দীপশুভ্র সান্যাল: জলপাইগুড়ি
এ বছর এখনও উত্তরবঙ্গে তিস্তার বড় ধরনের বন্যা দেখা না গেলেও নদী ও পাহাড়ের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা জেগেছে।
তিস্তায় দীর্ঘদিন ধরে পলি ও বালি জমে নদীর স্বাভাবিক জলধারণ ও জলপ্রবাহের চরিত্র বদলাচ্ছে। অন্যদিকে সিকিম ও উত্তর-পূর্ব হিমালয়ে রাস্তা, সুড়ঙ্গ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও নির্মাণকাজের জন্য পাহাড় কাটার ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে। ফলে অতি ভারী বৃষ্টি, হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে জল নেমে আসা বা পাহাড়ে বড় ভূমিধস এক সঙ্গে হলে তিস্তার নিম্ন অববাহিকায় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তিস্তার ইতিহাসই সেই আশঙ্কার বড় প্রমাণ। ১৯৬৮ সালের ২ থেকে ৫ অক্টোবর মাত্র কয়েক দিনে অববাহিকায় ১৭০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। সেই ভয়াবহ বন্যায় তিস্তার জল তিস্তা বাজার ও দোমোহানি এলাকায় চরম বিপদসীমার ২০ মিটারেরও বেশি ওপরে উঠেছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। জলপাইগুড়িতে সেই বন্যার সর্বোচ্চ প্রবাহ প্রায় ১৯,৮০০ ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ড পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলে নথিভুক্ত হয়েছে। ১৯৬৮-র পাশাপাশি ১৯৭৩, ১৯৭৫, ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৯৩, ১৯৯৬, ২০০০, ২০০৩ এবং ২০১৫ সালেও বড় বন্যার নজির রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পলি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, তিস্তার মোট ভাসমান পলির প্রায় ৭২ শতাংশ জুলাই-আগস্ট মাসে নদীর সঙ্গে নেমে আসে। ফলে বর্ষার পর নদীর তলদেশে পলি জমে নদীর গতিপথ ও প্রবাহক্ষমতা বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তিস্তা অববাহিকার ভারতীয় অংশই প্রায় ৯,৮৫৫ বর্গকিলোমিটার; এর ৭২.৪৩ শতাংশ সিকিমে এবং ২৭.৫৭ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গে। অর্থাৎ পাহাড়ে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জলপাইগুড়ি-সহ সমতলে।
২০২৩ সালের সাউথ লোনাক হ্রদ-বিস্ফোরণ বন্যা সেই আশঙ্কাকে বাস্তব করে দেখিয়েছে। গবেষণাভিত্তিক মডেল অনুযায়ী ওই ঘটনার জেরে জলপ্রবাহ তিস্তা বাজারে প্রায় ৮,০৯৫ এবং গজলডোবায় প্রায় ৮,২৮২ ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ডে পৌঁছতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ২০২৩ সালের বন্যা রিপোর্টেও তিস্তার বিভিন্ন বাঁধ ও প্রতিরক্ষা কাঠামোয় ক্ষয়, রেনকাট ও ভাঙনের নথি রয়েছে; সিকিমের হ্রদ-বিস্ফোরণের সঙ্গে যুক্ত ক্ষয়ক্ষতির কথাও রিপোর্টে উল্লেখ আছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—তিস্তার সব বাঁধ বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জল একসঙ্গে ছেড়ে দিলে ঠিক কত জল নামবে, তা শুধু সব জলাধারের ধারণক্ষমতা যোগ করে বলা যায় না। কারণ তিস্তা অববাহিকার বহু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রান-অফ-দ্য-রিভার ধরনের। বিপদের মাত্রা নির্ভর করবে সেই মুহূর্তের নদীর প্রবাহ, বৃষ্টির পরিমাণ, ভূমিধস, হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণ, পলি জমে নদীর বহনক্ষমতা এবং বাঁধ-ব্যারাজের অবস্থার উপর। কেন্দ্রীয় জল কমিশনের বর্তমানে তিস্তা অববাহিকায় ডোমোহানি ও মেখলিগঞ্জ-সহ একাধিক স্থানে বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা রয়েছে।
পরিবেশ প্রেমী সংস্থা থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের নদী ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা বেশ কয়েকটি সংস্থার রিপোর্ট এবং অন্যান্য রিপোর্টেও অভিযোগ উঠে এসেছে যে উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা, পাহাড় ফাটিয়ে রাস্তা ও সুড়ঙ্গ তৈরি এবং একের পর এক নির্মাণ প্রকল্প ভঙ্গুর হিমালয়ের উপর চাপ বাড়াচ্ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও পাহাড়ি এলাকায় রাস্তা নির্মাণ, বনভূমি হ্রাস ও ভূমিধসের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তাই উন্নয়ন থামানো নয়, ভূপ্রকৃতি ও নদীর বহনক্ষমতা বিবেচনা করে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং বিপর্যয়ের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করাই এখন জরুরি।
সম্প্রতি ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধস থেকে তৈরি ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১,৩০০ ছাড়িয়েছে এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৫,৩০০। ধ্বংস হয়েছে রাস্তা, বসতি ও জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামো। হিমালয়জুড়ে এই ঘটনাই মনে করিয়ে দিচ্ছে— তিস্তায় বড় বিপর্যয়ের প্রশ্নটি ‘কবে বন্যা হবে’ তা নয়। বরং ‘বিপর্যয় হলে প্রস্তুতি কতটা রয়েছে’।
তথ্যসূত্র: কেন্দ্রীয় জল কমিশন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের Irrigation & Waterways Department-এর Annual Flood Report 2023, Journal of Indian Geophysical Union-এর তিস্তা অববাহিকা সংক্রান্ত গবেষণা এবং সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও Reuters প্রতিবেদন।
Comments :0