Post Editorial

সংগঠিত কৃষক আন্দোলনে পরিবর্তন সম্ভব

সম্পাদকীয় বিভাগ উত্তর সম্পাদকীয়​

শান্তনু ঝা
 

কৃষি শুধু একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়—এটি সভ্যতার ভিত্তি, সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কৃষি ফসলের বেচা-কেনার ইতিহাস যেমন প্রাচীন, তেমনই তা পরিবর্তনশীল। এই নিবন্ধে আমরা দেখব—কীভাবে গ্রামের হাট থেকে শুরু করে আজকের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত কৃষি বাজার ব্যবস্থা বহু রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। সেই সঙ্গে, উৎপাদক-ফড়ে-ব্যবসায়ী-কর্পোরেটের পারস্পরিক সম্পর্ক, ভারতের তিন কৃষি আইনকে কেন্দ্র করে কৃষকদের লড়াই, এবং বিশ্ব খাদ্য বাণিজ্যের জটিল সংঘাত— এই সব বিষয়কে সামগ্রিকভাবে আলোচনা করবো।
কেন্দ্রীয় প্রশ্ন: কৃষি উৎপাদনের প্রথম পর্বে যদি ক্ষুধা নিবৃত্তি মুখ্য লক্ষ্য থেকে থাকে, তাহলে পরবর্তী স্তরগুলিতে তা ধীরে ধীরে কোন পথে ব্যবসায়িক পণ্যে রূপান্তরিত হলো? গ্রামের হাট-আঞ্চলিক বেচা-কেনা থেকে বৃহত্তর বাজার, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব বাজারে তার প্রবেশ কীভাবে ঘটল? পুঁজি, প্রযুক্তি ও শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক কী? আর এই পথ পরিক্রমায় ভারতের নীতি অনুসরণে কী ধরনের পরিবর্তনের ক্রম পর্যায় লক্ষ্য করা যায়?
ভারতীয় উপমহাদেশে কৃষি পণ্যের বেচা-কেনার ইতিহাস সুপ্রাচীন। মৌর্য ও গুপ্ত যুগে গ্রামীণ হাটগুলি ছিল কৃষি পণ্য বিনিময়ের প্রধান কেন্দ্র। তখন বিনিময় প্রথা প্রচলিত ছিল—ধানের বিনিময়ে লবণ, মশলা বা কাপড় ইত্যাদি। এই পর্যায়ে কৃষি উৎপাদনের মূল লক্ষ্য ছিল আত্মনির্ভরতা ও স্থানীয় ক্ষুধা নিবৃত্তি। কৃষক যা উৎপাদন করতেন, তার একটি বড় অংশ নিজের ভোগের জন্য রাখতেন, বাকিটা স্থানীয় হাটে বিনিময় করতেন। 
ধীরে ধীরে মুদ্রার প্রচলন হলে এই হাটগুলি ক্রয়-বিক্রয়ের স্থায়ী কেন্দ্রে পরিণত হয়। মধ্য যুগে মুঘল আমলে কৃষি পণ্যের বাণিজ্য আরও সুসংহত হয়। 'মান্ডি' বা বাজার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এই পর্যায়ে ভারতীয় মশলা, সুতি বস্ত্র ও অন্যান্য কৃষি পণ্য ইউরোপে রপ্তানি হতো। সতেরো শতকের শেষভাগে ভারত বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ বস্ত্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ছিল, যার অংশ ছিল বিশ্ব আয়ের ২৭ শতাংশ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ব্যবসা শুরু করে, তখন ভারত থেকে সবচেয়ে বড় আমদানি ছিল সুতি বস্ত্র।
ব্রিটিশ শাসনকালে কৃষি বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসাগুলিকে সুসংগঠিত ও একচেটিয়া হিসাবে গড়ে তোলে। কোম্পানি পাট, কার্পাস, নীল, আফিম, চা—এই সব নগদ ফসলের রপ্তানিতে মনোনিবেশ করে।
অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব শুরু হলে পরিস্থিতি আমূল পরিবর্তিত হয়। এখানেই শিল্প বিপ্লব— পরবর্তী ক্ষেত্রে কৃষি পণ্য শিল্পের কাঁচা মাল হিসাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করায় এই রূপান্তর আবশ্যিক হয়ে ওঠে।
পুঁজি, প্রযুক্তি ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের দিক থেকে দেখলে—ইংল্যান্ডে বাষ্পচালিত টেক্সটাইল মিল স্থাপিত হলে ভারতীয় সুতি বস্ত্রের চাহিদা কমে যায়। কোম্পানি আর ভারত থেকে তৈরি বস্ত্র আমদানি করে না, বরং কাঁচা তুলা আমদানি করে। পুঁজির প্রবাহের দিক থেকে দেখলে—ব্রিটিশ পুঁজি ভারতীয় কৃষিতে বিনিয়োগ শুরু হয়, বিশেষত চা, কফি, নীল, তুলা ও আফিমের চাষে। শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দিক থেকে দেখলে—১৮১৩ সালে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকার বিলুপ্ত হয় এবং ভারতীয় বাজার অন্যান্য ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
