Editorial

মূর্তি ভাঙা যায় তত্ত্ব মোছা যায় না

সম্পাদকীয় বিভাগ

রাজ্য বিধানসভা ভোটে জেতার পর পরই মুর্শিদাবাদে প্রথম আক্রান্ত হয় লেনিন মূর্তি। গেরুয়া গামছা গলায় ঝুলিয়ে জয় শ্রীরাম স্লোগান দিতে দিতে ভেঙে উপড়ে ফেলে দেয় বহুদিনের প্রতিষ্ঠিত লেনিন মূর্তিটি। সোশাল মিডিয়ায় মূর্তিভাঙা ভিডিও থেকে উন্মত্ত গেরুয়াবাহিনীর যে উন্মাদনা এবং হিংস্রতার অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছিল তাতে তাদের প্রকৃতিস্থ বলে মনে হবার কোনও কারণ ছিল না। তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ দেখে অনেকেরই স্থির বিশ্বাস জন্মেছে যে লেনিন কে? কেন দেশে দেশে লেনিন সম্মানিত, আলোচিত তার বিন্দু বিসর্গও এদের জানা নেই। অনুগত বা ভাড়াটে দুষ্কৃতীদের মতো হুকুম পেয়ে বা বরাত পেয়ে নেমে পড়েছে মূর্তি ভাঙার কাজে। ছাড় পাচ্ছে না রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতো পণ্ডিতরাও।
এরপরই যাদবপুরে ৮বি বাস স্ট্যান্ডে হিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতীদের হাতে আক্রান্ত হয় লেনিন মূর্তি। প্রবল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে অবশ্য তারা ভাঙার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি। ধর্মান্ধ রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের ঠিকাদাররা রাজ্যে ক্ষমতা দখলের পর গত দু’মাসের মধ্যে অনেক জায়গাতেই বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অবিস্মরণীয় পথিকৃৎদের উপর অনুরূপ হামলার ঘটনা ঘটেছে। ত্রিপুরায় এরা ক্ষমতায় আসার পরও এভাবেই লেনিন মূর্তি ভাঙা হ‍‌য়েছে। এটা শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বের সর্বত্রই অতি দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শ তথা ফ্যাসিস্ত মতাদর্শের অনুগামী রাজনৈতিক দলগুলি লেনিনকে সহ্য করতে পারে না। আসলে লেনিন যে শোষণহীন, শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক সব ব্যবস্থার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিলেন রাশিয়ার বুকে এবং যে ব্যবস্থার পথে ধাপে ধাপে এগিয়েছে চীন, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, কিউবা সহ বিভিন্ন দেশ সেই সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার ঘোরতর বিরোধী অতি দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ধারক ও বাহক হিন্দুত্ববাদীরা।
ধর্মের নামে, জাতের নামে এরা সমাজকে ভাগ করে দ্বন্দ্বে জীর্ণ করে রেখে সম্পদের কেন্দ্রীভবনের ব্যবস্থাপনাকে দৃঢ় ও স্থায়ী করতে চায়। গণতন্ত্রকে নিছক নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে তার আড়ালে আধিপত্যবাদ ও স্বৈরতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। হিন্দুত্ববাদরূপী অতি দক্ষিণপন্থার রাজনীতি পুঁজিতন্ত্রেরই অগ্রবর্তী ও আগ্রাসী রূপ। পুঁজি ও সম্পদের অতিকেন্দ্রীভবনই পুঁজিবাদের লক্ষ্য। মুষ্টিমেয় কিছু ধনপতি দেশের ও বিশ্বের বেশিরভাগ সম্পদের মালিক হবে। অবশিষ্ট মানুষ শ্রম দিতে দিতে কোনোরকমে টিকে থাকবে।
লেনিন পুঁজিবাদের এই ব্যবস্থাটাকেই ভেঙে চুরমার করে পুঁজি ও সম্পদের মালিকানা রাষ্ট্র তথা সমাজের হাতে তুলে দেবার আয়োজন করেছিলেন। দেশ ও দেশের সম্পদের মালিক শাসক ঘনিষ্ট কিছু ধনপতি নয়, দেশের মানুষ। যাদের শ্রমে উৎপাদন সম্পদের বণ্টন হবে তাদের মধ্যেই। দে‍‌শের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ যদি তাদের হক দাবি করে এবং জোটবদ্ধ হয়ে সব বদলে দেয় তাহলে আদানি-আম্বানিরা দেশের বেশিরভাগ সম্পদের মালিক হতে পারবে না। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি চায় না দেশের সম্পদের আসল মালিক হোক দেশের মানুষ। তাই ভারতের জনগণের মনে লেনিনের ভাবনা যাতে কোনোভাবেই ঢুকতে না পারে তাই লেনিনকে উপড়ে ফেলার নির্বোধ প্রয়াস চালাচ্ছে লেনিনের মূর্তি ভেঙে। মূর্খরা বোঝেই না মূর্তি ভেঙে বামপন্থা তথা সমাজতান্ত্রিক ভাবনাকে ভোলানো যায় না। মার্কসবাদ, বামপন্থা, সমাজতন্ত্র চর্চার বিষয় অনুসরণের বিষয়। জীবন সংগ্রামের অভিজ্ঞতায় মেহনতি মানুষ আকৃষ্ট হন বামপন্থায়। তাই ক’টা মূর্তি ভেঙে বা পাঠ্যসূচি থেকে মার্কসবাদ বাতিল করে বামপন্থাকে মোছা যায় না। তত্ত্ব যদি যুক্তি, বিজ্ঞান ও বাস্তবানুসারী হয় তবে তার জয় অনিবার্য। যুক্তি ও বিজ্ঞান বিরোধী ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদীরা কোনোদিনই সেটা উপলব্ধি করতে পারবে না। নির্বোধ পাশবিকতা তাই তাদের একমাত্র হাতিয়ার।

Comments :0

Login to leave a comment