Post Editorial ganashakti

কলকাতা নেই কলকাতাতেই

উত্তর সম্পাদকীয়​

সমন্বয় রাহা


পুঁজিবাদ নগরায়নকে সাধারণত একটি দেশের উন্নয়নের সূচক হিসাবে দেখাতে চায়। অর্থাৎ একটা শহরে কটা ঝাঁ চকচকে বিল্ডিং, মল, প্রাইভেট নার্সিংহোম, বিরাট বিরাট রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স হলো আজকের নগরায়নের সূচক। সেই ঝাঁ চকচকে বিজ্ঞাপনে চাপা পড়ে যায় এই তথাকথিত নগরায়নের জন্য শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন যাপন। কী করেন এই শ্রমজীবী মানুষেরা? কোথায় থাকেন তাঁরা? এর উত্তরও আমাদের কাছে অজানা নয়। বর্তমানে শহর কলকাতায় মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মানুষ থাকে বস্তিতে। কলকাতা কর্পোরেশনের মানচিত্রের মধ্যে এই সংখ্যাটা হলো প্রায় ১৫ লক্ষ। এই সংখ্যা আগামীদিনে আরও বাড়বে। 
শহরের উন্নয়নের আলোচনায় বস্তিবাসী মানুষকে ‘অবৈধ দখলদার’, ‘অপরিকল্পিত বসতি’ অথবা ‘শহরের সৌন্দর্যায়নের অন্তরায়’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। আপনাদের খেয়াল আছে নিশ্চয়ই বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, বিজেপি’র সর্বোচ্চ নেতা অমিত শাহ বলে গেলেন, কলকাতা বস্তির শহর। এখান থেকেই পরিষ্কার হয় ডাবল ইঞ্জিন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি। 
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই বস্তিতে থাকা মানুষেরা এই শহরে কেন এলেন? কেউ কি স্বেচ্ছায় বস্তিতে থাকে? 
আসলে তাঁরা এসেছেন কাজের জন্য। শহরের অর্থনীতিতে, শহরের বাজারে তাঁদের প্রয়োজন পড়েছে। তাঁদের শ্রম এই শহরের নির্মাণ করেছে। পণ্য পৌঁছে দিয়েছে, রাস্তায় ব্যবসা করেছে, পরিবহণ চালিয়েছে, শিল্প ও পরিষেবা খাতকে সচল রেখেছে। তাহলে শহরের উন্নয়নের সময়ে তাঁদের অস্তিত্বই কেন সমস্যায় পরিণত হয়?
এই দ্বন্দ্বের উত্তর নিহিত রয়েছে জমি ও পুঁজির সম্পর্কের মধ্যে। শহরের জমির মূল্য বৃদ্ধি পেলে, সেই জমি আরও বেশি মুনাফার সম্ভাবনা তৈরি করে। তখন সেই জায়গা রিয়েল এস্টেড ব্যবসায়ীর কাছে সম্পদ হয়ে ওঠে। যা কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হয়। 
কলকাতার ইতিহাস এই দ্বন্দ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ঔপনিবেশিক সময়কাল থেকেই শিল্পায়ন, বন্দর, বাণিজ্য এবং পরবর্তী সময়ে পরিষেবা অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শহরে শ্রমের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রাম ও মফস্বল থেকে মানুষ এসেছে কাজের সন্ধানে। কিন্তু শ্রমের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমজীবী মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামো তৈরি হয়নি। UN-Habitat-এর কলকাতা বিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, শহরের পুরানো বস্তিগুলির বিকাশ শিল্পায়ন, শ্রমের আগমন এবং শহরের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ বস্তি শহরের বাইরে কোনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, কলকাতার নগর ইতিহাসেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অথচ নতুন সরকার আসার সাথে সাথেই কলকাতার বস্তি অঞ্চল উচ্ছেদের সম্মুখীন হয়েছে। একের পর এক বস্তি, মানুষের জীবিকা বুলডোজারের সামনে গুঁড়িয়ে গেছে। আমরা সেই দৃশ্য দেখেছি কলকাতার বিভিন্ন দিকে। নিউ মার্কেট থেকে তপসিয়া হয়ে এখন বুলডোজারের আতঙ্ক ছড়িয়েছে কলকাতার গঙ্গার ধারে। প্রায় ১১ কিমি লম্বা এই এলাকা জুড়ে রয়েছে মানুষের বসতি, জীবিকার সংস্থান। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে এই দীর্ঘ এলাকা জুড়ে বিভিন্ন স্থানে ছোটখাট মন্দির মসজিদও রয়েছে। এই চিত্র দেখতে দেখতে মাথায় আসে বারাণসীর কাশী বিশ্বনাথ করিডোরের কথা। করিডোরের গুঁতোয় ভেঙেছে বহু হিন্দু মন্দির, দেবতার মূর্তি। বারাণসীর গঙ্গা, মনিকর্ণিকা ঘাট, পুরানো স্থাপত্য এখন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। 
আদতে তৃণমূল আমল থেকেই এই বিস্তীর্ণ জমির দিকে জমি হাঙরদের নজর পড়েছিল। ইতিমধ্যেই কুমারটুলি ঘাট আদানি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিয়েছে সরকার। আদানির সংস্থা নাকি সৌন্দর্যায়নের ব্যবস্থা করবে সেখানে। গড়ে উঠবে পর্যটন শিল্প। একই অবস্থা গঙ্গার ধারে পোর্টের জমির ক্ষেত্রেও। সেই জমিও আসতে আসতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে আদানি আম্বানিদের হাতে। কাশীপুর সর্বমঙ্গলা ঘাটের কাছে থাকা জ্যোতিনগর বস্তি। দীর্ঘকাল ধরে এখানে বসবাস করে আসছেন ৫০০র অধিক পরিবার। ২০২৩ সালে তৃণমূলের এলাকার নেতারা পয়সা খেয়ে, সাধারণ মানুষকে অন্ধকারে রেখে, এই জমি থেকে উৎখাত করার ব্যবস্থা করেছে। নতুন সরকার আসার পরে স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রিতেশ তিওয়ারি ঘোষণা করেছেন, এই অঞ্চলের মানুষ ওনাকে ভোট দেননি, তাই তারা কোনও পরিষেবা পাবে না। জ্যোতিনগর বস্তি অঞ্চল হলো সংখ্যালঘু প্রধান অঞ্চল। তাই তারা পরিষেবার বাইরে। একই সাথে এই অঞ্চল থেকে উচ্ছেদের জন্য মাসাধিক সময় হলো পানীয় জল সরবরাহ বন্ধ। বিভিন্ন জায়গা বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ। ভেবে দেখুন স্বাধীনতার ৮০ বছর হতে চলল, এখনও আমার দেশের একটি অঞ্চলের মানুষ পানীয় জল পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত। একদিকে তারা সংখ্যালঘু মানুষ, তাই বঞ্চিত। অন্য দিকে গঙ্গার ধার ফলত সেই জমির মূল্য চড়া। তুলে দিতে হবে রিয়াল এস্টেট কোম্পানির হাতে। গড়ে উঠবে রিভার সাইড অ্যাপার্টমেন্ট। যারা থাকবে তারা প্রয়োজন মতো গঙ্গার হাওয়াও পাবে, বহুতলে শুয়ে। অথচ যারা এতোকাল ধরে ওখানে কষ্ট করে রইলেন, তাদের জাস্ট মুছে ফেলা হবে। সহজ কথায় জমিতে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার থাকবে না, অধিকার থাকবে কেবল আদানিদের। 
এই আলোচনাতে প্রথমেই পরিষ্কার ধারণা করে নেওয়া উচিত, কোনও মানুষ স্বেচ্ছায় বস্তিতে থাকে না। বস্তিতে থাকা আসলে মেহনতি মানুষের বাধ্যবাধকতা। শহরের জমির অত্যধিক মূল্য, অর্থের অভাব একই সাথে কাজের জন্য শহরের কাছাকাছি থাকতে চাওয়ার বাধ্যবাধকতা, এই কারণেই বস্তি গড়ে ওঠে। কিন্তু এই ডাবল ইঞ্জিন সরকার বস্তি সাফ করতে নেমেছ। গোটা দেশের ক্ষেত্রেও এই একই পন্থা অবলম্বন করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। বোম্বের ধারাবি বস্তি তুলে দেওয়া হচ্ছে আদানির হাতে। ফলত সেই পথ অনুসরণ করে শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় মিষ্টি বিলানো আদানি’র হাতেই যে এই রাজ্যের জল জঙ্গল জমি যেতে চলেছে, সেই নিয়ে সন্দেহর জায়গা নেই। 
শহরের বস্তিগুলিতে মানুষের নিজের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য বামফ্রন্ট সরকার আইন এনেছিল। সেই আইন বস্তিবাসী মানুষকে তার জমির উপর অধিকার দিয়েছিল। একই সাথে এসেছিল বিদ্যুতের লাইন, মিটার বক্স, জলের লাইন। কিন্তু বিগত সরকার সেই আইন পরিবর্তন করে, যার ফলে সাধারণ বস্তিবাসী মানুষের অধিকার সঙ্কুচিত হয়। সেই কাজকেই আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। 
