Post Editorial

জননিরাপত্তা নাকি আতঙ্কের শাসন

সম্পাদকীয় বিভাগ উত্তর সম্পাদকীয়​

শমীক লাহিড়ী
 

‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ইতিহাস মূলত আইনি প্রক্রিয়া ও নাগরিকের সুরক্ষা-কবচগুলো মেনে চলার ওপর জোর দেওয়ারই ইতিহাস।’
— বিচারপতি এইচ আর খান্না (ADM Jabalpur v. Shivkant Shukla, 1976)
সংগঠিত অপরাধ দমন এবং জননিরাপত্তা রক্ষার নামে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬’এনেছে। সরকার বলছে, ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ ও দাগি অপরাধী’দের মোকাবিলার জন্যই নাকি এই আইন জরুরি। কিন্তু আইনটির খসড়া পড়লে স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি কেবল অপরাধ দমনের আইন নয়; বরং শাসকের হাতে নাগরিকের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার অপরিসীম ক্ষমতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের অবশ্যই সমাজকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব আছে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে যদি ব্যক্তিস্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনের মৌলিক নীতিগুলোকেই দুর্বল করা হয়, তবে গণতন্ত্র ও পুলিশি রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য থাকে না।
ইতিহাসের শিক্ষা খুব স্পষ্ট। নিরাপত্তার নামে যে আইনগুলি তৈরি হয়, সঙ্কট কেটে যাওয়ার পরও সেগুলি বহাল থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো শাসকের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। ফলে প্রশ্ন এটা নয় যে সমাজে অপরাধী আছে কি না — নিশ্চয়ই আছে, এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আসল প্রশ্ন হলো, দেশে নতুন করে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা তৈরি হলো সবে। এত ফৌজদারি আইন থাকা সত্ত্বেও সরকারকে কি এমন ক্ষমতা দেওয়া উচিত, যাতে আদালতের স্বাভাবিক বিচার পাওয়ার অধিকারকে এড়িয়ে একজন মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যায়?
এই বিলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো প্রতিরোধমূলক আটক (Preventive Detention)-এর ওপর অতিরিক্ত গুরুত্বদান। অর্থাৎ, আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই, ভবিষ্যতে কেউ অপরাধ করতে পারে —এই আশঙ্কার ভিত্তিতে যে কাউকে ১ বছর পর্যন্ত সরকার জেলে আটক রাখাতে পারবে কার্যত বিনা বিচারে। ফৌজদারি আইনের মৌলিক নীতি হলো — আগে বিচার, তারপর শাস্তি। এই বিল সেই নীতিকে উলটে দিয়ে কার্যত আগে আটক, পরে বিচারের পথ খুলে দেবে। ইতিহাসে এমন ক্ষমতা কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে, কঠোরভাবে আদালতের নজরদারির অধীনে মেনে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই সুরক্ষা দুর্বল হয়ে গেলে এই ধরনের আইনের অপব্যবহার অনিবার্য হয়ে ওঠে।

