পার্থপ্রতিম বিশ্বাস
মাস ছয় আগে, এক শীতের রাত্রে কলকাতার নাজিরাবাদ অঞ্চলে তালা বন্ধ গুদাম ঘরে ছাব্বিশ জন শ্রমিক পুড়ে মারা গিয়েছিল। এই দশকের অন্যতম হাড় হিম করা দুর্ঘটনা ছিল নাজিরাবাদের ঘটনা। যে আগুনে পুড়ে ঝলসে যাওয়া একটা মানুষেরও আস্ত দেহ পাওয়া যায়নি সৎকারের জন্য। সেই মানুষেরা শহরে এসেছিল কাজের খোঁজে, পেটের টানে। আর সেই ঘটনার ছ’মাস যেতে না যেতেই রাজধানী খাস কলকাতাতেই আবারও বারো জন মানুষ প্রকাশ্যে দিবালোকে মারা গেল এক নির্মীয়মাণ গুদামের কাঠামো চাপা পড়ে। যারা সকলেই ছিলেন নির্মাণ কর্মী, যাঁরা পেটের টানে শহরে এসে ভিড় করেছিলেন দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের আশায়। খাস কলকাতার তারাতলার এই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যে চালু বিভিন্ন নির্মীয়মাণ প্রকল্পের সুরক্ষা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠল যখন সেই প্রকল্পের নির্মাণ নকশার ত্রুটি স্বীকার করল স্বয়ং বর্তমান সরকার।
রাজ্যে পালাবদলের আগে মানুষ ‘সরষের মধ্যে ভুতের’ প্রয়োগ রুপ দেখেছে শিক্ষা, আবাস কিংবা রেশন দুর্নীতির মতো গুরুতর জনস্বার্থের বিষয়ে। ফলে তারাতলার এমন নির্মাণ কাঠামো বিপর্যয়ের পর সেই অবৈধ নির্মাণের বীজ পৌরসভার অন্দরে পোঁতা ছিল কিনা সেই প্রশ্ন সঙ্গতকারণেই জোরালো হচ্ছে। কারণ বিরোধীশূন্য পৌরসভার পৌরপ্রতিনিধিদের নজর এড়িয়ে যেখানে একটা চালাঘর উঠতে পারতো না সেখানে আইন ভেঙে কয়েক হাজার স্কোয়ার ফিটের ইস্পাতের কাঠামো কি করে গড়ে উঠল গোটা পৌরসভাকে মূক এবং বধির বানিয়ে সেটাই এখন জরুরি প্রশ্ন! এমন আরও কিছু প্রশ্ন উঠে আসছে এমন বিপর্যয়ের পর যেগুলির উত্তর খোঁজা জরুরি জনস্বার্থেই।
আমরা সকলেই জানি যে বেআইনি নির্মাণ রাতের অন্ধকারে চুপিসারে হয় না বরং সেটা ঘটে প্রকাশ্যে দিবালোকে পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায়। সাম্প্রতিক অতীতে শহর জুড়ে ঝুড়ি ঝুড়ি বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ যে উঠে এসেছে জনসমক্ষে সেগুলির পেছনে ছিল রাজনৈতিক মদত এবং প্রশাসনিক যোগ। একথা অজানা নয় যে ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ নকশার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নির্মাণের মানের সাথে আপস করে নির্মাতার লাভের কড়ি বাড়িয়ে তোলা। নির্মাণে আপস করতে গিয়ে যখন নির্মাণ কাঠামো দুর্বল কিংবা ঝুঁকিপ্রবণ হয়ে ওঠে তখনই বাড়ে মানুষের প্রাণের ভয়। কিন্তু এমন ত্রুটিপূর্ণ নকশায় আখেরে লাভ প্রোমোটার কিংবা ডেভেলপারের হলেও সেই লাভের গুড় পৌরসভা থেকে পুলিশ প্রশাসন সর্বত্রই পৌঁছে যায়। ফলে আজ বেআইনি নির্মাণ রুখতে গেলে কেবল চোর ধরার অভিযার— ‘চোর-পুলিশ’ খেলা কিংবা বুলডোজার দিয়ে প্রতীকী নির্মাণ ধ্বংস করে অবৈধ নির্মাণ রাখা যাবে না। অবৈধ নির্মাণ রুখতে সরকারকে স্বচ্ছ দায়বদ্ধ এক পৌর প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে।
