অনিন্দিতা দত্ত: শিলিগুড়ি
বিজেপি-আরএসএস প্রকৃত গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। সংবিধান ঘোষিত বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যকে বিশ্বাস করে না, বহুত্বের স্বীকৃতি চায় না। ওরা অধিকার কেড়ে নেয়। একত্ববাদ চাপিয়ে দেয়। দার্জিলিঙের পাহাড়ের মানুষকে এরা স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃত অধিকার দিতে পারে না।
রবিবার দার্জিলিঙের পাহাড়ে একথা বলেছেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। এদিন সিপিআই(এম)’র দার্জিলিঙ ও কার্শিয়াঙ এরিয়া কমিটির সাধারণ সভায় বক্তব্য রাখেন মহম্মদ সেলিম। দার্জিলিঙ শহরে কলা মন্দির হলে হয়েছে এই সভা। দার্জিলিঙে রাহুল সাংকৃত্যায়নের মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানান সেলিম। পরে সাংবাদিক সম্মেলনও করেন তিনি।
সম্প্রতি ‘পাহাড়ের সম্যার রাজনৈতিক সমাধানে’ টাস্ক ফোর্স গঠনের ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। আর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অমিত শাহ সফরে এসে বৈঠক করেছেন। কিন্তু তারপর জিটিএ-তে প্রশাসক বসানো হয়েছে।
এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নে সেলিম বলেন, কার্যকরী স্বায়ত্তশাসন না দিলে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা কাজ করতে পারে না। সে কারণেই নির্বাচিত প্রতিনিধি জরুরি। তিনি বলেন, ব্রিটিশ শাসনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসকে স্বায়ত্তশাসনের জন্য ছ’বার চিঠি লিখতে হয়েছিল। প্রশাসনিক আধিকারিক দিয়ে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন হয় না। এরপর দেখবেন বিধানসভাতেও বিধায়কদের কোনও অধিকার থাকবে না। দিল্লি থেকে যা বলা হবে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করে দেবে।
তিনি বলেন, পাহাড়ের একটি দাবিও মানা হয়নি। এখন টাস্ক ফোর্সের কথা বলা হচ্ছে। আমরা বামপন্থীরা বারবারই বলেছি সাংবিধানিক ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী এখানে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় এনে পাহাড়ে নির্বাচিত স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গড়তে হবে। পাহাড়ের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। বিজেপি নানা সময়ে নানা কথা বলছে। এখন বলছে, টাস্ক ফোর্স গড়ার কথা। কিছুদিন পরে অন্য কথা বলবে।
সেলিমের সঙ্গে ছিলেন সিপিআই(এম) দার্জিলিঙ জেলা কমিটির সম্পাদক সমন পাঠক, সিপিআই(এম) নেতা ময়ূখ বিশ্বাস, গৌতম ঘোষ, দিলীপ সিং, সাচিন খাতি, কেবি ওয়াতার প্রমুখ।
পাঠক জানিয়েছেন যে অক্টোবর এবং নভেম্বরে পাহাড়ে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে জনতার কাছে যাবে সিপিআই(এম)। পাহাড়ের সমস্যার স্থায়ী সমাধান, পরিবেশ লুট, বিশেষ করে, কর্পোরেটের থাবায় পরিবেশ তছনছ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলি নিয়ে পৌঁছাবে পার্টি। তিনি বলেন, পরিবেশের বিপর্যয়ে সাধারণ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। পাশাপাশি চা বাগানে শ্রমিকদের সঙ্কট তীব্র। এমন বিষয়গুলি নিয়ে পাহাড়ে সাধারণ মানুষের কাছে যাব। জনমত গড়ে তোলা হবে।
সিপিআই(এম)’র সঙ্গে অতীতে ছিলেন, কিন্তু নানা কারণে এখন যুক্ত নন, এমন অংশের কাছেও পৌঁছানো হবে।
সাংগঠনিক প্রস্তুতি প্রসঙ্গে সেলিম বলেন, দার্জিলিঙ এবং কার্শিয়াঙে দুই এরিয়া কমিটির সদস্যদের নিয়ে সাধারণ সভা ছিল। রাজনৈতিক পরিবেশ এবং পাহাড়ের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের যুবক-যুবতীরা এসেছেন। সিপিআই(এম)-কে নিয়ে অপপ্রচারের আসল চেহারা বুঝছেন বহু মানুষ।
কিন্তু পাহাড়ের মূল্য সমস্যা কী? বন্যায় ভেসে যাচ্ছে বিভিন্ন অংশ, মানুষ ঘরছাড়া হচ্ছেন। চা বাগানের শ্রমিকদের সমস্যা বাড়ছে। রাস্তাঘাট, পানীয় জলের সমস্যা রয়েছে। রয়েছে জমির অধিকারের সমস্যা, কাজের সমস্যা, শিক্ষার সমস্যা, সুরক্ষা সমস্যা। এই সব বিষয়কে নজরের আড়ালে পাঠানো হচ্ছে।
