নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহারের জেরে উত্তরবঙ্গের চা শিল্পে তৈরি হওয়া সংকট কাটল না। বটলিফ ফ্যাক্টরি ও ক্ষুদ্র চা চাষিদের মধ্যে কাঁচা চা পাতা কেনাবেচা কার্যত বন্ধ থাকায় চাষিদের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় গোপনে কাঁচা পাতা কেনার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায় ময়নাগুড়িতে চাষিরা চা পাতাবোঝাই ছোট গাড়ি আটকে রাস্তায় পাতা ফেলে বিক্ষোভ দেখান। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অন্যদিকে, রাজগঞ্জে ক্ষুদ্র চা চাষিদের সংগঠন বিডিও’র কাছে ডেপুটেশন দিয়ে দ্রুত সমস্যার সমাধানের দাবি জানায়। বৃহস্পতিবারের ধারাবাহিকতায় শুক্রবারও জলপাইগুড়ি জেলার একাধিক এলাকায় কয়েকটি বটলিফ ফ্যাক্টরির বিরুদ্ধে এজেন্টের মাধ্যমে গোপনে কাঁচা পাতা কেনার অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে চাষি ও পাইকারদের একাংশ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে শামিল হন। তাঁদের অভিযোগ, একদিকে অধিকাংশ ক্ষুদ্র চাষির পাতা কেনা বন্ধ রাখা হয়েছে,অন্য দিকে কিছু অসাধু পাইকার ও বটলিফ ফ্যাক্টরির যোগসাজশে গোপনে পাতা কেনাবেচা চলছে।
প্রতিবাদী চাষি অশোক রায় ও গৌতম রায়ের অভিযোগ, এনএবিএল স্বীকৃত পরীক্ষাগারের শংসাপত্র ছাড়া কাঁচা পাতা নেওয়া হচ্ছে না। অথচ উত্তরবঙ্গে সেই পরীক্ষার প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোই নেই।শিলিগুড়িতে পরীক্ষা করাতে ৯ হাজার টাকারও বেশি খরচ এবং কয়েকদিন সময় লাগে, যা ক্ষুদ্র চাষিদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা গোপনে পাতা কেনাবেচা চললে বৃহত্তর আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দেন। খবর পেয়ে ময়নাগুড়ি থানার আইসি সুবল ঘোষের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। তবে এ ঘটনায় থানায় কোনও লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি।
বৃহস্পতিবার রাজগঞ্জে ক্ষুদ্র চা চাষি সংগঠনের পক্ষ থেকে বিডিও-র কাছে ডেপুটেশন দেওয়া হয়।তাঁদের দাবি অবিলম্বে কাঁচা পাতা কেনা শুরু, নিষিদ্ধ কীটনাশক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা,কাঁচা পাতার সহায়কমূল্য নির্ধারণ এবং রাসায়নিক সারের কালোবাজারি রোধ করতে হবে। কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন প্রবীণ কৃষক নেতা খরেন্দ্রনাথ রায়, মজিবুর রহমান ও হাফিজার রহমান।
সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন স্তরে আলোচনাও শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার কলকাতায় টি বোর্ডের ডেপুটি চেয়ারম্যান সি মুরুগানের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র চা চাষিদের প্রতিনিধিদের বৈঠকে অগস্টের মাঝামাঝি বিভিন্ন জেলায় সচেতনতা শিবির করার সিদ্ধান্ত হয়। একই রাতে চাষিদের প্রতিনিধি দল রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের সঙ্গে দেখা করে পরিস্থিতি তুলে ধরেন। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার নবান্নে কৃষি দপ্তরের সঙ্গে ক্ষুদ্র চা চাষিদের বৈঠক হয়।অন্যদিকে, শিলিগুড়িতে টি বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ে বটলিফ ফ্যাক্টরির প্রতিনিধিরাও আলোচনা করেন। শনিবার জলপাইগুড়ির সাংসদের উদ্যোগে ক্ষুদ্র চা চাষি, বটলিফ ফ্যাক্টরি,বহুজাতিক সংস্থা ও প্যাকেটার্সদের নিয়ে একটি যৌথ বৈঠক হওয়ার কথা।
নর্থবেঙ্গল টি প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নীরোজ পোদ্দার বলেন, ফ্যাক্টরিগুলি বন্ধ নয়।কিন্তু বহুজাতিক সংস্থা ও প্যাকেটার্সরা এনএবিএল স্বীকৃত পরীক্ষাগারের শংসাপত্র ছাড়া কাঁচা পাতা নিতে অস্বীকার করায় শিল্পের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
অন্যদিকে, ক্ষুদ্র চা চাষি সংগঠন 'সিস্টা'-র সভাপতি বিজয়গোপাল চক্রবর্তী জানান, মনোক্রোটেফসের মতো নিষিদ্ধ কীটনাশকের বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি নবান্নের বৈঠকে ক্ষুদ্র চা চাষিদের ‘চাষী’ তকমা দিয়ে আইনি স্বীকৃতি, প্রধানমন্ত্রী কৃষি সেচ ও ফসল বিমা যোজনার আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে দেখা হবে। মনোক্রোটেফস ব্যবহারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে এবং আসামের মতো এটি নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। শনিবারে সাংসদের বৈঠকে পাতা কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চা বাগান মজদুর ইউনিয়নের নেতৃত্ব অমূল্য রায়ের অভিযোগ, সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে চা শিল্প বন্ধের মুখে। কর্পোরেট সংস্থাগুলি বাজার থেকে এই মারণ কীটনাশক বিক্রি করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে হঠাৎ করে চাষিদের ঘাড়ে এমআরএল টেস্টের বোঝা চাপানো হয়েছে। পরিকাঠামো না গড়ে এই হঠকারী নীতির ফলে বিরাট অংশের কর্মক্ষেত্র বন্ধ হয়ে শ্রমিকরা না খেয়ে মরার উপক্রম হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
Comments :0