BRICS

দিল্লিতে শুরু ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন, পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ মোদীর

জাতীয়

বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক বাধা, সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের আবহে শুরু হলো ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। নয়াদিল্লির সভাপতিত্বে আয়োজিত সম্মেলনের মূল পর্ব আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ‘ভারত মণ্ডপমে’ অনুষ্ঠিত হবে। 
শুক্রবার থেকেই রাজধানীতে জড়ো হতে শুরু করেছেন ব্রিকস’র সদস্য ও অংশীদার দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী এবং প্রতিনিধিরা। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা এবারের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেতে চলেছে। শুক্রবার ‘ব্রিকস বিজনেস ফোরাম’-র অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকস’র ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্রিকস দেশগুলির সম্মিলিত জিডিপি প্রায় সাড়ে চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় আড়াই গুণ। মোদীর দাবি, বর্তমানে ব্রিকস দেশগুলির মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ জনসংখ্যা, বিশ্ব জিডিপি’র ৪০ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ২৫ শতাংশেরও বেশি।
ব্রিকস’কে কেবল রাষ্ট্রপ্রধানদের কূটনৈতিক মঞ্চ হিসাবে নয়, ব্যবসা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসাবেও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, সদস্য দেশগুলি বিশ্ব উদ্ভাবন ও সমস্যার সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছে। তৃণমূল স্তরের উদ্যোগ থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক বাধা বাড়ার সময় ভারত অর্থনৈতিক সেতু গড়ে তুলছে বলে দাবি করেন মোদী। তিনি জানান, ২০১৪ সাল থেকে ভারত প্রায় ৪০টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে। ব্রিকস’র মধ্যেও বাণিজ্যিক বাধা কমিয়ে ব্যবসার সুযোগ সম্প্রসারণের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সমুদ্রপথের নিরাপত্তার সম্পর্কও শুক্রবারের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। মোদী বলেন, সমুদ্রপথ নিরাপদ না থাকলে বিশ্ব বাণিজ্য এগিয়ে যেতে পারে না। সরবরাহের পথ খোলা রাখা এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ভারত নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং সমুদ্রপথে কর্মরত নাবিকদের নিরাপত্তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন মোদী। দুই নেতার মধ্যে এটি দু’সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় বৈঠক। এর আগে ৩১ আগস্ট বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয়। ব্রিকস সংক্রান্ত বৈঠকগুলিতে ইরানের নিয়মিত উচ্চ পর্যায়ের অংশগ্রহণের জন্য পেজেশকিয়ানকে ধন্যবাদ জানান মোদী। বিশ্ব দক্ষিণের দেশগুলির মধ্যে স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্বের মনোভাব গড়ে তুলতে ব্রিকস’র সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে মত বিনিময়ের সময় মোদী বলেন, সমস্ত সমস্যা সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। একইসঙ্গে ওই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
শুক্রবার রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন মোদী। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, প্রযুক্তি, ওষুধ, দক্ষতা বিনিময় এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। রাশিয়ার আন্তর্জাতিক শিল্প প্রদর্শনী ‘ইনোপ্রম ইন্ডিয়া’ প্রথমবার ভারতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাণিজ্য ও শিল্প সম্পর্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ বলে দুই নেতা উল্লেখ করেন। ৯ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে দুই নেতা অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। বৈঠকে পশ্চিম এশিয়া ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের ফলে সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তার উপর যে প্রভাব পড়ছে, তা নিয়েও আলোচনা হয়। মোদী সংঘাত সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতির উপর জোর দেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ভারত সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানান। বৈঠকের শেষে পুতিন মোদীকে রাশিয়ায় ২৪তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ বৈঠকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। মোদী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার মাধ্যমে বৈঠকের তারিখ স্থির করা হবে।
ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও মোদীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। শনিবার বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে এই বৈঠক হওয়ার কথা। সাত বছরের মধ্যে শি জিনপিংয়ের এটি প্রথম ভারত সফর। সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমন, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা সংক্রান্ত অগ্রগতি এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে দুই নেতার আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে। যদিও বৈঠকের বিস্তারিত আলোচ্যসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, ভারত-চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতির কারণে এই সাক্ষাৎকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শুক্রবার রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে পৌঁছেছেন। মিশরের রাষ্ট্রপতি আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং নাইজেরিয়ার ভাইস রাষ্ট্রপতি কাশিম শেট্টিমা সহ একাধিক নেতা ও প্রতিনিধি নয়াদিল্লিতে উপস্থিত হয়েছেন। রুশ রাষ্ট্রপতি পুতিনও শুক্রবার তিন দিনের ভারত সফরে এসে পৌঁছেছেন। ভারত ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি চতুর্থবারের জন্য ব্রিকস’র সভাপতিত্ব গ্রহণ করে। এ বছরের সভাপতিত্বে ‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও স্থায়িত্ব’—  এই চারটি অগ্রাধিকারের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ভারতের দাবি, সারা বছর ধরে ২৫টিরও বেশি শহরে ৩৫০টির বেশি বৈঠক ও উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের সম্মেলনে ব্রিকস’র তিনটি প্রধান সহযোগিতার স্তম্ভ—  রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও আর্থিক এবং সাংস্কৃতিক ও জনগণের মধ্যে আদানপ্রদান নিয়ে আলোচনা হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে পরিবর্তন, বাণিজ্যিক সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস এবং বিশ্ব দক্ষিণের দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের প্রেক্ষাপটে দিল্লির এই সম্মেলনের দিকে নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের।

Comments :0

Login to leave a comment