ডাঃ ফুয়াদ হালিম
চিকিৎসাখাতে মানুষের পকেট খরচ বাড়ছে— বহু চর্চিত এই বাস্তব তথ্য মানতে রাজি নয় কেন্দ্রীয় সরকার। মূলত: কোভিডের সময়ে যে ওষুধ ও চিকিৎসাখাতে সাধারণ মানুষের পকেট খরচা কিছুটা কমেছিল, কার্যত সেটাকেই দেশের সরকার ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বারবার সামনে নিয়ে আসছে। শুধু তাই নয়, ২০২১-২২ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট বক্তৃতায় দেশের অর্থ মন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের বিস্ময়কর দাবি ছিল, ‘স্বাস্থ্য ও সুস্থতা’ খাতের বরাদ্দ, আগের বছরের বাজেট অনুমানের থেকে ১৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ ৯৪,৪৫২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২ লক্ষ ২৩ হাজার, ৮৪৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একটু গভীরভাবে গোটা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, এই পরিসংখ্যানটি মূলত পানীয় জল, স্যানিটেশনের বরাদ্দকে একসঙ্গে করে একই ছাতার তলায় এনে ‘স্বাস্থ্য’-এর অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পায়নি।
আসলে ওষুধ দাম ও চিকিৎসার খরচ এমন বহুল পরিমাণে বেড়েছে যে সাধারণ মানুষের নাভিঃশ্বাস উঠছে। ভারত সরকারের বদান্যতায় প্রতি বছর দাম বাড়ছে ওষুধের, কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই বেসরকারি ক্ষেত্রের আকাশছোঁয়া খরচের ওপরেও। মানুষ এই খরচ সামলাতে গিয়ে ঘটি বাটি বিক্রিই শুধু নয়, ক্রমশ ঋণের জালে জড়িয়ে দারিদ্র সীমার নিচে চলে যাচ্ছে। এটা ঠিকই যে সরকার কোভিডকালে বেশ কিছু হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল। ফলে মানুষের কাছে সুযোগ ছিল না প্রোটোকল ভেঙে অন্য কোথাও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। উপরন্তু কোভিডকালে নির্দিষ্ট করে শুধুমাত্র কোভিডের ওপরেই নজর থাকায় সরকারি খাতে যে খরচ হয়েছিল, সেটিকেই বারবার বড় করে দেখানো হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, চিকিৎসাখাতে সরকার প্রভূত অর্থ খরচ করেছে। এককথায় এসব তথ্য এটাই প্রমাণ করে যে বাস্তব চাপা দিতে নানা প্রহসনের আশ্রয় নিয়ে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
দেশের অর্থ মন্ত্রী সেই বাজেট বক্তৃতায় একটি বিষয় উল্লেখ করেননি, তা হলো— ‘জল জীবন মিশন'’ অর্থাৎ জাতীয় গ্রামীণ পানীয় জল মিশন এবং স্যানিটেশন বা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দকৃত ৬০,০৩০ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি পুষ্টির জন্য ২,৭০০ কোটি টাকা; কোভিড-১৯ টিকার জন্য ৩৫,০০০ কোটি টাকা; এবং স্বাস্থ্য, পানীয় জল ও স্যানিটেশন খাতে অর্থ কমিশনের অনুদান হিসাবে ৪৯,২১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এতগুলি বিষয় যদি বাজেটের মধ্যে ঢোকানো হয় তাহলে আমরা সঠিক তথ্য বা প্রকৃত বাজেট সম্পর্কে কি করে অবহিত হবো— সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য বাজেটের আওতায় বায়ু দূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বস্তুত গত ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া লকডাউনের প্রথম কয়েক মাসে, টিকাদান কর্মসূচি ও প্রসূতিসেবা সহ সমস্ত নিয়মিত স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। সে সময়ে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো অনেক বেশি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। নজর ছিল শুধুই কোভিডে। ফলে একমুখী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে ঠিকই, তবে অন্যান্য রোগে নজর দেওয়া হয়নি সে সময়ে। উপরন্তু কোভিড-১৯-এর পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান যে আকাশচুম্বী ফি আদায় করছিল— তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল না সরকারি তরফে। ফলে সেই সময়ে সরকার তার সাফল্যের খতিয়ান একরতফাভাবে প্রচার করে গেছে, যা কিনা সামগ্রিকভাবে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কোনোভাবেই প্রতিফলিত করে না।