বিগত দশ বারো বছরে পৌর প্রতিনিধিরা বাহুবলে পৌর প্রশাসন ছলে-বলে-কৌশলে বেদখল করে এই বেআইনি নির্মাণের বাস্তুতন্ত্র তৈরি করেছিল রাজ্যজুড়ে। আজ রাজ্যের নতুন সরকার যদি এক্ষেত্রে মানুষের ভরসার ভরকেন্দ্র হয়ে উঠতে চায় তবে ওই অবৈধ নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদ থেকে শুরু করে পাড়ার কাউন্সিলর যারা এমন ভয়াবহ দুর্নীতিতে হাত পাকিয়ে এখন সরকারের খাতায় ‘গুডবয়’ সাজার চেষ্টা করছেন শাসকের অনুগত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কি অবস্থান নেয় সেটাই আজ রাজ্যবাসীর কাছে বহুমুল্যের প্রশ্ন! এ রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রাক্তন ঘাসফুল নেতারা আজ তাদের অবৈধ সম্পদ রক্ষার লক্ষ্যে শিবির বদলের উদ্যোগ নিচ্ছেন জেলযাত্রা বাঁচাতে। ফলে বিভিন্ন মডেলের রক্ষাকবচ তৈরি হচ্ছে রাজ্য রাজনীতিতে এমন অবৈধ আয়ের উৎস রক্ষা করতে। মনে রাখতে হবে যে ঘাসফুল দলের ক্ষমতার অন্যতম উৎস ছিল এই অবৈধ পথে অর্জিত অর্থ এবং সম্পদ।
সাম্প্রতিক তারাতলা বিপর্যযয়ে আবারও উঠে এসেছে নির্মাণক্ষেত্রে বহুস্তরীয় গাফিলতি। বিশেষত পৌরসভার প্ল্যান অনুমোদন করার পর কার্যক্ষেত্রে সেই নির্মাণ, আইন অনুযায়ী হচ্ছে কিনা সেটাও পর্যায়ক্রমে তদারকি করা পৌর প্রশাসনের এক্তিয়ারে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভায় নিয়োগ বন্ধ থাকায় সেই তদারকির ক্ষেত্রে লোকবলের ভয়ঙ্কর ঘাটতি রয়েছে কলকাতা থেকে জেলার বিভিন্ন পৌরসভাতেই। মনে রাখতে হবে যে দ্রুততায় এখন নগরায়ন ঘটে চলেছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সেক্ষেত্রে নির্মাণক্ষেত্রের উপর পৌর নজরদারি বাড়াতে গেলে প্রয়োজন প্রচুর সংখ্যক স্থায়ী, দক্ষ কর্মী নিয়োগ। বর্তমান তারাতলা বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বিগত আমলে অনুমোদিত বিভিন্ন নির্মাণ নকশা ‘অডিটের’ কথা ঘোষণা করেছেন। এমন অডিটের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো ইতিমধ্যে পাশ করা বিভিন্ন নির্মাণ নকশার মধ্যে বৈধ এবং অবৈধ নির্মাণকে চিহ্নিত করা। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ নির্মাণ নকশার ‘অডিট’ রাজ্যজুড়ে করতে গেলে যে পরিমাণ দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার কিংবা কর্মীর প্রয়োজন সেটা নেই সরকারের ভাঁড়ারে। ফলে সরকার চাইলেও এমন জরুরি ‘অডিট’ শেষমেশ অসম্পূর্ণ থাকার সম্ভাবনা প্রবল। সেক্ষেত্রে সরকারকে নির্মীয়মান প্রকল্পগুলির মধ্যে আকার-আকৃতি, উচ্চতা এবং ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রকল্প, প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণ কিংবা বড় আবাসন প্রকল্পগুলিকে এমন অডিটের প্রাথমিক পর্যায়ে আনা উচিত অন্যথায় যাবতীয় প্রকল্পগুলি অডিটের কারণে দীর্ঘকাল থমকে থাকলে আখেরে রাজ্যের উন্নয়নও থমকে পড়তে পারে।