একসময় অবৈতনিক স্কুল, চিকিৎসা কেন্দ্র, পাকা বাথরুমের ব্যবস্থা হয়েছিল। এখন সেসব ভগ্নপ্রায় দশা। প্রায় সব বস্তিতেই স্কুলগুলোতে তালা পড়েছে। চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। বাথরুম গুলো অস্বাস্থ্যকর। অধিকাংশ বস্তিতেই মহিলাদের জন্য নেই পৃথক বাথরুমের ব্যবস্থা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ফলে বাড়ছে ইউটিআই’র মতন রোগ। বর্ষাকালে জমা জলে বাড়ছে রোগবালাই। বস্তির ভিতরে বিদ্যুতের তারগুলো এমনভাবে ঝুলে রয়েছে, বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। বড়লোক বাড়ির নোংরা জল এসে জমছে বস্তিগুলোতেই। বিগত সরকারের মতন এই সরকারেরও সেই বিষয়ে কোনও জরুরি পদক্ষেপ নেই। 
এখান থেকেই পরিষ্কার ধারণা করা যায় সরকারি সহযোগিতায় চলছে উচ্ছেদ। আর এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে, শহরটি কার জন্য তৈরি হচ্ছে? যে শ্রমজীবী মানুষ নির্মাণ শ্রমিক, হকার, গৃহকর্মী, পরিবহণকর্মী, ডেলিভারিকর্মী কিংবা ছোট ব্যবসায়ী হিসাবে শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখেন, তাঁরাই এখন সবচেয়ে প্রান্তিক অংশ। অন্যদিকে জমি ও নগর পরিকাঠামো ক্রমশ পুঁজির কাছে লাভজনক সম্পদে পরিণত হচ্ছে।
রেবেল সিটিজ-এ ডেভিড হার্ভে এই সমস্যাকে আরও রাজনৈতিক করে তোলেন। তাঁর কাছে ‘রাইট টু দ্য সিটি’ মানে শুধু শহরে থাকার অধিকার নয়। বরং শহর কীভাবে তৈরি হবে, জমি ও পরিকাঠামো কীভাবে ব্যবহৃত হবে এবং নগরের সম্পদ কার স্বার্থে ব্যবহৃত হবে, সেই সিদ্ধান্তে জনগণের অধিকার। অর্থাৎ শহরের ওপর অধিকার বৃহৎ পুঁজির মালিকের নয়। এই শহর যে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষ তৈরি করছে, তাদের। 
সুতরাং কলকাতার বস্তি উচ্ছেদ, হকার উচ্ছেদ, নদীতীরের জমির পুনর্বিন্যাস কিংবা বৃহৎ রিয়েল এস্টেট ও পরিকাঠামো প্রকল্পকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখা যায় না। প্রশ্নটি আরও গভীর: নগর উন্নয়ন কি মানুষের জীবনকে উন্নত করবে, নাকি মানুষের জীবন সরিয়ে জমিকে পুঁজির জন্য আরও মূল্যবান করে তুলবে?
হার্ভের শিক্ষা এখানেই, শহর নিজে নিরপেক্ষ নয়। শহর কে তৈরি করবে, কার জন্য তৈরি হবে এবং শহরের ওপর কার অধিকার থাকবে, এই প্রশ্ন আসলে শ্রেণির প্রশ্ন। তাই শ্রমজীবী মানুষের বাসস্থান, জীবিকা ও জনপরিসরের অধিকার রক্ষা বা কেবল পুনর্বাসনের দাবি নয়। এটি শহরের মালিকানা ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। যে কলকাতা এককালে দু’হাত খুলে ধারণ করার চেষ্টা করেছে, এই সমাজের প্রান্তিক অংশকে। এখন আদানিদের গুঁতোয় কলকাতার চরিত্র পালটাচ্ছে। তাই এই লড়াই যেমন কোর্টের ভিতরে হবে, বিধানসভায় হবে। তেমনই আরও তীব্রভাবে রাস্তায় হবে। 

সরকারি সহযোগিতায় চলছে উচ্ছেদ। আর এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে, শহরটি কার জন্য তৈরি হচ্ছে? যে শ্রমজীবী মানুষ নির্মাণ শ্রমিক, হকার, গৃহকর্মী, পরিবহণকর্মী, ডেলিভারিকর্মী কিংবা ছোট ব্যবসায়ী হিসাবে শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখেন, তাঁরাই এখন সবচেয়ে প্রান্তিক অংশ। অন্যদিকে জমি ও নগর পরিকাঠামো ক্রমশ পুঁজির কাছে লাভজনক সম্পদে পরিণত হচ্ছে।

Comments :0

Login to leave a comment