এর আগেই দেখা গেছে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে গড়ে তোলার জন্য প্রতিবছর যা বরাদ্দ তার ৫০ শতাংশ খরচ করতে পারছে না সরকার। সরকারি ত্রিস্তরীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা– বিস্তার ও ব্যাপ্তি বরাদ্দ থাকলেও স্বাস্থ্যে খরচ করতে না পারা রাজনৈতিক দৃঢ়তার অভাবের পরিচয়। কোভিড পরবর্তী সময়ে মানসিক রোগের ক্ষেত্রে একটা বিশেষ দিক সামনে আসে। সেই ক্ষেত্রে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্স (নিমহ্যানস)-এর ৪.৪৪ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ কেটে নেওয়া হয়েছে। এবং ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম জন্ম থেকে বাজেট ও মানব সম্পদের ঘাটতিতে ভুগছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে ওয়ার্লড হেলথ অর্গানাইজেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেন; তারা আর্থিক বোঝা বহন করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে আগেই। আসলে ওষুধের বাজার নিজেদের হাতে ধরে রাখতে চাপ সৃষ্টি করাই উদ্দেশ্য। অন্য দেশ সস্তায় ওষুধ তৈরি করলে বিলক্ষণ আমেরিকার আপত্তি রয়েছে। ইউএসএ’র স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যে রাজনৈতিক অবস্থান ভারতকে প্রভাবিত করছে তা ভারতের সার্বিক আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার চরিত্রকে খর্ব করছে। একই পথে হেঁটেছে ভারত সরকার।
এখন জিডিপি’র অনুপাতে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানোর বাড়ানোর দাবি উঠেছে দেশ জুড়ে। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে থেকে ব্যয় হলে তা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে। কিন্তু বেসরকারি বাণিজ্যিক সংস্থা হলে তাদের মুনাফার দিকে ঝোঁক থাকবে। ফলে মুনাফার একটি ছাঁকনি তৈরি করবে তারা। সেই ছাঁকনির মধ্য থেকে মুনাফা বাদ দিয়ে যেটুকু বাঁচবে সেইটুকুই মাত্র পরিষেবা হিসাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে। বাকিটা ওই কোম্পানিগুলি আত্মসাৎ করবে। এটাই এখন স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বাস্তব ঘটনা হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য বিমাগুলোর জন্য এবং প্রচারের জন্য সরকার যা খরচ করে তা আসে সাধারণ মানুষ অর্থাৎ করদাতাদের টাকা থেকে। এই সরকারি খরচের একটা বড় অংশ যায় বেসরকারি বা প্রাইভেট হাসপাতালকে টাকা দেওয়ার জন্য। ন্যাশনাল হেলথ অথরিটি রিপোর্ট ২০২২-২০২৩ অনুযায়ী আয়ুষ্মান ভারত বিমা প্রকল্পের মাধ্যমে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার যে টাকা খরচ করেছে, তার ৬৬% গেছে প্রাইভেট বা বেসরকারি হাসপাতাল বা সেক্টরের কাছে। এই অর্থ অবশ্যই সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা যেত। আসলে সরকার মানুষের টাকা বেসরকারি বা প্রাইভেট, করপোরেট হাসপাতাল বা সংস্থাকে পাইয়ে দেয়।
এই শতকের প্রথমে পৃথিবীব্যাপী যে আর্থিক মন্দা ঘটলো, তার ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্র সেভাবে প্রসার লাভ করতে পারলো না। আবার এও দেখা গেল যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের এই মন্দা আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির সেভাবে ক্ষতি করতে পারলো না। তাই মন্দার পর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রকেই বেছে নিয়েছিল পুঁজিপতিরা। স্বাস্থ্য বিমার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের করের টাকার একটা বড় অংশ কর্পোরেট স্বাস্থ্য পরিষেবার হাতে তুলে দিয়ে তাদের মুনাফার গ্যারান্টি দিচ্ছে সরকার। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ কমছে।