সেলিম বলেন, হামেশা দিল্লি থেকে বলা হয় যে কিছু হতে যাচ্ছে। আর এখানে সেই সুরে কিছু লোক তৎপর হয়ে যায়। বিজেপি সরকার ফ্যাসিস্ত কায়দায় দেশ চালাচ্ছে। ওরা জনতার আসল সমস্যা থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাখতে চায়। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, এসআইআর’র সময় আমরা তা দেখেছি। বাংলা, বিহার থেকে দক্ষিণ ভারতে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ। পাহাড়ের বাসিন্দা, সংখ্যালঘু, আদিবাসী সহ বিভিন্ন অংশকে বাদ করা হয়েছে। অনেকের নথিপত্রের সমস্যা রয়েছে, তাকে কাজ লাগিয়ে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তখন বিজেপি বলেছিল আমরা বিরোধিতা করছি বলে দেশবিরোধী।
দার্জিলিঙের পাহাড়ে রাহুল সাংকৃত্যায়নকে শ্রদ্ধা।
সেলিম বলেন, বিজেপি সরকার আসীন হওয়ার পর পঞ্চায়েত, পৌরসভার মতো স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বন্ধ। এই প্রসঙ্গে সেলিম বলেন, মমতা ব্যানার্জির সরকার এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে দখলদারি চালিয়েছে, লুটপাট চালিয়েছে। দার্জিলিঙেও পঞ্চায়েত দখল হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চালাতে দেয়নি। আর এখন তো পুরো বন্ধ। দার্জিলিঙে জিটিএ যে উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল, তাকেও চলতে দেওয়া হচ্ছে না।
সেলিম বলেন, বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ত্রিপাক্ষিক সমঝোতা হয়েছিল। আমরা বলেছিলাম পাহাড়ে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় এই সংস্থাকে এনে মর্যাদা দেওয়া উচিত। এই কাজ করা গেলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের নীতি অনুযায়ী স্বশাসিত সংস্থার হাতে অর্থ থেকে প্রয়োজনীয় সম্পদের বরাদ্দ নিশ্চিত করা যেত।
সেলিম মনে করিয়েছেন যে বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে রাজ্যে বিকেন্দ্রীকরণের নীতি পঞ্চায়েত, পৌরসভার ক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। ত্রিপুরায় বামফ্রন্ট সরকারই পার্বত্য এলাকায় নির্বাচিত অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল গঠন করেছে।
সেলিম বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে বিজেপি এবং আরএসএস’র মনোভাবকে ব্যাখ্যা করেন সবিস্তারে। তিনি বলেন, সব অঞ্চলের বাসিন্দারাই আঞ্চলিক বহু সমস্যা নিজেরা সবচেয়ে ভালো উপায়ে সমাধান করতে পারেন। বিজেপি-আরএসএস তা চায় না। ওরা এই বহুত্ব, বৈচত্রকে মান্যতা দেয় না। স্বাধীনতার সত্তর বছরে বিভিন্ন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে পূর্ণরাজ্যের মর্যাদা দিতে দেখেছি। এরা পূর্ণরাজ্য কাশ্মীরকে ভেঙে দু’টো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করেছে। কাশ্মীরে অস্থিরতা তৈরি করেছে। লাদাখে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন চলছে। সেই আন্দোলনের নেতা সোনম ওয়াঙচুককে জেলে ভরেছে। শিক্ষার অধিকারের দাবিতে দিল্লির যন্ত মন্তরে আন্দোলনের সময়েও আমরা তা দেখেছি।
সেলিম বলেন, বিজেপি মানবাধিকার বা গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। আলাদা আলাদা ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-রেওয়াজের সহাবস্থানকে মানে না। কারণ ওরা এই বহুত্বকে স্বীকার করে না। ওরা একত্ববাদ চাপিয়ে দেয়। সংবিধানের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের ধারণাকে মানে না।
সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ সংক্রান্ত এক প্রশ্নে সেলিম বলেন, আমরা বামপন্থীরা সংশ্লিষ্ট বিলের চর্চায় গঠিত সংসদীয় কমিটিতে পূর্ণ বিরোধিতা করে বক্তব্য জানিয়েছি। কতজনকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে ওই আইনে? দিল্লি, রাজস্থান, বা গুজরাটের মতো পশ্চিম সীমান্তের রাজ্যগুলিতে পাকিস্তান থেকে কিছু মানুষ এসেছিলেন। যারা পাকিস্তানের ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট ব্যবহার করতে পারতেন না বলে চিকিৎসক, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের মতো বিভিন্ন পেশায় যোগ দিতে পারতেন না। তাদের সুবিধা দেওয়ার কথা ভেবে এই আইন তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই আইন পূর্ব ভারতে সমস্যা বাড়িয়েছে। কখনও বাংলাদেশি, কখনও রোহিঙ্গার নাম করে মানুষকে ভাগ করেছে। দেশের মানুষকে দুশমন বলে দাগিয়ে দিয়েছে। সেলিম বলেন, চেহারা, ভাষা, পোশাক আলাদা হলেই তাকে দেশের শত্রু বলছে। সব ফ্যাসিস্ট এই কায়দায় চলে। এই আইন নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন নয়, বেনাগরিক করার আইন। আর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার সঙ্গে এই আইনের সম্পর্ক কি?
Comments :0