কোম্পানি ও পরে ব্রিটিশ সরকার ভারতে একচেটিয়া কৃষি পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি গড়ে তোলে। ভারত থেকে কাঁচা তুলা রপ্তানি ১৮১৩-১৮৪৪ সালের মধ্যে চার হাজার টন থেকে চল্লিশ হাজার টনে গিয়ে দাঁড়ায়—এ প্রায় দশ গুণ বৃদ্ধি! আফিম চাষ কৃষকদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয় এবং ১৯০০-০১ সালে প্রায় ৫ লক্ষ ৮৬ হাজার একরে আফিম চাষ হতো, যেখানে ১৪ লক্ষ ৭৭ হাজার কৃষক লাইসেন্সধারী ছিল।
এই রূপান্তরের ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক। ১৮০০ সালে ভারতের শিল্প উৎপাদন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ ছিল। কিন্তু ১৮৬০ সালে তা কমে ৮.৬ শতাংশে এবং ১৯১৩ সালে মাত্র ১.৩ শতাংশে দাঁড়ায়। ভারত যেখানে একসময় বস্ত্র রপ্তানিকারক ছিল, সেখানে পরিণত হয় বস্ত্র আমদানিকারকে।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারত এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়। ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ সদ্য স্বাধীন দেশে খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বকে স্পষ্ট করে দেয়। ১৮৬০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে ভারতের অর্থনীতি বার্ষিক গড়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল—এ ছিল প্রায় স্থবির এক পরিস্থিতি।
১৯৭২ সালে কৃষি উৎপাদন বিপণন কমিটি (এপিএমসি) আইন প্রবর্তিত হয়। এপিএমসি আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষি পণ্যের বিপণন নিয়ন্ত্রণ করা, কৃষকদের শোষণমূলক মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে রক্ষা করা, ন্যায্য ওজন ও পরিমাপ নিশ্চিত করা। এই আইনের অধীনে প্রতিটি রাজ্যে নিয়ন্ত্রিত 'মান্ডি' গড়ে তোলা হয়। ১৯৫০ সালে ভারতে নিয়ন্ত্রিত বাজারের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৩৬টি, আজ তা ৬,৬০০-এর বেশি।
১৯৬০-এর দশকে সবুজ বিপ্লব ভারতের কৃষি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। উচ্চফলনশীল বীজ, সার, সেচ ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়লে ভারত খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। যদিও এর পরিবেশগত প্রভাব ছিল বিপুল।
১৯৯১ সালে ভারত অর্থনৈতিক উদারীকরণের পথে পা দেয়। এই পর্যায়টি ছিল উদারবাদী অর্থনীতির যুগ—অর্থাৎ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-তে ভারতের সদস্য ভুক্তির পূর্ববর্তী পর্যায়। এই সময়ে ভারত অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে, বাণিজ্য বাধা কমায় এবং বেসরকারি খাতের ভূমিকা বাড়ায়।
এই পর্যায়ে কৃষি ক্ষেত্রে সংস্কারের গতি ছিল ধীর। কৃষি পণ্যের রপ্তানি বাড়তে শুরু করে, তবে মূলত ঐতিহ্যবাহী মান্ডি ব্যবস্থার মধ্যেই বেচাকেনা চলতে থাকে। কর্পোরেট সংস্থাগুলি ধীরে ধীরে কৃষি পণ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণে আগ্রহ দেখাতে শুরু করে।
এই সময়ে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় কৃষি ভরতুকি ও বাণিজ্য বাধা নিয়ে আলোচনা চলছিল। ১৯৮৬ সালে উরুগুয়ে রাউন্ড শুরু হয়, যা কৃষি বাণিজ্যের নিয়ম নির্ধারণের পথ তৈরি করে। ভারত এই আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ রক্ষার পক্ষে অবস্থান নেয়।
