Mohandas Karamchand Gandhi

মহাত্মার শ্রেষ্ঠতম প্রহর

সম্পাদকীয় বিভাগ

শৌভিক মুখোপাধ্যায়
সদ্যপ্রয়াত বামপন্থী ঐতিহাসিক সুমিত সরকার তাঁর ‘মডার্ন ইন্ডিয়া’ (১৯৮৩) বইটিতে ১৯৪৬-এর আগস্টে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর পর থেকে কলকাতা, নোয়াখালি, বিহার, গড়মুক্তেশ্বর (ইউপি) হয়ে পশ্চিম ও পূর্ব পাঞ্জাবে যে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা, গণহত্যা এবং সংখ্যালঘু বিতাড়নের ঘটনা স্রোত শুরু হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে সাতাত্তর বছরের এক বৃদ্ধের এক অবিস্মরণীয় একাকী লড়াইয়ের আখ্যান রচনা করতে বন্ধনীবৃত ওই বক্তব্যটি ব্যবহার করেছিলেন। বস্তুত ১৯৪৮-এর ৩০জানুয়ারি এক ধর্মান্ধ আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার আগের জীবনের শেষ অনেকগুলো মাস গান্ধীজী তাঁর প্রতিদিনের কাজ এবং জীবন দিয়ে নিজের স্বপ্নলব্ধ ভারতকে ঝঞ্ঝার মুখে আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। আজ তাঁর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে গান্ধীজীর জীবনের এই ‘শ্রেষ্ঠতম প্রহর’-এর স্মৃতিচারণই হোক আজকের এই অন্ধকার সময়ে আমাদের আলোকবর্তিকা।
সাম্প্রদায়িক গণহত্যা ও দেশভাগের প্রস্তুতি
১৯৪৬-এর গোড়াতেও দেশভাগ যে স্বাধীনতার অনিবার্য পরিণতি, সেটা কেউই বিশ্বাস করতেন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রণক্লান্ত, নিঃস্ব-রিক্ত ব্রিটিশ সরকার তখন অখণ্ড ভারতকে স্বাধীনতা দিয়ে বা ক্ষমতা হস্তান্তর করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারত থেকে পালাতে পারলে বাঁচে। ক্ষমতা হস্তান্তরের খুঁটিনাটি এবং সেই লক্ষ্যে ক্ষমতার ভাগ নিয়ে দিল্লিতে ক্ষমতার অলিন্দে তখন শুরু হয়েছে কালনেমির লঙ্কাকাণ্ডের মতো চুলোচুলির লড়াই। ২৪ মার্চ থেকে ২৯ জুন, ১৯৪৬ পর্যন্ত তিন সদস্যের ক্যাবিনেট মিশনের সঙ্গে চলল কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ নেতৃত্বের দড়ি টানাটানি।
আলোচনা মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিন্যাস ও গঠন এবং স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনার খসড়া পদ্ধতি নিয়ে। পাকিস্তান প্রশ্নে জিন্নার একগুঁয়ে জেদের কারণে আলোচনা বারবার ভেস্তে গেলেও ১৬ মে ক্যাবিনেট মিশনের তরফে একটি নতুন প্রস্তাব পেশ করা হলো। বলা হলো যে, স্বাধীন ভারত একটি ত্রিস্তরীয় সংযুক্ত কাঠামোর ভেতরে গঠিত হবে। হিন্দুপ্রধান প্রদেশগুলি ‘ক’ এবং উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বের মুসলমান প্রধান প্রদেশগুলি যথাক্রমে ‘খ’ ও ‘গ’ বিভাগ হিসাবে বিন্যস্ত হবে। আর কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতির মতো দপ্তরের সামান্য কিছু ক্ষমতা ছাড়া বাকি সবটাই থাকবে এই ত্রিস্তরীয় প্রদেশগুলির হাতে। এতে সম্ভাব্য দেশভাগ এড়ানো সম্ভব হবে, প্রদেশগুলিতে জনসংখ্যার বিন্যাসে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের হাতে বাড়তি ক্ষমতা রয়ে যাবে। ভাবা গিয়েছিল এতে জিন্নাকে সন্তুষ্ট করা যাবে। জাতীয় কংগ্রেস জিন্নাকে বিস্মিত করে এই প্রস্তাবে প্রাথমিকভাবে সায় দেয়। তখন জিন্না এই সাময়িক ব্যবস্থাপনাকে চিরস্থায়ী করার দাবি করে বসেন। কংগ্রেস এই প্রস্তাব নাকচ করলে মুসলিম লিগের তরফে ২৯–৩০ জুলাই ক্যাবিনেট মিশনের উক্ত প্রস্তাব সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে পাকিস্তানের দাবি আদায়ে ১৬ আগস্ট, ১৯৪৬ ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর ডাক দেওয়া হয়।
