Editorial

চলমান সামাজিক সঙ্কট

সম্পাদকীয় বিভাগ


যদি সমঙ্কটের ক্রম তালিকা করা হয় তাহলে  পয়লা নম্বরে থাকবে কাজের হাহাকার। দেশে এবং আমাদের রাজ্য তো বটেই সবচেয়ে র্জর্জরিত যেখানে, তা হলো চড়া বেকারত্ব আর তার থেকেই তৈরি হওয়া চাহিদা হ্রাস যা তৈরি করেছে এক মারাত্মক সামাজিক সঙ্কট । অথচ কেন্দ্র অথবা রাজ্য সরকারের অগ্রাধিকারে সবচেয়ে বেশি থাকার প্রয়োজন যে বিষয়ে, সেই পথে তারা কখনও হাঁটছে না। অনেক প্রতিশ্রুতি আছে কথার ফুলঝুরি আছে তথ্য পরিসংখ্যার কারসাজি আছে, নির্বাচনের মুখে যা এখন লাগাম ছাড়া, কিন্তু খোলা যদি দেখা যায় তাতে কাজের কোনও দিশা নেই। 
নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে বিজেপি’র প্রতিশ্রুতি ছিল বছরে ২কোটি বেকারের চাকরি দেবে তাদের সরকার। ১১ বছরে হওয়ার কথা ২২ কোটি মানুষের চাকরি। গত লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে দেশে মোট বুথ ১০,৫২,৬৬৪টি। অর্থাৎ বুথ পিছু কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে চাকরি হওয়ার কথা ছিল ২০৯ জনের। দেখা গেছে কি কোনও রাজ্যে? স্নাতক স্তর পর্যন্ত পড়েছেন এবং ২৫ বছরের কম বয়সি এমন যুবক-যুবতীর ৫ জনের মধ্যে ২ জনই বেকার। সম্প্রতি ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া, ২০২৬’ রিপোর্টে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র ধরা পড়েছে। রিপোর্ট বলছে, দেশের উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের সমস্যা এক চরম সঙ্কটের রূপ নিয়েছে। ২৫ বছরের কম বয়সি স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার। আর যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের সিংহভাগেরই কাজের ক্ষেত্রে কোনও নিরাপত্তা নেই, বেতনের নিরাপত্তা নেই, কাজ আজ আছে কাল নেই। 
মমতা ব্যানার্জিও বলেছেন, আমরা ২ কোটি চাকরি দিয়েছি। প্রতি বছর ১৯ থেকে ৩৫ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় ৪ লক্ষ বেকার যুবক যুবতী কাজের বাজারে আসেন। তাহলে পনেরো বছরে রাজ্যে ৬০ লক্ষ কাজের খোঁজে থাকা যুবক, যুবতীর সবার কাজ হয়েছে। অর্থাৎ রাজ্যের প্রয়োজনের বাইরে আরও ১ কোটি ৪০ লক্ষ কাজের বন্দোবস্ত তৃণমূল করেছে। তাহলে মমতা ব্যানার্জির এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে লক্ষ লক্ষ যুবক, যুবতী এল কোথা থেকে? মমতা ব্যানার্জির হিসাব সঠিক ধরলে বুথ পিছু ২৪৮জনের চাকরি হয়েছে। তাঁরা কোথায়? দেখা যাচ্ছে কী ? রাজ্য থেকে প্রায় ৫০ লক্ষের ওপর যুব পরিযায়ী। লকডাউনে কাজ হারানো শ্রমিকদের  হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল তৃণমূলের। পেয়েছেন  মাত্র ১৮হাজার জন। বিধানসভাতেই তা স্বীকার করেছে রাজ্য সরকার। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির সরকার শিল্প-কারখানা তৈরির লাইনে না গিয়ে নানা অছিলায় জনসাধারণকে অন্য লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে মেরুদণ্ড ভেঙে দেবার বন্দোবস্ত করেছে। শিল্প নেই, তার উদ্যোগও নেই, কর্মসংস্থান তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছে। এরাজ্যের ছেলেমেয়েরা কর্মসংস্থানের জন্য অন্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে। এক ভয়াবহ পরিস্থিতি । 
এই মুহূর্তে আমাদের অর্থ ব্যবস্থার  প্রধান সমস্যা চড়া বেকারত্ব ও চাহিদা হ্রাস। নোটবন্দির পরে বেকারত্ব হার এক লাফে যতটা বেড়েছে তা থেকে নেমে আসার কোন দিশা এখনও মেলেনি। নির্বাচনী উত্তাপে তা উধাও হয়ে গেছে। সরকারি ঊদ্যোগ এবং প্রকৃত বিনিয়োগ বৃদ্ধি হলে তবেই হবে উৎপাদন, বিক্রয়, এবং কর্মসংস্থান । নইলে চলমান অসাম্য বাড়বেই। যা সামাজিক সঙ্কটকে বাড়িয়ে তুলছে। নির্বাচনের সময় আবার তাকেই মুলধন করে ভোট কিনতে নেমেছে দুই শাসক দল।  দেশের সমগ্র সম্পদের প্রায় সবটাই অতি ধনীদের কবজায়, জাতীয় আয়ের সিংহভাগ  তারাই ভোগ করে। যা এই সমাজের স্থিতিশীলতার পক্ষে বিপজ্জনক। মোদী বা মমতা সরকারের নীতি এর কোনোটার সুরাহা করতে পারবে না। তাই বামপন্থার প্রসার ঘটাতে না পারলে এই প্রজন্মের ক্ষতি রোখা যাবেনা। এবারের নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ সেখানেই।

Comments :0

Login to leave a comment