একদিকে ভাঙনের গ্রাস, অন্যদিকে বন্যা পরিস্থিতিতে মালদহের মানিকচক বিধানসভার ভূতনির বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলের তলায়। পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে আরও। গঙ্গা ও ফুলহরা নদীর জলস্তর ক্রমেই বাড়ছে।
ভূতনির তিন গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা, উত্তর চণ্ডীপুর, দক্ষিণ চণ্ডীপুর ও হীরানন্দপুর কার্যত জলের তলায়। ৫০টি বুথ এলাকা, প্রায় ৮০টির বেশি গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। প্রায় দু’লক্ষ মানুষ বিপর্যস্ত, আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন। বাড়ি, স্কুল, থানা, হাসপাতাল সবই জলের তলায়।
৩টি হাইস্কুল, ৫০টি প্রাইমারি স্কুলের পাশাপাশি ভূতনি চণ্ডীপুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র এমনকি ভূতনি থানাও সম্পূর্ণ জলের তলায়। পুলিশ কর্মীরাও আশ্রয় নিয়েছে বাঁধের ওপর। এছড়াও এছাড়াও ৯টি হাইস্কুল গঙ্গার গর্ভে। তার আর কোনও অস্তিত্ব নেই। ক্লাসরুম, টেবিল, বেঞ্চ, ব্ল্যাকবোর্ড, হাজারও স্বপ্ন— সবকিছুই এখন নদীগর্ভে। মালদহের মানচিত্রে হারিয়ে গিয়েছে স্কুলগুলো। এর মধ্যে রতুয়া-১নম্বর ব্লকের ৫টা স্কুল, ভূতনির ৩টে এবং মানিকচকের একট হাইস্কুল রয়েছে।
আস্ত স্বাস্থ্যকন্দ্র জলের তলায়। জলের তলায় চলে যাওয়া ভূতনি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ১৭৪ জন অন্তঃসত্ত্বাকে নৌকা করে মানিকচকের মডেল স্কুলের ফ্লাড সেন্টারে নিয়ে আসা হয়েছে, বাকি রোগীদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাড়ি নেই, ভেসে গিয়েছে নয়তো জলের তলায়। ভূতনির রিং বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন মানুষজন। ১৯১৩-তে মাথা তোলা ভুতনির চরের মতো অনেক জনপদ হারিয়ে যাওয়ার মুখে। গঙ্গা-কোশী ও ফুলহর নদীর সঙ্গমস্থলেই এই চর। এই তিন নদীকে ঘিরে থাকা ভূতনির রিং বাঁধ কার্যত বিপন্ন। এই মুহূর্তে রিং বাঁধের ওপর প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বাঁচার মরিয়া চেষ্টায় সংসার পেতেছেন। বাকিরা অধিকাংশ হয় ভূতনি ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছেন নয়তো গ্রামের পাকা বাড়ির ছাদে রয়েছেন। একেকটা বাড়ির ছাদে কুড়ি তিরিশজন করে মানুষজন রয়েছেন।
ভাঙনের আতঙ্কে এর আগে রতুয়া-১ নম্বর ব্লকের বিনটোলা গ্রামে দেখ গিয়েছিল, বাসিন্দারা নিজেরাই শাবল, গাইতি দিচ্ছেন। ঘরবাড়ি পুরোপুরি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আগে যতটুকু সম্ভব আসবাব ও অন্যান্য সামগ্রী সরানোর মরিয়া চেষ্টা করছেন তাঁরা। প্রশাসনের দেখা না মেলায় আতঙ্কের মধ্যেই নিজেদের উদ্যোগে এই কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন গ্রামবাসীরা। ভূতনির মানুষজন নিজেদের তৈরি করা বাড়ি নিজেরাই ভেঙে দিচ্ছেন। নদী গর্ভে চলে যাওয়ার আগে ভাঙছেন নিজেরাই। পশ্চিম রতনপুরের কেশবপুর কলোনির ২০০টি বাড়ি গ্রামে বাসিন্দারা নিজেরাই ভেঙেছেন। আবার মিল্কী পঞ্চায়েত এলাকায় এমন ৫০টি বাড়ি ভাঙার ঘটনা দেখা গিয়েছে। পরিস্থিতি কোন ভয়াবহতায় পৌঁছালে এমন ছবি দেখা যায়!