১৬ আগস্ট থেকে প্রথমে কলকাতা, তারপর নোয়াখালি হয়ে বিহার, গড়মুক্তেশ্বর ছাড়িয়ে পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে একে একে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন জ্বলে ওঠে, যা ক্রমশ সাম্প্রদায়িক গণহত্যায় পর্যবসিত হয়। ঘটনার সূত্রপাত কলকাতায় ১৬–১৯আগস্ট। বাংলায় তখন মুসলিম লিগের সরকার, ‘প্রধানমন্ত্রী’ সোহরাবর্দী। সরকারের তরফে ১৬ আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষিত হয়। ওই দিন ময়দানমুখী মিছিল থেকে মারমুখী জনতা লুটপাট, অগ্নিসংযোগের কাজ শুরু করে। সরকারি মদত তো ছিলই, কারণ আজও এটা স্বতঃসিদ্ধ—‘সরকার না চাইলে দাঙ্গা হয় না’। কলকাতার এই ভয়াবহ দাঙ্গার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল হত্যা, খুন। প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে হিন্দু-শিখ জনতা অপরাধ জগতের পান্ডাদের মদতে পালটা খুন, প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। গোটা শহরটাই ডুবে যায় হানাহানির অন্ধকারে। সেনাবাহিনীকে অজ্ঞাত কারণে প্রথম তিনদিন নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছিল। ১৯আগস্ট নাগাদ প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৪ হাজার নাগরিক, আহতের সংখ্যা ১০ হাজারের উপর। নিহতের মধ্যে সংখ্যাগুরু মুসলমান। ১৯ আগস্টের পর সরকারি-বেসরকারি (যেমন কমিউনিস্ট পার্টি) উদ্যোগে এই গণহত্যায় সাময়িক বিরতি ঘটলেও চোরাগোপ্তা খুন, জখম চলতেই থাকে। কলকাতায় দ্বিতীয় রাউন্ডের দাঙ্গা শুরু হয় ১৯৪৭-এর ১২মার্চ থেকে ১ এপ্রিল।
নিউটনের তৃতীয় সূত্র?
সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পান্ডারা রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘের মতোই ভারতের অন্যত্র হানাহানি ছড়িয়ে দিতে থাকে। বোম্বাই শহরে ১ সেপ্টেম্বর থেকে খুনোখুনি শুরু হয়। মাসের শেষে ১৬২জন হিন্দু এবং ১৫৮জন মুসলমান নিহত হয়।
পরবর্তী ঘটনা নোয়াখালিতে। বাংলার দক্ষিণ-পূর্বে সমুদ্র তীরবর্তী এই জেলার জনবিন্যাস ও সামাজিক বিন্যাস ছিল সংঘাতের উপাদানে ভরপুর। মুসলমান জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, আবার হিন্দুরা সংখ্যালঘু হলেও জমির মালিকানা, ব্যবসা ও চাকরিজীবী হিসাবে তারাই সমাজে প্রাধান্য ভোগ করত। সামাজিক বিন্যাসের কারণে সংখ্যাগুরু মুসলমান চাষি আর হিন্দু ভূস্বামীর মধ্যে সংঘাতের উপাদান তো ছিলই। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল নোয়াখালিতে মুসলিম ধর্মান্ধ / ধর্মীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি, যা পরিস্থিতিকে আরও অগ্নিগর্ভ করে তুলেছিল। তবে নোয়াখালিতে গান্ধীজীর সফরসঙ্গী, নিত্য সহচর বিখ্যাত নৃতাত্ত্বিক নির্মলকুমার বসুর মনে হয়েছিল—গরিব চাষি আর জমিদারের সংঘাতের চেয়েও নবউত্থিত মুসলমান শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