১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি ডব্লিউটিও প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভারত এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়। এই সদস্যভুক্তির পরবর্তী পর্যায়টিকে আমরা নয়া উদারবাদী অর্থনীতির যুগ হিসাবে চিহ্নিত করি। এই পর্যায়ে ভারত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য হয়, বিশেষত কৃষি সমঝোতা (এগ্রিমেন্ট অন এগ্রিকালচার) অনুযায়ী ভরতুকি ও বাজার প্রবেশাধিকারের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।
ডব্লিউটিও’র কৃষি সমঝোতা তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে—বাজার প্রবেশাধিকার, অভ্যন্তরীণ সহায়তা এবং রপ্তানি ভরতুকি। ভারতকে তার কৃষি ভরতুকি সীমিত করতে হয় এবং শুল্ক হার কমাতে হয়। এই নিয়মগুলি ভারতের কৃষি বাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
ডব্লিউটিও-সদস্য ভুক্তির পর কর্পোরেট সংস্থাগুলির কৃষি ক্ষেত্রে প্রবেশ বাড়তে থাকে। ইটিসি, গোদরেজ, আদানি’র মতো বড় সংস্থাগুলি কৃষি পণ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও রপ্তানিতে মনোনিবেশ করে। শহরাঞ্চলে সুপারমার্কেট ও হাইপারমার্কেট-এর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং এই চেইন সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কিনতে শুরু করে।
২০২০-এর দশকে ই-কমার্স কৃষি বাজারে নতুন মাত্রা যোগ করে। জোমাটো, বিগবাস্কেট, অ্যামাজন ফ্রেশ—এই সব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সরাসরি ভোক্তার কাছে কৃষি পণ্য পৌঁছে দিতে শুরু করে।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় সরকার তিনটি কৃষি আইন পাশ করে। এই আইনগুলি এপিএমসি মান্ডির বাইরে সরাসরি বিক্রির অনুমতি, অত্যাবশ্যক পণ্য মজুতের নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া এবং চুক্তিভিত্তিক কৃষির পথ খুলে দেয়। কৃষক সংগঠনগুলি তীব্র বিরোধিতা করে। ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের ঘোষণা করতে বাধ্য হন।
কৃষি বাজার ব্যবস্থার চারটি প্রধান স্তর হলো—কৃষক, ছোট ফড়ে, বড় ব্যবসায়ী এবং কর্পোরেট সংস্থা। কৃষক হলেন উৎপাদক, যাঁরা এই ব্যবস্থার ভিত্তি, কিন্তু সবচেয়ে দুর্বল। ছোট ফড়েরা কৃষকের কাছ থেকে ফসল সংগ্রহ করে বড় ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দেয়। বড় ব্যবসায়ীদের কাছে প্রচুর মূলধন, গুদাম ও পরিবহণ ব্যবস্থা রয়েছে। কর্পোরেট সংস্থাগুলি আধুনিক প্রযুক্তি, বিপণন দক্ষতা ও বৃহৎ বাজার নিয়ে এসেছে।
এই চার স্তরের মধ্যে সম্পর্ক সহযোগিতা ও দ্বন্দ্ব উভয়ের মিশ্রণ। কৃষক বনাম ফড়ে: ফড়েরা কম দামে ফসল কিনে বেশি দামে বিক্রি করে। কৃষক বনাম কর্পোরেট: কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ার আশঙ্কা ক্রমবর্ধমান চেহারা পাচ্ছে।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও)’এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহত্তম কৃষি অর্থনীতির তালিকায় ভারত দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। চীন প্রথম স্থানে রয়েছে যার কৃষি উৎপাদনের মূল্য প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার। ভারতের কৃষি উৎপাদনের মূল্য ৫৭৩ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের মোট কৃষি উৎপাদনের ১০.৯ শতাংশ।
ভারত কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২৫ সালে ভারত চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম দুধ উৎপাদনকারী দেশ।
ভারতের কৃষি রপ্তানি ২০২৫-২৬ সালে ২.৮% বৃদ্ধি পেয়ে ৫২.৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এখানেই ভারতের ক্রমবর্ধমান সীমাবদ্ধতার সূত্রটি নিহিত। ভারতের কৃষি রপ্তানি বৃদ্ধির হার গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে কৃষি রপ্তানি বার্ষিক গড়ে ২০% হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই হার মাত্র ২.৩%-এ নেমে এসেছে।
