অরিজিৎ মণ্ডল: শ্রীরামপুর
পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বর তুলতে হবে সর্বস্তরে। সমান অধিকারের কথা শুধু মুখে বললেই হবে না নিজেদের ব্যক্তি জীবনে আত্মস্থ করতে হবে। তবেই শ্রেণিবিভক্ত সমাজের আমের দাবিতে লড়াই করা সম্ভব হবে। এসএফআই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির ছাত্রী কনভেনশনে আলোচনায় উঠে এলো এই আহ্বানই।
১৪০ জন প্রতিনিধি নিয়ে এদিনের এই কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয় শ্রীরামপুরে লক্ষ্মী সায়গল মঞ্চ ও তিলোত্তমা নগরে। ২৪ জন প্রতিনিধি আলোচনা করেন। ছাত্রী কনভেনশন থেকে ৩৭ জনের ছাত্রী সাব কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই সাব কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়েছেন সোনালি মজুমদার ও বর্ণনা মুখার্জি। সহ আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়েছেন ঊষসী রায় চৌধুরী, অদিতি নন্দী, বিপাশা সাহা।
এদিনের কনভেনশনে বক্তব্য রাখেন এসএফআই কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক শিল্পা সুরেন্দ্রন। তিনি বলেন, শেষ ১০ বছরে মহিলাদের উপর অত্যাচার বেড়েছে আমাদের দেশে। বিশেষ করে যেখানে তথাকথিত ডবল ইঞ্জিনের সরকার অনেকদিন থেকেই রয়েছে, সেখানে অত্যাচারের হার অনেক বেশি। ‘তোড় দো আজ ইয়ে সমাজ, নারী জিসমে বন্ধ হায় আজ’, এই স্লোগান দিয়েই মনুবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।
সুরেন্দ্রন বলেন, মহিলাদের উপর আক্রমণ শুধুমাত্র সামাজিক ক্ষেত্রেই থেমে নেই। ক্যাম্পাসেও ছাত্রীদের উপর আক্রমণ বেড়েছে। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’ লাগু হওয়ার পর থেকে শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণ এবং বাণিজ্যিকীকরণ মারাত্মক হয়েছে। শিক্ষা শুধু বড়লোকের হাতেই কুক্ষিগত থাকবে, এমন নীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর বিরুদ্ধে এসএফআই লাগাতার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
দেশের ছাত্র আন্দোলনের এই নেত্রীর কথায়, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার জন্য দরকার আইসিসি নির্বাচন। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে এসএফআইয়ের অন্যতম প্রধান দাবি এই নির্বাচন। লাগাতার আন্দোলনের ফলে রাজ্য এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এই দাবি আদায় করা গেছে। এই দাবি আরও সর্বাত্মক করতে হবে।
সুরেন্দ্রন বলেন, ক্যাম্পাসের মধ্যে এবিভিপি’র বিরুদ্ধে লড়তে হবে। সেই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেবে এসএফআই।
এসএফআই ছাত্রী কনভেনশনের মঞ্চে বলছেন শিল্পা সুরেন্দ্রন।
এদিনের আলোচনায় মুর্শিদাবাদের প্রতিনিধি বলেন সমাজে প্রতিনিয়ত বাধা তো রয়েছেই। সরকারি এবং প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে ছাত্রীদের। মুর্শিদাবাদ জেলায় সংখ্যালঘু অংশের বহু ছাত্রীর নাম বাদ গিয়েছে এসআইআর-এ। তাদের পাশেও এসএফআই রয়েছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে আমাদের।
পুরুলিয়ার প্রতিনিধি জানান, প্রান্তিক অংশের জেলা হওয়ার জন্য পুরুলিয়ায় ছাত্রীদের মধ্যে শিক্ষার প্রবণতা এখনও পর্যন্ত অনেক কম। শহরকেন্দ্রীক এলাকায় পড়াশোনার হার বাড়লেও যৌন হেনস্তা সম্পর্কিত বিষয় সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রেও থেকে যাচ্ছে সামাজিক বাধা।
আলোচনায় উঠে এসেছে যে উচ্চশিক্ষার জন্য ছাত্রীদের এখনও বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। ছেলেদেরই পরিবারে সুযোগ বেশি দেওয়া হয়। আর্থিক সমস্যার জন্য অনেককে ‘ড্রপ আউট’ হতে হচ্ছে। অবৈতনিক শিক্ষা পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার শুরু করেছিল। কিন্তু তৃণমূল সরকারের সময় আট হাজারের বেশি স্কুল বন্ধ হয়েছে, যার বেশিরভাগ গ্রামীণ। এছাড়াও প্রান্তিক এলাকায় রয়েছে বাল্যবিবাহের সমস্যা। বাল্যবিবাহ রোধে আলাদা পরিকল্পনা করা প্রয়োজন রয়েছে।
আলোচনায় ছাত্রী কনভেনশনের এক প্রতিনিধি।
প্রতিনিধিরা বলেন, দেশের হয়ে সেনা আধিকারিক সোফিয়া কুরেশি লড়াই করছেন। মহিলা ক্রিকেট দল বিশ্ব জয় করছে কিন্তু সেই দেশেই নারীরা নির্যাতনের কাজ হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল ছাত্র সংগঠন হিসেবে এসএপআই-কে রুখে দাঁড়াতে হবে।
ছাত্রী কনভেনশন থেকে সব ক্যাম্পাসে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিনের দাবিতে প্রস্তাব, ক্যাম্পাসে আইসিসি নির্বাচনের দাবিতে প্রস্তাব, নারী নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দাবিতে প্রস্তাব, বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে প্রস্তাব, জেন্ডার নিউট্রাল টয়লেটের দাবিতে প্রস্তাব, চা বলয়ে ছাত্রী স্কুলের দাবিতে প্রস্তাব, মনুবাদের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পেশ করা হয়। সর্বসম্মতিতে সব প্রস্তাব পাশ হয়।
Comments :0