যাই হোক, ১০ অক্টোবর থেকে নোয়াখালি ও সংলগ্ন ত্রিপুরা জেলায় শুরু হলো সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর আক্রমণ। প্রথম বলি সুরেন বসু। তবে কলকাতার মতো এখানে নির্বিচার খুন না করে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল হিন্দুদের সম্পত্তি লুণ্ঠন, বিনষ্টিকরণ এবং নারীর মর্যাদা হনন। নিহতের সংখ্যা ৩০০-র আশপাশে হলেও সম্পত্তির ক্ষতি কোটি কোটি টাকার। এর পরেই ত্রস্ত, বিধ্বস্ত সংখ্যালঘু হিন্দুরা দলে দলে এলাকা ছাড়তে শুরু করে। লিগ প্রশাসন এখানেও একদেশদর্শী মনোভাব নেওয়ায় সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে।
২৫অক্টোবর বিহারে ‘নোয়াখালি দিবস’ পালনের সূত্রে শুরু হলো স্থানীয় মুসলমান জনতার নরমেধ যজ্ঞ। নিহতের সংখ্যা অন্তত ৭হাজার। রাজ্যে কংগ্রেসের সরকার। এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কৃষকসভার জনভিত্তি ছিল, এর পরেও হানাহানির ভয়াবহতা গান্ধী, নেহরু, প্যাটেল সহ কংগ্রেস নেতৃত্বকে হতচকিত করে দেয়। বিহারের সূত্র ধরেই সংযুক্ত প্রদেশ-র (আজকের উত্তর প্রদেশ) গড়মুক্তেশ্বরে হিন্দু তীর্থযাত্রীরা হাজারের উপর মুসলমান খুন করে। ঘটনার তীব্রতায় উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটিতেও জনসমর্থনের ভিত্তিতে ধস নামে। ইতিমধ্যে পাঞ্জাব প্রদেশের মুসলমান, হিন্দু ও শিখরা মিলিতভাবে অভূতপূর্ব নরমেধ যজ্ঞের প্রস্তুতি শুরু করে দিল। কংগ্রেস ও শিখ সমর্থনে গঠিত খিজির হায়াত খানের নেতৃত্বাধীন মিলিত মন্ত্রীসভা সরকারের বিরুদ্ধে মুসলিম লিগের আইন অমান্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ৪মার্চ, ১৯৪৭ থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন পাঞ্জাবকে ছেয়ে ফেলল। পেন্ড্রেল মুনের হিসাব অনুযায়ী পাঞ্জাব প্রদেশে নিহতের সংখ্যা আনুমানিক ১ লক্ষ ৮০ হাজার—পশ্চিম পাঞ্জাবে কমপক্ষে ৬০ হাজার, আর পূর্বে ১ লক্ষ ২০ হাজার। ১৯৪৮-র মার্চ নাগাদ ৬ লক্ষের উপর মুসলিম আর সাড়ে ৪ লক্ষের উপর হিন্দু ও শিখ সর্বস্ব হারিয়ে উদ্বাস্তু শরণার্থী হিসাবে পাকিস্তান ও ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন।
‘একলা চলো রে’
ক্ষমতার অলিন্দে দর কষাকষি আর তৃণমূল স্তরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার লেলিহান শিখা যখন সমগ্র ভারতকে খেপিয়ে তুলেছিল তখন ক্ষমতার মসনদ থেকে বহু দূরে এক অশীতিপর, অচল প্রায় বৃদ্ধ কখনও পায়ে হেঁটে নোয়াখালির দাঙ্গা বিধ্বস্ত গ্রামে, কখনও বিহারে, আবার কখনও কলকাতার বেলেঘাটায় হায়দরি মঞ্জিলের বাড়িতে বসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফেরানোর লক্ষ্যে, সাধারণ মানুষের মনে বল-ভরসা জোগাতে, সর্বোপরি নিজের মূল্যবোধের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে এক অসম্ভব এবং অসম লড়াই চালিয়েছেন।
নির্মলকুমার বসু ছিলেন গান্ধীবাদী এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃতত্ত্বের অধ্যাপক (স্বাধীনতার পর ৫০-র দশকের শেষের দিকে তিনি ভারতীয় নৃতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের অধিকর্তাও হয়েছিলেন)। কলকাতা এবং নোয়াখালির ঘটনায় অস্থির গান্ধীজী যখন শেষপর্যন্ত সোদপুর স্থিত সতীশচন্দ্র দাশগুপ্তের খাদি আশ্রমে উপস্থিত হলেন, সেই দিন থেকেই নির্মলকুমার বসু গান্ধীজীর সহযাত্রী, সেক্রেটারি হিসাবে তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলায় কাটানো দিনগুলির এক অমূল্য দিনলিপি তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর ‘মাই ডে’জ উইথ গান্ধী’ গ্রন্থে।
