শিক্ষক থাকা আবশ্যক। ২০২১ সালের ২ আগস্ট লোকসভায় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ২০২০-২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে সরকার পোষিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক পদের সংখ্যা ৫ লক্ষ ৩৯ হাজার ২১৭টি, যার মধ্যে ৪ লক্ষ ৭৯ হাজার ৯২২টি পদ পূর্ণ। অর্থাৎ শূন্যপদের সংখ্যা ৫৯,২৯৫টি। কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে পড়ুয়াহীন সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যার নিরিখে শীর্ষে অবস্থান করছে পশ্চিমবঙ্গ। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজ্যের ৩,২৫৪টি পড়ুয়াহীন সরকারি বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা ১৪,৬২৭ জন। কেন্দ্রীয় সরকারের এই প্রতিবেদন অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের হার ছিল ৫.০২ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যথাক্রমে পৌঁছেছে ১২.০১ এবং ২০.৩ শতাংশে। রাজ্যের বিদ্যালয় শিক্ষাক্রমের ক্রমবর্ধমান এই বিপর্যয়ের আবহে ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার সারা দেশে কার্যকর করেছে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০। পশ্চিমবঙ্গে বিগত সরকার প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রের এই নীতির নাটুকে বিরোধিতা করলেও কালবিলম্ব করে গ্রহণ করেছে এই শিক্ষানীতি এবং যার আংশিক প্রতিফলনে রাজ্যের বিদ্যালয়গুলির একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে শুরু হয়েছে সেমিস্টার সিস্টেম। প্রচলিত বিদ্যালয় শিক্ষার ১০+২ ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন এই শিক্ষানীতি বিদ্যালয় শিক্ষাক্রমে ৫+৩+৩+৪ ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে। বিদ্যালয় শিক্ষাক্রমের এই আমূল কাঠামোগত পরিবর্তন বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তির বয়স ৬ থেকে ৩ বছরে নামিয়ে এনেছে। রাজ্যে সরকার পোষিত বিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থা যখন গভীর সঙ্কটে; তখন রাজ্যে নতুন সরকারের আবির্ভাব এবং রাজ্য বাজেটে সরকার পোষিত বিদ্যালয়কে আদর্শ বিদ্যালয় হিসাবে গড়ে তুলতে ২১০০ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দের ঘোষণা সর্বসাধারণের শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর পথ কতটা প্রশস্থ করবে, সে প্রশ্নের উত্তর সময়ের গর্ভে।
২০১১ সালের পর পশ্চিমবঙ্গে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। ২০১১ সাল পর্যন্ত রাজ্যে সরকার পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ১৯টি, যার মধ্যে ১৩টি ছিল উচ্চশিক্ষা দপ্তরের অধীনে আর ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় রাজ্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রকের অধীনে ছিল। সেই সময় পর্যন্ত রাজ্যে কোনও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পথ চলা শুরু করেনি। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে রাজ্যে ৭টি সরকার পোষিত এবং ৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা হয়। বর্তমানে রাজ্যে ৩৭টি সরকার পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ১২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থান করছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি এবং সরকার পোষিত সাধারণ ডিগ্রি কলেজের সংখ্যা ৫৪০টি। বিগত এক দশকে সারা রাজ্যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি একদিকে যেমন দেশের উচ্চশিক্ষার মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গকে উন্নীত করেছে, তেমনি অন্যদিকে ওই সময়কালে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুপ্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক পরিচালন ব্যবস্থা বিসর্জন দিয়ে মনোনীত পরিচালন ব্যবস্থার প্রবর্তন, মেধার পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে পছন্দের বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষার পরিসর নির্মাণ, আইন বদল করে রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আচার্য পদ মুখ্যমন্ত্রীর জন্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টা, ছাত্র নির্বাচন বন্ধ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে স্থানীয় দলীয় বাহুবলীদের হাতে তুলে দেওয়া, কলেজগুলিকে এনরোলমেন্ট সেন্টারে পরিণত করা, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের নামে পরীক্ষা ব্যবস্থাকে কার্যত প্রহসনে পরিণত করা, কলেজ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত মাহিনার পঞ্চাশ শতাংশ রাজ্য তহবিলে ফিরিয়ে নেওয়া, শিক্ষা দপ্তরের নির্দেশিকার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ বুঝে নেওয়া, উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজ্যপাল আর মুখ্যমন্ত্রীর নজিরবিহীন দ্বৈরথ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অধ্যাপক এবং শিক্ষাকর্মী বন্ধুদের অবসরকালীন আর্থিক পাওনা গণ্ডায় রাজ্য প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কায়েমের প্রচেষ্টা এবং সবশেষে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দপ্তর কর্তৃক কেন্দ্রীয় পোর্টালের মাধ্যমে বিলম্বিত ভর্তি প্রক্রিয়া রাজ্যের সরকার পোষিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে এক অভাবনীয় অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে, যা আগামীতে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার কালো অধ্যায় হিসাবেই চিহ্নিত হবে। চরম এই অব্যবস্থার ফলে সরকার পোষিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক হারে কমেছে পড়ুয়ার সংখ্যা। রাজ্য সরকারের তথ্য অনুসারে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সারা রাজ্যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৭ লক্ষ ২২ হাজার। ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে হয়েছে ২০ লক্ষ ৫৩ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষা প্রাঙ্গণ থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় ৭ লক্ষ পড়ুয়া। আশঙ্কা আগামীদিনে এই সংখ্যা বেড়েই চলবে কারণ রাজ্যে অবস্থিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এই চিত্রের ঠিক বিপরীত চিত্র বর্তমান। এমতাবস্থায় উপযুক্ত পরিকাঠামো ব্যতীরেকে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ২০২৩ সালে চার বছরের স্নাতক পাঠক্রমের সূচনা রাজ্য সরকার পোষিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন সুনিশ্চিত করবে, না কি স্বাভাবিক মৃত্যুর পথ প্রশস্থ করবে, সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে আর মাত্র কয়েকটি বছর অপেক্ষা করতে হবে। 
রাজ্যের বিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষিত ‘পি এম শ্রী স্কুলস’ এবং ‘প্রধানমন্ত্রী উচ্চতর শিক্ষা অভিযান’ প্রকল্প দুটি কতটা জরুরি সেই পর্যালোচনার শুরুতে যে কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হলো, প্রকল্প দুটির নামের সাথে ‘পি এম’ শব্দবন্ধ যুক্ত হওয়ার কারণে বিগত পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকল্প দুটি গ্রহণ করেনি। আত্মপ্রচারমুখী কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের এই দ্বৈরথে বিদ্যালয় শিক্ষা অপেক্ষা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। বিদ্যালয় শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ায় বিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামোগত প্রসার ও মানোন্নয়নের যাবতীয় দায়িত্ব বর্তায় রাজ্য সরকারের উপর। যে রাজ্য সরকার মিড ডে মিল প্রকল্পের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বিগত তিন বছরে নিজেদের ঘোষিত বাজেট বরাদ্দের কেবলমাত্র ১৬.৯৬ শতাংশ অর্থ খরচ করতে সমর্থ হয়েছে, সেই সরকারের ‘প্রধানমন্ত্রী স্কুলস ফর রাইজিং ইন্ডিয়া’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা আর না করায় রাজ্যের বিদ্যালয় শিক্ষার বিশেষ বিপর্যয় ঘটেছে বলে মনে হয় না। যদিও এই প্রকল্পে প্রস্তাবিত কিছু স্কুলকে ‘মডেল স্কুলে’ উন্নীতকরণের সুযোগ থেকে রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বঞ্চিত করেছে বিগত সরকার। দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ তালিকাভুক্ত হওয়ায় স্বাধীনতা-উত্তর পর্বে রাজ্যের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যলয়গুলির পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গবেষণার সিংহভাগ অর্থের জোগান দিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। ২০১৩ সালে রাজ্য সরকার RUSA প্রকল্প গ্রহণ করায় রাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গবেষণায় যে গতির সঞ্চার হয়েছিল, তা আজ স্তব্ধ। প্রচারে সিদ্ধহস্ত কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৩ সালে এই প্রকল্পের নামের সাথে ‘পি এম’  শব্দবন্ধ যুক্ত করে এবং এই অজুহাতে আর এক প্রচার সর্বস্ব বিগত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল। রাজ্যের এই সিদ্ধান্তের ফলে মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে রাজ্য পোষিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। দীর্ঘ সময় ধরে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে গবেষণা এবং পরিকাঠামোগত মানোন্নয়ন। সম্প্রতি রাজ্যে ক্ষমতাসীন হয়েছে নতুন সরকার এবং নব নির্বাচিত সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সরকার পোষিত শিক্ষাব্যবস্থার উপর গুরুত্ব আরোপ করে রাজ্যের ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত বিদ্যালয় শিক্ষা মন্ত্রী ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, রাজ্যের শিক্ষা ব্যস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করাই তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার। পাশাপাশি রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী পাঁচ বছরের মধ্যে রাজ্যের শিক্ষার গৌরব পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেছেন। রাজ্যে সদ্য ক্ষমতাসীন ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের ঘোষিত স্লোগান ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ রাজ্যের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ঘনীভূত নিকষ আঁধার দূর করে রাজ্যবাসীকে প্রকৃত অর্থে কতটা ভরসা দিতে পারে, সেটাই দেখার।    
    

Comments :0

Login to leave a comment