বস্তুত: একটি সরকারি হাসপাতালে বা গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কি কি পরিষেবা পেতে পারেন সাধারণ মানুষ, সেখানে সুচিকিৎসার জন্য কি কি সুবিধা বা পরিকাঠামো থাকতেই হবে- সেসব সাধারণ মানুষের জানার অধিকার আছে। প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার। সেই অধিকারের দাবি উঠছে দেশ জুড়ে। রোগ প্রতিরোধ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পানীয় জল, খাবার ও পুষ্টি, বসবাসের বাড়ি ও স্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, টিকা ইত্যাদি। আমাদের দেশে সরকারি ক্ষেত্রে বাস্তবে এই বিষয়গুলোকে শুধু কাগজে কলমেই রাখা হয়, বাস্তবে কাজ হয় সামান্যই।
সাধারণ মানুষ বাজার থেকে যখন ওষুধ কেনে তখন রাষ্ট্রের একটা ভূমিকা থাকার কথা স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে। কারণ চিকিৎসা পাওয়া মানুষের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। কিন্তু আমাদের দেশে তা হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্যের বিষয়ে রাষ্ট্র বিশেষ কোনও দায়িত্ব পালন করছে না। সরকারের নীতিতে বাড়ে ওষুধের দাম, চিকিৎসার সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশের দাম। আর সাধারণ গরিব মানুষ নিজেদের পকেট থেকে খরচা করে সেই অতিরিক্ত দামে ওষুধ কিনতে ও স্বাস্থ্য পরিষেবা নিতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্য’- এই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে সরকার।
এ রাজ্যের ক্ষেত্রে বিশেষত বলা যায়, প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলির বেহাল দশা গরিব মানুষকে অশেষ দুর্গতির মুখে দাঁড় করিয়েছে। অথচ ৯০ শতাংশ চিকিৎসা সমস্যা মিটবে এই প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রগুলি থেকেই— এমনই লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া লক্ষ্য ছিল বাকি ১০ শতাংশ চিকিৎসার ঘাটতি মেটাবে গ্রাম শহরের ছোট বড় হাসপাতালগুলি। কিন্তু তা না হওয়ায় বাস্তবে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাখাতে খরচ বেড়েছে, যা তাঁদের নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে বেশিরভাগ সময়ে।
অর্থাৎ ওষুধপত্র থেকে অ্যাম্বুল্যান্স, চিকিৎসা অথবা ডায়গোনোস্টিক সেন্টারের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় খরচ করতে গিয়ে অনেক সময়ে ঋণের জালেও জড়িয়ে পড়ছেন প্রত্যম্ত অঞ্চলের গরিব মানুষ। চিকিৎসার খরচ এক বিভীষিকা তৈরি করেছে জনমানসে। রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পও অধিকাংশ মানুষের কোনও কাজে আসে না, বহু অভিযোগ জমা হয়ে আছে এই প্রকল্পের সুবিধা মেলা নিয়ে। ফলে চিকিৎসার বিপুল খরচ মানুষকে দারিদ্র সীমার দিকে নিয়ে গেছে।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোর যথাযথ উন্নতি করতে হবে। আরও নতুন সরকারি হাসপাতাল এবং চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। তা করতে গেলে কেন্দ্রীয় সরকারকে জিডিপি’র ৩.৫% স্বাস্থ্যের জন্য খরচ করতে হবে। রাজ্য সরকারগুলিকেও তাদের রাজ্য জিডিপি’র ৫% খরচ করতে হবে স্বাস্থ্যের জন্য। আর এই সরকারি খরচের ৪০% প্রাইমারি কেয়ার বা রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার জন্য খরচ করতে হবে। না হলে প্রত্যেক মানুষ স্বাস্থ্য পরিষেবা পাবে না। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী দ্রুত নিয়োগ না করতে পারলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় ঘাটতি থেকে যাবে।
Highlights
সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোর উন্নতি, আরও নতুন সরকারি হাসপাতাল এবং চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। কেন্দ্রকে জিডিপি’র ৩.৫% এবং রাজ্য সরকারকেও রাজ্য জিডিপি’র ৫% খরচ করতে হবে স্বাস্থ্যের জন্য। না হলে প্রত্যেকের স্বাস্থ্য পরিষেবা মিলবে না। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ না হলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় ঘাটতি থেকে যাবে।
Comments :0