বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার উপর ক্রমশ বাড়ছে এল নিনোর প্রভাব। প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা থেকে তৈরি হওয়া এই জলবায়ুগত পরিস্থিতি এ বছর ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর প্রভাবে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা এবং তীব্র ঝড়ের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি আগামী ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে তাপজনিত কারণে ৩ লক্ষ ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের একটি গবেষণাভিত্তিক মানচিত্র।
‘এল নিনো হিট মর্টালিটি ট্র্যাকার’ নামে ওই মানচিত্রে বিশ্বের কোন কোন অঞ্চলে তাপের কারণে মৃত্যুর আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি, তার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ চলতি পরিস্থিতিকে ‘সুপার এল নিনো’ বলেও উল্লেখ করছেন।
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোনের বক্তব্য, ‘চরম তাপের প্রাণঘাতী প্রভাব আগে থেকে অনুমান করতে পারা একটি বড় অগ্রগতি। এর ফলে কোথায় মানুষের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রাণহানি ঘটার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার সুযোগ পাবেন নীতিনির্ধারকেরা।’ বর্তমান এল নিনো পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে এই ট্র্যাকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেও তার দাবি।
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর থেকে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত তাপজনিত মৃত্যুর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে পারে গ্লোবাল সাউথ বা বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলি। এই তালিকায় ভারতের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
মানচিত্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ছয় মাসে ভারতে তাপজনিত কারণে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এর মধ্যে অধিকাংশ মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে আগামী বছরের মার্চ মাসে। তবে এই সংখ্যা একটি পূর্বাভাস, নিশ্চিত মৃত্যুর হিসাব নয়।
তালিকায় ভারতের কাছাকাছি রয়েছে নাইজেরিয়া। সেখানে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫৬ হাজার হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও তাপের অন্যতম বিপজ্জনক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। ইন্দোনেশিয়ায় তাপজনিত কারণে প্রায় ২৯ হাজার মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ব্রাজিলে এই সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার হতে পারে বলে পূর্বাভাস।
এল নিনোর প্রভাব শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বড় শহরগুলিতে বায়ুদূষণের পরিস্থিতিও আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) জানিয়েছে, চলতি বছরের এল নিনো ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী পরিস্থিতিগুলির মধ্যে অন্যতম। সংস্থার সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছনোর আগে এই পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে।
আবহাওয়া সংস্থার বক্তব্য, এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটায় কোথাও খরা, আবার কোথাও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর প্রভাব ২০২৭ সালের গোড়া পর্যন্ত বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩.০৮ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা চলতি এল নিনো পরিস্থিতির তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বাতাসের প্রবাহ, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটে। তার প্রভাব পড়ে বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া ও কৃষি উৎপাদনের উপর।
সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এল নিনো দেখা যায় এবং তা প্রায় নয় থেকে বারো মাস স্থায়ী হতে পারে। এর বিপরীত পরিস্থিতিকে বলা হয় লা নিনা। এই দুই পর্যায়ের মাঝখানে নিরপেক্ষ পরিস্থিতিও থাকে।
চলতি এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণ শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়, বরং তার সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি, বায়ুদূষণ, কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতি এবং জলসংকট। বিশেষ করে ভারত-সহ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রস্তুতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
El Nino
‘সুপার এল নিনো’-র দাপটে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের আশঙ্কা, আগামী ৬ মাসে মৃত্যু হতে পারে ৩ লক্ষ ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষের!
×
Comments :0