এই ধারাবাহিক পতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, ভারতের কৃষি উৎপাদন মূলত ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের উপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয়ত, ভারতের কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াকরণ ও মূল্য সংযোজন ব্যবস্থা দুর্বল। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের প্রধান প্রতিযোগীরা—চীন, ব্রাজিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পায়। চতুর্থত, ভারতের রপ্তানি নীতিতে অস্থিরতা—সময় সময়ে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ—আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
ডব্লিউটিও-তে ভারতের কৃষিনীতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ বেশ কিছু সদস্য দেশ সমালোচনা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কৃষি খাতে উচ্চ পর্যায়ের সুরক্ষা নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ভারতকে কৃষি সহায়তা নীতি সংযত করার আহ্বান জানিয়েছে। ভারতের পালটা যুক্তি হলো—খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তার প্রধান লক্ষ্য।
ভারতীয় কৃষক আন্দোলনকারীরা ডব্লিউটিও’র বিরোধিতা করে। তাদের দাবি: এমএসপি’র আইনি নিশ্চয়তা—স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এমএসপি নির্ধারণ, কৃষি ঋণ মকুব, এবং ডব্লিউটিও থেকে সরে আসা। কৃষক সংগঠনগুলি বিকল্প প্রস্তাবও দিয়েছে: চুক্তিভিত্তিক কৃষিতে কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষা, মান্ডি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে ডিজিটাল বিভাজন দূর করা।
১৯৯১-১৯৯৪ সালের উদারবাদী অর্থনীতির যুগে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়, তবে এটি ছিল ডব্লিউটিও-পূর্ব পর্যায়। ১৯৯৫ সালে ডব্লিউটিও-তে সদস্যভুক্তির পর নয়া উদারবাদী অর্থনীতির যুগ শুরু হয়—এই পর্যায়ে কর্পোরেট প্রবেশ, ই-কমার্স ও বিশ্ব বাজারে প্রবেশ ঘটে।
কৃষি বাজারের চালচিত্র যেমন বহুমাত্রিক, তেমনই গতিশীল। ফার্ম গেট থেকে ই-কমার্স— এই পথ পরিক্রমায় কৃষক, ফড়ে, ব্যবসায়ী, কর্পোরেট—সবার ভূমিকা পালটেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় প্রশ্ন থেকে গেছে—কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা যায় কি না। ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলন দেখিয়েছে, কৃষকরা যখন সংগঠিত হয়, তখন তারা পরিবর্তন আনতে পারে।
ভারতের ক্রমবর্ধমান সীমাবদ্ধতার সূত্রটি হলো—কৃষি রপ্তানি বৃদ্ধির হার গত এক দশকে ২০% থেকে ২.৩%-এ নেমে এসেছে। এই পতন শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি ভারতের কৃষি ক্ষেত্রের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। ছোট কৃষকদের সীমিত সক্ষমতা, প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া, এবং রপ্তানি নীতির অস্থিরতা— এই সব মিলিয়ে ভারতের কৃষি রপ্তানির প্রতিযোগিতা ক্ষমতাকে সঙ্কুচিত করছে। কৃষি বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—কীভাবে আমরা ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, কৃষক ও কর্পোরেট, জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা— এই সবের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারি, এবং সেই সঙ্গে ভারতের কৃষি রপ্তানির ক্রমবর্ধমান সীমাবদ্ধতাকে মোকাবিলা করতে পারি, তার ওপর।
 

Comments :0

Login to leave a comment