গান্ধীজী সঙ্গীসাথিদের নিয়ে নোয়াখালির উদ্দেশ্যে রওনা হন ৬ নভেম্বর, পরের চার মাস তিনি নোয়াখালিতেই অবস্থান করেন। প্রথমে সঙ্গীসাথি সঙ্গে থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই তিনি এঁদের বিভিন্ন গ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে সহচর নির্মল বসুর সঙ্গে খিলপাড়া, শ্রীরামপুরের মতো গ্রামে দাঙ্গা আক্রান্তদের বাড়িতে কাটান, বন্যার জল নেমে গেলে পায়ে হেঁটে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়ান। নোয়াখালিতে অবস্থানকালে প্রতিদিন নিয়মানুসার প্রার্থনা, পদব্রজে এমন নেতৃবৃন্দ বা সরকারের লোকজনের পাশাপাশি স্থানীয় আক্রান্ত অথবা আক্রমণকারীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে ভেঙে যাওয়া যোগাযোগের সেতু গড়ে তোলার অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, বারে বারে নিজেকে প্রশ্ন করেছেন—‘‘কী করব (ক্যায়া করু, ক্যায়া করু)?’’ নোয়াখালিতে অবস্থানকালে সকালের প্রার্থনাসভায় নিয়ম করে রবি ঠাকুরের ‘একলা চলো রে…’ গানটি গাওয়া হতো। 
৪ ডিসেম্বর অমিয় চক্রবর্তীকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলছেন—আক্রমণকারী এবং অসামাজিক এই মানুষরা যখন কৃতকর্মে অনুতপ্ত না হয়ে বরং উল্লসিত হবে, তখন এর প্রতিরোধে একমাত্র রাস্তা হলো ভয়ে কুঁকড়ে না গিয়ে, নিজের সম্মান ও সত্যকে হারিয়ে না ফেলে সেই অপরাধীদের মধ্যেই বাস করা। এই অন্ধকার শেষে আলো দেখা যাবে বলেই তাঁর স্থির বিশ্বাস।
৫ডিসেম্বর তাঁর সঙ্গে একটি প্রতিনিধিদল দেখা করতে আসে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন হিন্দু মহাসভার সভাপতি ও সম্পাদক—যথাক্রমে নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এবং নোয়াখালি দাঙ্গার প্রথম বলি সুরেন বসুর দাদা নরেন বসু। নির্মলচন্দ্র জানান যে, তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করা হিন্দুদের এক জায়গায় একত্র করার উদ্যোগ নেবেন তাঁরা। গান্ধীজী স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় জানান যে, ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন এই উদ্যোগ দ্বিজাতিতত্ত্বকেই সিলমোহর দেবে; বরং প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও অথবা প্রাণের বিনিময়ে নিজের বাসস্থানে থেকে যাওয়াটাই শ্রেয়। সেই কারণেই তিনি তাঁর অনুগামীদের নোয়াখালির গ্রামে-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়তে বলেছেন। তিনি এর সাথে যোগ করেন যে হিন্দুরা সবাই চলে গেলেও তিনি থেকে যাবেন। কারণ তিনি ব্যক্তিগতভাবে পাকিস্তানের (মুসলমানদের জন্য পৃথক দেশের) পক্ষে নন।
এর উত্তরে নির্মলবাবু যখন বলেন যে কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে এই উপদেশ পালন করা অসম্ভব, তখন গান্ধীজী জানান যে এতে যদি কাউকে আত্মবলিদান করতে হয়, তাহলে তাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরও বহু মানুষ সেই উদাহরণ অনুসরণ করবে। এতে কেউ তাঁকে আদর্শবাদী বললেও তিনি নিজেকে একজন বাস্তববাদী/দূরদর্শী মনে করেন। তিনি একজন হিন্দু—সনাতনী হিন্দু এবং মোক্ষলাভ করলে হিন্দু হিসাবেই সেটা করবেন।