মনে রাখতে হবে নির্মাণ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে নির্মাণ নকশা ত্রুটিমুক্ত হওয়া যেমন জরুরি তেমনি জরুরি নির্মাণ সামগ্রীর মান, নির্মাণ পদ্ধতি এবং নির্মাণ ক্ষেত্রে তদারকির ভূমিকা। এর কোনও একটির অভাব ঘটলে সামগ্রিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তারাতলায় নির্মাণ কাঠামো ছিল ইস্পাতের তৈরি তিনতলা গুদাম ঘর। ফলে এমন ইস্পাতের কাঠামো দিয়ে কাজ করার দক্ষতা, যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে কিনা নির্মাণকারী সংস্থার, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন পৌর প্রশাসনের তরফে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, নির্মাণ প্রকল্পের খরচ কমাতে আর নির্মাণের মানের সাথে আপস করতে বহু ক্ষেত্রেই অদক্ষ, অনভিজ্ঞ এবং অসৎ নির্মাণকারী সংস্থা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বহু প্রকল্পে। পাশাপাশি নির্মাণ ক্ষেত্রে যদি সিন্ডিকেট বাহিনীর দাপট প্রবল হয় সেক্ষেত্রে নির্মাণ সামগ্রীর মানের সাথে আপস হয় সর্বাধিক। বন্দর এলাকায় কেবল বর্তমানের বিতর্কিত গুদামের কাঠামো নয় বরং বহু নির্মাণ কাঠামো ঘিরেই স্থানীয় মানুষের অভিযোগ জমা পড়েছিল রাজ্য প্রশাসন থেকে বন্দর প্রশাসনের কাছে। কিন্তু তাতে আখেরে কাজের কাজ যে কিছু হয়নি সেটা আরও একবার স্পষ্ট হলো এই নির্মাণ বিপর্যয়ের সাথে।
মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে,অতীতের নির্মাণ নকশার মূল্যায়ন যেমন জরুরি তেমন জরুরি ভবিষ্যতের নির্মাণকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত রাখার নীল নকশা প্রস্তুত করা। এখন উপগ্রহ মানচিত্রের ভিত্তিতে সহজেই শহরের যে এলাকাগুলিতে গত দুই দশকে সবচেয়ে বেশি নির্মাণ হয়েছে কিংবা জলাভূমি বোঝানো হয়েছে সেগুলিকে চিহ্নিত করা যায়। আর সেই চিহ্নিত তথ্যের ভিত্তিতে পৌর প্রশাসনের উচিত প্রাথমিকভাবে বৈধ এবং অবৈধ নির্মাণের শ্রেণি বিন্যাসের কাজ শেষ করা। নির্মাণ অবৈধ হলে নির্মাণকারী সংস্থাকে কেবল জরিমানার বিনিময় সেগুলিকে বৈধ রূপে অনুমোদন দেওয়াটাও ভুল। বরং যদি সেই নির্মাণ ঝুঁকিবহুল হয় তবে সেই কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখতে প্রযুক্তিনির্ভর উপায়ে ( structural retrofitting) মেরামতির উদ্যোগ নেওয়া উচিত পৌরসভার নির্মাণকারীর থেকে জরিমানার অর্থের বিনিময়ে। অন্যথায় যথাযথ আইনি নোটিস দিয়ে এগুলি ভাঙার ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে দেশের চালু প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাঝেই গড়ে ওঠা এমন অবৈধ নির্মাণ কাঠামো তৈরি হচ্ছে, হাত বদল হচ্ছে কিংবা বিক্রি হচ্ছে যখন পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায় তখন এমন অবৈধ কারবারের প্রতারিত মানুষদের রাতারাতি ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে বাড়ি ভেঙে ফেলাটাও চটজলদি কোনও সমাধান নয়। বরং অবৈধ নির্মাতাদের থেকে