একদিকে বর্ষার চরম খামখেয়ালিপনা, অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন এলাকায় মেঘভাঙা বৃষ্টির দাপট— এই দুই বিপরীত আবহাওয়ার জেরে কার্যত দ্বিমুখী সংকটের মুখে পড়েছে ভারত। ভারতের অধিকাংশ এলাকায় এখনও পর্যন্ত স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টি হওয়ায় খরার আশঙ্কা বাড়ছে। একই সময়ে কয়েকটি রাজ্যে অতি ভারী বৃষ্টিতে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা সামনে এসেছে।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের (আইএমডি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩৮ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। এই সময়ে দেশে মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ১০৮.১ মিলিমিটার, যেখানে স্বাভাবিক গড় হওয়ার কথা ছিল ১৭২.৯ মিলিমিটার।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রায় ৭৯ শতাংশ ভৌগোলিক এলাকা, অর্থাৎ ২৯টি রাজ্যের বিস্তীর্ণ অংশে বৃষ্টির ঘাটতি বা 'বড় ধরনের ঘাটতি' হয়েছে। আইএমডি পর্যবেক্ষণাধীন ৭৪১টি জেলার মধ্যে ৫৩৫টি জেলায় স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম বৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ২০১টি জেলায় স্বাভাবিক বা তার বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মধ্য ভারতে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে স্বাভাবিকের তুলনায় ৪৫ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে ঘাটতি ৪০ শতাংশ, উত্তর-পশ্চিম ভারতে ৩০ শতাংশ এবং দক্ষিণ উপদ্বীপে প্রায় ২৬ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।
তবে দেশের কিছু অংশে ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টো। ১ জুলাই কয়েকটি রাজ্যে স্বল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টি হয়, যা কার্যত মেঘভাঙা বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি করে। এর জেরে বহু এলাকায় বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ চিত্র দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশায়। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় ৬০৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। ওডিশার বৌধে বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় ১,৭০০ শতাংশ, সোনেপুরে ১,৩২১ শতাংশ এবং অঙ্গুলে ৭৬৬ শতাংশ বেশি হয়েছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের সাম্বায় ১,০৩৬ শতাংশ এবং রাজৌরিতে ২৫৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। নাগাল্যান্ডের ফেক জেলায় স্বাভাবিকের তুলনায় ৯৯৬ শতাংশ এবং অসমের পশ্চিম কার্বি আংলংয়ে ৫০০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে।
উত্তর ভারতের পাহাড়ি এলাকাগুলিও প্রবল বৃষ্টির কবলে পড়েছে। পাঞ্জাবের পাঠানকোটে ৯০৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টির পাশাপাশি হিমাচল প্রদেশের উনা, কাংড়া, কুল্লু এবং চম্বা জেলায় স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকশো শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস, সেহোর ও নিয়াওয়ারি জেলায় অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। মহারাষ্ট্রের মুম্বই শহর এবং পালঘরেও স্বাভাবিকের তুলনায় যথাক্রমে ২২৪ শতাংশ ও ৩০৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাতের ফলে একাধিক এলাকায় জল জমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্ষার এই বৈপরীত্যই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। দেশের একাংশে যখন কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তখন অন্য অংশে বন্যা মোকাবিলা ও উদ্ধারকাজে প্রশাসনকে নাজেহাল হতে হচ্ছে। একই সঙ্গে খরা ও বন্যার মোকাবিলা করা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন চরম আবহাওয়ার প্রবণতা আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
Weather
মৌসুমী বায়ুর অগ্রগতি শ্লথ, চরম আবহাওয়ার জোড়া ধাক্কায় চাপে কৃষি ও জনজীবন
×
Comments :0