ব্রাজিলের নির্বাচনে পরাজয়ের পর নাটকীয়ভাবে দেশ ছেড়ে আমেরিকার মায়ামিতে পালিয়েছেন প্রেসিডেন্ট পদে পরাজিত প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো। জনসমক্ষে তার অনুপস্থিতি নিয়ে জল্পনার এক দিনেরও বেশি সময় পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমেরিকায় পৌঁছে নিজেকেই লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশের প্রকৃত ‘নেতা’ বলে দাবি করেছেন তিনি। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং তার বামপন্থী সহযোগীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন ফ্লাভিও। যদিও এই অভিযোগের সমর্থনে কোনও প্রমাণ তিনি পেশ করেননি।
সমাজমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে ফ্লাভিও দাবি করেন, রবিবার রাতে তার চোখের সামনেই নির্বাচনী জালিয়াতি ঘটেছে। নির্বাচনের ফলাফল কার্যত মেনে নেওয়ার পর সোমবার থেকে অবস্থান বদলে ফের সেই ফল বাতিলের দাবিতে সরব হয়েছেন তিনি। ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ক্রিস্তিয়ানো জানিনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছেন ফ্লাভিও। লুলার প্রাক্তন আইনজীবী জানিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আদালতের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ কার্যকলাপের’ অভিযোগ আনেন। তার দাবি, প্রথম ও দ্বিতীয় দফার ভোটের মধ্যে ১ কোটি ভোটের ব্যবধান তৈরি হওয়ার বিষয়টি আদালত অনুমোদন করেছে, যা গাণিতিকভাবে অসম্ভব। তবে এই দাবির পক্ষেও কোনও প্রমাণ সামনে আনেননি তিনি।
ফ্লাভিওর দেশত্যাগ ঘিরে বিতর্ক আরও বেড়েছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনে পরাজয়ের পর চলতি তদন্তগুলির কারণে তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন, এমন আশঙ্কা থেকেই তার পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। কিন্তু সেই নির্দেশ মানেননি প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। পরিবর্তে আর্জেন্টিনা ও ইকুয়েডর হয়ে আমেরিকায় পৌঁছন তিনি।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর ব্রাসিলিয়ায় সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন ফ্লাভিও বলসোনারো। কিন্তু সেই ভাষণে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করেন তিনি। বরং ভোটের ফল বাতিল করার জন্য আইনি লড়াই চালানোর কথা জানান।
ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ফ্লাভিও দাবি করেন, সুপ্রিম কোর্ট তাকে দেশ ছাড়তে নিষেধ করেছে। তার বক্তব্য, এই নিষেধাজ্ঞা তাকে ভয় দেখানোর স্পষ্ট চেষ্টা। তিনি বলেন, দেশ ছাড়ার কোনও পরিকল্পনা তার ছিল না এবং পাসপোর্ট জমা দিয়ে এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করবেন। তার বিরুদ্ধে চলা একাধিক তদন্তের মধ্যে একটির সঙ্গে এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা যুক্ত ছিল।
সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়ায়, ব্রাসিলিয়া থেকে ফ্লাভিওর সরকারি কনভয় বেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর পুয়ের্তো ইগুয়াজু থেকে বিমানে ওঠার পরিকল্পনা করছেন। তবে তিনি সত্যিই দেশ ছেড়েছেন কি না, তা নিয়ে তখনও নিশ্চিত তথ্য ছিল না। সংবাদ সংস্থা এএফপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের একটি সূত্র জানায়, তার ব্রাজিলীয় ও কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে, ব্রাসিলিয়ায় ফ্লাভিওর নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্বে থাকা রোজেরিও মারিনহো সংবাদমাধ্যমকে জানান, তার নেতার অবস্থান সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। মারিনহোর বক্তব্য, সকালে ফ্লাভিওর কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছিলেন। তাতে ফ্লাভিও জানিয়েছিলেন, সেদিন কিছুটা সময় অপেক্ষা করে পরে তাদের সঙ্গে কথা বলবেন। এরপর আর কোনও যোগাযোগ হয়নি।
বুধবার শেষ পর্যন্ত জানা যায়, প্রথম খবর প্রকাশিত হওয়ার সময় ফ্লাভিও ব্রাজিলেই ছিলেন। আর্জেন্টিনার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানায়, বুধবার তিনি ব্রাজিল থেকে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেন। ব্রাজিলের ফোজ দো ইগুয়াসু শহরের সঙ্গে আর্জেন্টিনার পুয়ের্তো ইগুয়াজুকে যুক্ত করা তানক্রেদো নেভেস আন্তর্জাতিক সেতু দিয়ে বৈধ ভ্রমণ নথি ব্যবহার করেই তিনি সীমান্ত পার হন বলে জানানো হয়।
ব্রাজিলীয় ও কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল হলেও ফ্লাভিওর কাছে ইতালির পাসপোর্টও রয়েছে। ব্রাসিলিয়া থেকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত সীমান্তে তিনি কীভাবে পৌঁছেছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। ব্রাজিলের পুলিশের বক্তব্য, তার দেশত্যাগের কোনও সরকারি নথি নেই। পাসপোর্ট জমা না দেওয়ার বিষয়টি তদন্ত করা হলেও এই কারণে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পলাতক ঘোষণা করা হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
আর্জেন্টিনা থেকে একটি ব্যক্তিগত বিমানে ফ্লাভিও ও তার পরিবারের সদস্যরা ইকুয়েডরের বন্দর শহর গুয়ায়াকিলে পৌঁছন। এএফপি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ফাঁকা বিমানবন্দরে জ্বালানি ভরার জন্য অল্প সময়ের বিরতি নেয় বিমানটি। এরপর সেটি মায়ামির উদ্দেশে রওনা দেয়। আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরুর প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ফ্লোরিডার ওপা-লকায় অবতরণ করে বলসোনারো পরিবারের বিমান।
আমেরিকার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করেই ফ্লাভিও আমেরিকায় প্রবেশ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ফ্লাভিও বলসোনারোর আমেরিকায় প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলসোনারো পরিবারের দীর্ঘদিনের সমর্থক ট্রাম্প বলেন, ফ্লাভিওকে আমেরিকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এর বাইরে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
এদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকায় থেকেই নির্বাসিত রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন ফ্লাভিও। ব্রাজিলের নির্বাচনে পরাজয়ের পর লুলা সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়াই তার লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকায় ট্রাম্প প্রশাসন এই বিষয়ে কতটা সক্রিয় ভূমিকা নেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ওয়াশিংটনে বলসোনারোর সহযোগীদের চাপ থাকলেও, লুলার পুনর্নির্বাচনের ফলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে আগ্রহী কি না, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলেনি বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে একদিকে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ব্রাজিলের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন ফ্লাভিও, অন্যদিকে আমেরিকায় আশ্রয় নিয়ে নতুন রাজনৈতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করছেন তিনি। তার এই পদক্ষেপ আগামী দিনে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ওয়াশিংটন-ব্রাসিলিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলবে, এখন সেটাই দেখার।
Brazil
নির্বাচনে পরাজয়ের পর আমেরিকায় ফ্লাভিও বলসোনারো, নির্বাসন থেকেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রস্তুতি!
×
Comments :0