বিলটির আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’-এর অত্যন্ত বিস্তৃত ও অস্পষ্ট সংজ্ঞা। এতে কেবল সুনির্দিষ্ট অপরাধ নয়, এমন আচরণও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা মানুষের মধ্যে ‘ভয়’, ‘আতঙ্ক’ বা ‘নিরাপত্তাহীনতা’ সৃষ্টি করতে পারে, কিংবা বৈধ ব্যবসা বা জীবিকায় বাধা দিতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এই শব্দগুলো যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও, আইনগতভাবে এগুলোর কোনও নির্দিষ্ট সীমানা নেই। ফলে কোন কাজকে সমাজবিরোধী বলা হবে, তা মূলত প্রশাসন তথা শাসকের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করবে।
কিন্তু আইনের শাসনের অন্যতম ভিত্তি হলো তার নিশ্চয়তা প্রদান (legal certainty)। একজন নাগরিকের স্পষ্টভাবে জানার অধিকার আছে, কোন কাজটি অপরাধ এবং কোনটি নয়। আইনের ভাষা যত অস্পষ্ট হয়, ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তত বাড়ে। একই ঘটনার জন্য একএক জন কর্মকর্তা একএক ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফলে আইন নয়, প্রশাসনিক ব্যাখ্যাই হয়ে ওঠে শেষ কথা।
একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে ‘গুন্ডা’ শব্দটির সংজ্ঞাও। বিল অনুযায়ী, শুধু নির্দিষ্ট অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি নন, যাকে প্রশাসন তথা শাসকের চোখে বা সমাজের দৃষ্টিতে ‘বিপজ্জনক’ বলে মনে হয়, তাকেও এই আইনের আওতায় আনা যাবে। কিন্তু গণতান্ত্রিক বিচারব্যবস্থায় রটনা বা গুজব কখনোই প্রমাণ নয়। পুলিশের সন্দেহ বা প্রশাসনের ধারণা আদালতের রায়ের বিকল্প হতে পারে না। আমাদের বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো, আদালতে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষ নির্দোষ। ব্যক্তিস্বাধীনতা কখনোই প্রশাসনের অনুমান বা জনশ্রুতির ওপর নির্ভর করতে পারে না।
যদিও বিলে বলা হয়েছে যে অতীতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া বা একাধিক চার্জশিট থাকার মতো কিছু শর্ত বিবেচনা করা হবে, কিন্তু আসলে প্রশাসন তথা শাসককে যথেষ্ট বিস্তৃত বিবেচনাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকার যদি মনে করে জননিরাপত্তার স্বার্থে কাউকে আটক রাখা প্রয়োজন, তবে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পথ খোলা রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে। ভারতের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা বলছে, যখনই ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন প্রশাসনের ‘সন্তুষ্টি’ বা ‘সিদ্ধান্ত’-এর ওপর নির্ভর করেছে, তখনই ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, এই আইনে পুলিশকে ব্যাপক তল্লাশি, বাজেয়াপ্ত করা ও আটক করার অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ‘সদুদ্দেশ্যে’ কাজ করার অজুহাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথকেও সীমিত করা হয়েছে। নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আইনে এমন ধারা নতুন নয়, কিন্তু কার্যকরভাবে আদালতের নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকলে এই ধরনের ‘দায়মুক্তি’ প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারের প্রবনতা বাড়ায়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার প্রশাসনিক ক্ষমতায় নয়; সেই ক্ষমতার ওপর আইনের নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার মধ্যেই তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে। প্রশাসক যদি বিচার ব্যবস্থায় বিশেষ ধরণের ‘আইনি রক্ষাকবচ’ পায়, তাহলে সে মর্জিমাফিক কাজ করার অবাধ স্বাধীনতা পায় এবং মানুষের অধিকার সঙ্কুচিত হয়ে যায়। এর অসংখ্য উদাহরণ আমাদের দেশ সহ বিশ্বের নানা দেশেই দেখা গেছে। 
এই বিলের সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক প্রশ্নটি হলো প্রতিরোধমূলক আটক (Preventive Detention)। অর্থাৎ, আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই একজন মানুষকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ১ বছর পর্যন্ত জেলে বন্দি করে রাখা যাবে। ভারতের সংবিধানের ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিরোধমূলক আটকের ব্যবস্থা থাকলেও, সংবিধান প্রণেতারা একে কখনোই শাসনের স্বাভাবিক উপায় হিসেবে ভাবেননি। বরং একে একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবেই দেখা হয়েছে, যার ব্যবহার কঠোর সাংবিধানিক সুরক্ষা ও বিচার ব্যবস্থার নজরদারির অধীন হওয়া উচিত।
