মীর আফরোজ জামান: ঢাকা
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশজুড়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে ১৯৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আরও ৯৭৪ জন। স্বাস্থ্য প্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৭৭৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫ জনের হাম পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছিল, আর ৬৮৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। একই সময়ে ১ লক্ষ ২৯ হাজার ২৪২ শিশু আক্রান্ত। তারমধ্যে ১৪ হাজার ১০৪ জনের হাম পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, উপসর্গ থাকা প্রায় ৮৫ শতাংশ রোগীদের অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। এখনও পর্যন্ত ৯৪ হাজার ২৭৫ জন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বর্তমানেও কয়েক হাজার রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জনস্বাস্থ্য ইতিহাসে অন্যতম বড় সংক্রামক রোগের সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে, কোনো এলাকায় হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে দ্রুত প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। বাংলাদেশের কিছু জেলা ও দুর্গম এলাকায় নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু ঝুঁকিতে পড়ে। স্বাস্থ্যকর্মীরা অভিযোগ করে বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণার কারণে অনেক অভিভাবক শিশুদের সময়মতো টিকা দেননি। ফলে অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে।
ইউনিসেফ বলছে, অপুষ্টিতে ভোগা এবং বিশেষ করে ভিটামিন-এ ঘাটতিযুক্ত শিশুদের মধ্যে হাম মারাত্মক জটিলতা তৈরি করে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও মস্তিষ্কের প্রদাহে মৃত্যুঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে কেবল হাসপাতালে চিকিৎসা বাড়িয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। জরুরি ভিত্তিতে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি চালাতে হবে। যেসব শিশু টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। অপুষ্ট শিশুদের ভিটামিন-এ নিশ্চিত করতে হবে। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে চিকিৎসা দিতে হবে। ইউনিসেফও বলছে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো দুই ডোজ এমআর টিকা নিশ্চিত করা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য পর্যালোচনা করে কয়েকটি উদ্বেগজনক বিষয় সামনে এসেছে। অনেক জেলায় নিয়মিত টিকাদানের বৈষম্য রয়েছে। দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানো এখনও কঠিন। আক্রান্ত শিশুদের অনেককে দেরিতে হাসপাতালে আনা হচ্ছে। ল্যাবে নিশ্চিত রোগীর তুলনায় "উপসর্গভিত্তিক" রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি, যা নজরদারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশ একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাব দেখিয়ে দিয়েছে, টিকাদানে সামান্য শৈথিল্যও কত বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। তিন মাসে ৭৭৯ শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, টিকাদান কর্মসূচি এবং জনসচেতনতার জন্য বড় সতর্কবার্তা। দ্রুত, সমন্বিত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ ছাড়া এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
Bangladesh Measles Death
বাংলাদেশে হামে গত ২৪ ঘন্টায় ৮, তিন মাসে ৭৭৯ শিশুর মৃত্যু
×
Comments :0