বাজেয়াপ্ত জরিমানার অর্থ ব্যবহার করে সরকার কিংবা পৌরসভা সেই প্রতারিত বাসিন্দাদের বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। বুলডোজার দিয়ে প্রতীকী দু’-চারটে বাড়ি ভেঙে অবৈধ নির্মাণের কারবারীদের ভয় দেখানো যাবে না যদি না এই ব্যবস্থার গভীরে থাকা তাদের দুর্নীতির শেকড়উপড়ে ফেলা যায়। কয়েক বছর আগে দিল্লির উপকণ্ঠে নয়ডা অঞ্চলে কুতুবমিনারের চেয়েও উঁচু দুটি অবৈধ নির্মাণ সুপ্রিম কোর্টের আদেশে বিস্ফোরক দিয়ে দু’মিনিটে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরেও কি দিল্লি, উত্তর প্রদেশ কিংবা দেশে বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে রাশ টানা গেছে। বেলাগাম অপরিকল্পিত নগরায়নের সাথে অবৈধ নির্মাণ আজ হাত ধরাধরি করে চলছে দেশজুড়েই। ফলে আজ প্রয়োজন পৌর প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে বেআইনি নির্মাণ রুখতে জনসাধারণের মতামতকে সম্যক গুরুত্ব দেওয়ার এক স্বচ্ছ প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করা।
আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে ‘ড্রোন’ ক্যামেরা ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়ার্ড এলাকার শয়ে শয়ে বাড়ির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা বের করা সম্ভব। ফলে সেই বাড়ির জ্যামিতিক পরিমাপ থেকে যাচাই করা সম্ভব যে বাড়িটি পৌর-আইন লঙ্ঘন করেছে কি না। এভাবে পরিকল্পিত উপায়ে শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ড জুড়ে বিভিন্ন এলাকার বাড়ির ম্যাপিং করা প্রয়োজন। ফলে ভবিষ্যতে এই তথ্যের ভিত্তিতে নির্মাণ কাঠামোর পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন কতটা সম্ভব ভবিষ্যতে, সেটাও বের করা যাবে দ্রুত প্রযুক্তির মাধ্যমে। ফলে একুশ শতকে পৌর প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় মূলধন করতে হবে প্রযুক্তিকে। আর সাথে চাই দুর্নীতির প্রশ্নের সরকারের আপসহীন মনোভাব। তবেই হয়তো মিলতে পারে নির্মাণ ক্ষেত্রের হাজারো বেনিয়ম থেকে খানিক মুক্তির আলো। কিন্তু শোকের আয়ু শুকিয়ে যাওয়ার মতোই এই দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক অভিঘাত, সংবাদমাধ্যমের চড়া আলো কিংবা সরকারের মোটা ক্ষতিপূরণ আর প্রশাসনের প্রতিশ্রুতির ঢেউয়ে কেবল ভেসে গেলে আবারও অধরা থেকে যাবে এই মৃত্যু মিছিল আটকানোর অঙ্গীকার ।তাই কেবল প্রশাসন ভরসা নয় নাগরিক সমাজ সক্রিয় না হলে এই রোগের মুক্তি সম্ভব নয়।
শোকের আয়ু শুকিয়ে যাওয়ার মতোই তারাতলার দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক অভিঘাত, সংবাদমাধ্যমের চড়া আলো কিংবা সরকারের মোটা ক্ষতিপূরণ আর প্রশাসনের প্রতিশ্রুতির ঢেউয়ে কেবল ভেসে গেলে আবারও অধরা থেকে যাবে এই মৃত্যু মিছিল আটকানোর অঙ্গীকার। তাই কেবল প্রশাসনে ভরসা নয়, নাগরিক সমাজ সক্রিয় না হলে এই রোগের মুক্তি সম্ভব নয়।
Comments :0