প্রস্তাবিত বিলে আটকের কারণ জানানো এবং উপদেষ্টা বোর্ডের মাধ্যমে পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেখানে আইনজীবীর সহায়তা নিশ্চিত করা হয়নি। উপরন্তু, ‘জননিরাপত্তা’-র অজুহাতে প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য  গোপনও রাখতে পারবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পূর্ণ বিবরণই না জানলে আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন কীভাবে? ন্যায়বিচারের অন্যতম শর্ত হলো — মানুষ যেন অভিযোগ জানে এবং তার বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে নিজের বক্তব্য পেশ করতে পারে। এই বিল সেই মৌলিক নীতিকেই লঙ্ঘন করে।
সুপ্রিম কোর্টও বারবার সতর্ক করেছে যে, প্রতিরোধমূলক আটক একটি ‘অ-সাধারণ ক্ষমতা’, যার ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত হওয়া উচিত। ক্ষুদিরাম দাস বনাম পশ্চিমবঙ্গ সরকার (১৯৭৫) মামলায় আদালত স্পষ্ট জানিয়েছিল, প্রশাসনের ‘সন্তুষ্টি’ বিচার ব্যবস্থার পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। আটকের আদেশের ভিত্তি যথার্থ কি না, সিদ্ধান্তটি প্রাসঙ্গিক তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে কি না — তা পরীক্ষা করার পূর্ণ অধিকার আদালতের রয়েছে। আদালতকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ এই প্রস্তাবিত আইনে রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার বিরোধী কন্ঠকে রুদ্ধ করার পথ খোলার চেষ্টাই সরকার করছে, শপথ নেওয়ার মাত্র ৪০ দিনের মধ্যেই, এই দানবীয় আইনের প্রস্তাব এনে।  
একইভাবে, এ কে রায় বনাম ভারত সরকার (১৯৮২) মামলায় জাতীয় নিরাপত্তা আইন বহাল রাখলেও সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, এই ধরনের আইন সবসময় সংকীর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে, কারণ এগুলো ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হানে। আর রেখা বনাম তামিলনাড়ু সরকার (২০১১) মামলায় আদালত আরও এক ধাপ এগিয়ে জানায়, যেখানে সাধারণ ফৌজদারি আইনেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, সেখানে প্রতিরোধমূলক আটককে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা ক্ষমতার অপব্যবহার। এই পর্যবেক্ষণ বর্তমান বিলের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ বিলে যেসব অপরাধের কথা বলা হয়েছে, তার অধিকাংশই ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, অস্ত্র আইন, মাদক আইন কিংবা অন্যান্য বিদ্যমান আইনের আওতায় ইতিমধ্যেই বিচারযোগ্য।
ভারতের ইতিহাসও এই প্রশ্নে আমাদের সতর্ক করে। জরুরি অবস্থার সময় মিসা (MISA) রাজনৈতিক বিরোধী, সাংবাদিক ও সমাজকর্মীদের দমনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। পরে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (NSA), ইউএপিএ (UAPA) এবং বিভিন্ন রাজ্যের গুন্ডা আইন নিয়েও বারবার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন মোদী সরকারের বিরোধিতা করে ফাদার স্ট্যান স্বামী, সুধা ভরদ্বাজ, আনন্দ তেলতুম্বড়ে, গৌতম নওলাখা, ভরভারা রাও, উমর খালিদ, শারজিল ইমাম সহ বহু ব্যক্তি বিচার শেষ হওয়ার আগেই বছরের পর বছর কারাবন্দি ছিলেন অথবা আছেন। প্রতিটি মামলার তথ্য ও অভিযোগ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট — কঠোর নিরাপত্তা আইন অনেক সময় বিচার-পূর্ব আটককেই কার্যত শাস্তিতে পরিণত করে ফেলে।
এই কারণেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন স্বেচ্ছাচারী আটককে ব্যক্তিস্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে দেখে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR)-এর ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR), যার সদস্য ভারতও, স্পষ্টভাবে বলে - আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও ন্যায্য প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। প্রতিরোধমূলক আটক আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেনি, কিন্তু একে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে কঠোরভাবে বিচার ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত পর্যালোচনার আওতায় রাখার কথা বলেছে।