ভূতনির বিস্তীর্ণ এলাকা এখন নৌকা ছাড়া যাতায়াত অসম্ভব। তাই মন্ত্রী, বিধায়কদের দেখাও মিলছে না প্লাবিত এলাকায়। বাঁধে আশ্রয় নেওয়া মানুষজনের সঙ্গে দেখা করেই ফিরছেন তাঁরা। কিন্তু সেখানেও হাহাকার। নেই রান্না করা কোনও খাবার। শুকনো খাবার, বিস্কুট, চিঁড়েও মিলছে না। নেই পানীয় জল। অন্যদিকে গ্রামের ভিতরের ছবির আরও মারাত্মক, নৌকা ছাড়া যাতায়াত সম্ভব নয়। এদিকে বিদ্যুতের খুঁটি সব জলের তলায় বা ভেঙে পড়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকা বিদ্যুৎহীন। রাত বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে, বাড়ছে সাপের উপদ্রব। ইতোমধ্যে দক্ষিণ চণ্ডীপুরে বাল্লিটোলায় গ্রামের দ্বিজেন মাহাতো নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে জলের তলায়।
এই পরিস্থিতি আগাম আশঙ্কা করেছিলেন গ্রামবাসীরাও। সিপিআই(এম)’র তরফে বারে বারে প্রশাসন, সেচ দপ্তরকে জানানো হয়েছে। জেলাশাসকের কাছে ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছিল দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে। গত পনেরো বছরের প্রতিশ্রুতি যেমন ভেসে গিয়েছে গঙ্গা-ফুলহরায়, তেমনই দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও ভেসেছে ভূতনির জলে। বিধানসভা ভোটের আগে নরেন্দ্র মোদী থেকে অমিত শাহ, শুভেন্দু অধিকারি মালদহে এসেই ঘোষণা করেছিলেন, ‘ভূতনিতে বন্যা হতে দেব না। জলে ডুবতে দেব না আমরা। বিজেপি-কে সরকারে আনুন, ভূতনিতে বন্যা হতে দেব না।’ সম্পুর্ণ জলের তলায় যাওয়া উত্তর চণ্ডীপুরের গ্রামবাসীরা এদিন বাঁধের দাঁড়িয়েই চিঁড়ের প্যাকেট দেখিয়ে বললেন, ‘‘মুখে দেওয়া যাচ্ছে না, পানীয় জল নেই। ভোটের সময় বলেছিল বন্যা হতে দেবো না, এখন ত্রাণের ত্রিপলও সবাই পাচ্ছে না। বন্যা আটকানো তো দূরের কথা।’’
সিপিআই(এম) নেতা দেবজ্যোতি সিনহার কথায়, ‘ভূতনির পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেচ দপ্তরের অপদার্থতার চেহারাও ধরা পড়েছে। স্থায়ী কাজের তুলনায় এরা কোনোমতে ঠেকা দেওয়ার মতো কাজ করে বন্যা আটকানোর চেষ্টা করেছিল। বাস্তবে এর ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। দু’লক্ষ মানুষ বিপদে। সরকার, প্রশাসনের ধারণা নেই গঙ্গা-ফুলহরার দূরত্ব ভায়া কোশী মাত্র ৫০০ মিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। মানচিত্র থেকে মুছে যাবে মালদহ-মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ প্রান্তর। ২০১৬’র পর মালদহের বারোটি মৌজা মানচিত্র থেকে হারিয়ে গিয়েছে নদীগর্ভে। আমরা বারে বারে সতর্ক করেছিলাম, পশ্চিম রতনপুরের বাঁধ ১ কিলোমিটার এলাকা ভেঙেছে, জল ঢুকছে ভূতনিতে, প্রথম রাতেই ৩ ফুট জল বেড়েছিল। এখন একটু কমেছে। অন্যদিকে প্লাবিত মানুষজনের অবস্থা ভয়াবহ, সরকারের ত্রাণ কোথায়? প্লাবিত গ্রামে কীভাবে মানুষজন ঘরের ছাদে রয়েছে তা কি সরকারের কেউ দেখতে গেছে?’ বন্যাপীড়িত মানুষজনের একাংশের জন্য সিপিআই(এম)র অফিসও খুলে দেওয়া হয়েছে। মানিকচকের হরেকৃষ্ণ কোঙার ভবনে রয়েছেন একাধিক বন্যাপীড়িত মানুষ।
Bhutni Flood
প্লাবিত ভূতনির বিপর্যস্ত মানুষের আশ্রয়স্থল এখন বাঁধ, বাড়ির ছাদ
×
Comments :0