এই চরম সময়ে দিনপঞ্জিতে নির্মল বসু এই অশক্ত মানুষটির মনের জোর, একই সঙ্গে এই অভূতপূর্ব সময়ে কিংকর্তব্য বিমূঢ়তার সাক্ষী থেকেছেন বারে বারে।
নির্মল চট্টোপাধ্যায় যখন বাংলার এই সঙ্কটকালে গান্ধীজীর এই উদ্যোগের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন, তার উত্তরে গান্ধীজী বলেন যে তিনি বাংলাকে কৃতার্থ করতে এই উদ্যোগ নেননি; বস্তুত এই সঙ্কট তাঁর সযত্নপালিত বিশ্বাসের প্রতি চ্যালেঞ্জ। তিনি ব্যর্থতা চান না, তবে এই কাজে সাফল্য নাও আসতে পারে, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। এই সাক্ষাৎকার দেখিয়ে দেয় কেন গান্ধীজী ‘আমার জীবনই আমার বাণী’ এই বক্তব্যটি ব্যবহার করতেন। তিনি নিজের জীবনে যা বিশ্বাস করেছেন, ঠিক বা ভুল, তাকে প্রমাণ করবার জন্য নিজের জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধা করেননি। বিশ্বাস করতেন সত্যের রূপ অনেক (জৈন ধর্মের ‘অনেকান্তবাদ’-এর দ্বারা প্রভাবিত) এবং কেউ একমাত্র সত্যের অধিকারী নয়। আর তাই নিজের বিশ্বাস-সত্য জোর করে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়; প্রয়োজন হৃদয় পরিবর্তন। আর তাই সেই বিশ্বাসে স্থিত থেকে শত্রুভাবাপন্ন মানুষের মধ্যে বাস করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অক্লেশে, প্রাণের ভয় ত্যাগ করে।
বিহারে পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার জন্য গেলেন ১৯৪৭-এর ফেব্রুয়ারি মাসে। সেখানে ১১০ বছরের বৃদ্ধা সমেত মুসলমানদের নির্মম হত্যার ঘটনায় স্তম্ভিত গান্ধীজী উপস্থিত কংগ্রেস কর্মীদের প্রশ্ন করলেন—‘ম্যায় তো আপসে পুছনা চাহতা হুঁ আপ জিন্দা কিউ রহে?’ বিহার থেকে তিনি চলে যান দিল্লি, সেখান থেকে কাশ্মীর হয়ে কলকাতায় আবার দাঙ্গা শুরু হলে ফিরে আসেন স্বাধীনতার প্রাক্কালে। থাকতেন বেলেঘাটা-স্থিত হায়দরি মঞ্জিলে; সঙ্গী কলকাতায় নিধনযজ্ঞের কালিমালিপ্ত শাহিদ সোহরাবর্দী। স্বাধীনতা দিবসে যখন কোন জাদুকরের মন্ত্রে হিংসা ভুলে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ উৎসবে শামিল, সেই দিন গান্ধীজী অনশনে—নিরালা, নিঃঝুম। মহাত্মা গান্ধীর জীবনের ‘শ্রেষ্ঠতম প্রহর’ তাঁর এই একলা অহিংস লড়াই। এই অহিংসা অক্ষম, দুর্বলের নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ নয়, মৃত্যুঞ্জয়ী সাহসের প্রতিফলন।
প্রহর শেষে যেটুকু রয় বাকি
কলকাতার কাজ শেষে গান্ধীজী ফিরে চললেন অবসন্ন মনে দিল্লি। সেখানে তখন নতুন সরকার। দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাজে অসন্তুষ্ট গান্ধীজী বললেন এই সর্দারকে তিনি চেনেন না। পাকিস্তানের সঙ্গে টাকা পয়সার ভাগ নিয়ে দেশের সরকারের অন্যায্য অবস্থান, দেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির প্রতিবাদে শেষবারের মত অনশনে বসলেন ১৯৪৮’র জানুয়ারি মাসে। শুরু হলো তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। বোম্বে এবং দিল্লির পুলিশের কাছে কিছু তথ্য ছিল। তাঁর এই নৈতিক অবস্থানকে সহ্য করতে না পেরে হিন্দুত্ববাদী নাথুরাম গডসের হাতের বেরেট্টা বন্দুকের গুলি ১৯৪৮সালের ৩০ জানুয়ারি বিকেল ৫.১৭মিনিটে স্তব্ধ করে দিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই অতন্দ্র প্রহরীকে।

Comments :0

Login to leave a comment