এই বিলের আরেকটি বিপজ্জনক দিক তার ‘চিলিং এফেক্ট’। অর্থাৎ, মানুষকে সরাসরি গ্রেপ্তার না করেও এমন এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করতে দ্বিধা বোধ করেন অথবা ভয় পান। নিঃসন্দেহে সংগঠিত অপরাধ, দখলদারি, তোলাবাজি বা হিংসার বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যদি বিচারব্যবস্থার পরিবর্তে প্রশাসনিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আইনের শাসন। গণতন্ত্রের শক্তি অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ায় নয়; বরং নিরপরাধ মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা করেও অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে।
'পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬' তাই কেবল একটি আইন নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে প্রশাসনের সন্দেহই মানুষের স্বাধীনতা, অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট? নাকি এমন একটি গণতন্ত্র, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনতা এবং অধিকার কেবল আদালতে ন্যায্য বিচারের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা যাবে!
ভারতের সংবিধান আমাদের দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিতে বলেছে। জননিরাপত্তা অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে ব্যক্তিস্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনকে বিসর্জন দেওয়া যায় না। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো — রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানো সহজ; কিন্তু একবার হারিয়ে যাওয়া নাগরিকের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন। সম্প্রতি চুড়ান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বৈরাচারী তৃণমূল সরকারকে সরাতে কিন্তু ১৫ বছর লাগল। ফলে বাংলার মানুষ ‘ঘরপোড়া গোরু, আকাশে সিঁদূরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়’।  
সভ্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল কথাই হলো — ব্যক্তি আজ কী অপরাধ করেছে, তার বিরুদ্ধে সরকারপক্ষের কাছে কী অকাট্য তথ্যপ্রমাণ আছে, তার ভিত্তিতেই আদালত বিচার করবে এবং অপরাধী সাব্যস্ত হলে তবেই শাস্তি হবে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রস্তাবিত 'পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬' রাজ্যের মানুষের মৌলিক অধিকার এবং স্বাধীনতার আইনি সুরক্ষাকেই কেড়ে নিতে চাইছে। জননিরাপত্তা রক্ষার দোহাই দিয়ে আনা এই বিলটি প্রকৃতপক্ষে এক ভয়াবহ আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টির আইনি হাতিয়ার হয়ে ওঠার সমস্ত লক্ষণ ধারণ করে আছে।
ফ্যাসিস্ট মতবাদের জনক বেনেটো মুসোলিনি-এর শাসনে একাধিক আইন পাস হয়, যেগুলো সম্মিলিতভাবে Leggi Fascistissime বা ‘চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদী আইনসমূহ’ নামে পরিচিত। এসব আইনগুলির মাধ্যমে — বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা, পুলিশকে প্রচুর ক্ষমতা দেওয়া, প্রশাসনিক আদেশে বিরোধীদের নির্বাসন বা আটক করা সম্ভব হতো।
এডলফ্ হিটলার ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সেনাপতি, পরে যিনি রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন, সেই পল ফন হিন্ডেনবুর্গ (Paul von Hindenburg)-এর স্বাক্ষরে জরুরি আইন জারি করে। এই আইনের মাধ্যমে — ব্যক্তিস্বাধীনতা স্থগিত করা হয়। ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা বাড়ানো, সংবাদপত্র, সভা-সমিতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’র নামে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন অভিযান চালানো হয়।
এদের মতাদর্শেই দীক্ষিত আরএসএস-বিজেপি। ফলে এই ধরণের আইন যে তারা আনবে, এটাই স্বাভাবিক। সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে এর বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলাই হোক সব গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের আশু কর্তব্য।

 

Comments :0

Login to leave a comment