‘‘হার স্বীকার করতে হবে ইরানকে। নইলে বোমা ফেলে ওদের ঠান্ডা করা হবে!’’ ইরানের পালটা মারে নিজেই পিছু হঠে একতরফা বিরতি ঘোষণা করেছিলেন। এবার মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবদার, যুদ্ধে তিনিই যে ‘জয়ী’ ইরানকে তা স্বীকার করতে হবে, নইলে ‘শাস্তি’!
বৃহস্পতিবার সকালে ট্রাম্প হুঙ্কার দেন, ‘‘ইরানের কূটনীতিকরা বড়ই অদ্ভুত। ওরা যুদ্ধ বিরতির ভিক্ষা চাইছে, ওদের সেনাবাহিনী শেষ হয়ে গিয়েছে, ঘুরে দাঁড়ানোর কোনও সুযোগ নেই। এদিকে বলছে, ওরা নাকি আমাদের প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখছে। ওদের বলব, এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে। তা নাহলে আর কোনও সুযোগ দেওয়া হবে না।’’
দিন চারেক আগে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি নিজেই যুদ্ধ বিরামের জন্য প্রায় তেহরানের পায়ে পড়া বাকি রেখেছিলেন। যুদ্ধ শুরুর দায় নিজের ঘার থেকে ঝেড়ে ফেলতে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথকে উসকানি দেওয়ার জন্য দুষেছিলেন। পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর সহ বিভিন্ন শরিক দেশকে দিয়ে সমঝোতার জন্য তেহরানের শীর্ষ নেতাদের প্রায় পায়ে ধরা বাকি রেখেছিলেন! প্রথমদিকে ইরান ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাব উড়িয়ে দেয়। তবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায়
মঙ্গলবার থেকে তেহরান সমঝোতার প্রতি কিছুটা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া রাখতেই ট্রাম্প এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন ইরানই তাঁর কাছে শান্তির প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। এতে রাজি হওয়া একান্তই তাঁর মর্জির ওপর নির্ভর করছে। ট্রাম্প যে জয়ী হয়েছেন, ইরান তা স্বীকার না করলে কোনও সমঝোতাই নাকি হবে না।
ট্রাম্পের তর্জন-গর্জনে ইরান গুরুত্বই দেয়নি। পাকিস্তান মারফত আমেরিকা যে সমঝোতা প্রস্তাব পাঠিয়েছে, বুধবারেই তেহরান তা সমূলে প্রত্যাখান করেছে। ওয়াশিংটনের প্রস্তাবকে ‘কুৎসিত’ বলে কটাক্ষ করে এদেশের এক শীর্ষ কর্তা জানান, ‘‘আমেরিকা রোজই তার গোলপোস্ট পালটাচ্ছে। আমরা আমাদের দাবিতে অনড়।’’ ট্রাম্প পালটা বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযানের হুমকি দিলে ইরানের এক শীর্ষ সেনাকর্তা জানান, ‘‘আমেরিকা যে যুদ্ধের ভয় আমাদের দেখাচ্ছে, আমরা গত দুই দশক ধরে তার প্রস্তুতি নিচ্ছি। একবার এখানে নেমে দেখুক, ‘সামঞ্জস্যহীন যুদ্ধ’ (অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার) কাকে বলে ওদের আমরা শিখিয়ে দেব!’’
ট্রাম্পের হুমকিতে সমর্পণের প্রশ্নই ওঠে না, স্পষ্ট জানিয়েছে তেহরান। ট্রাম্পের ১৫ দফা প্রস্তাবের বিপরীতে ইরানের তরফে পাঁচ দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে— অবিলম্বে আগ্রাসন ও সুনির্দিষ্ট হত্যা অভিযান বন্ধ করতে হবে, ভবিষ্যতে আর কখনও হামলা করা হবে না তার নিশ্চয়তা দিতে হবে, যুদ্ধে ইরানের যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, চুক্তির আওতায় সমস্ত ফ্রন্ট ও মিত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং পুনরায় সংঘাত ঠেকাতে কার্যকর প্রয়োগযোগ্য বিধি তৈরি করতে হবে।
ইরান যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে দক্ষিণ লেবাননে লাগাতার বোমাবর্ষণ করে চলেছে ইজরায়েল। ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবোল্লাকে ‘খতম’ করার লক্ষ্যে এই অভিযান চলছে বলে তারা দাবি করেছে। দক্ষিণ লেবাননের অন্তত ১০ লক্ষ নিরীহ মানুষ ইজরায়েলের বেপরোয়া হামলায় বাস্তুহারা হয়েছেন। নিহত হয়েছেন ১০৯৪ জন। প্যালেস্তাইনের মতো লেবাননের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অঞ্চল ইজরায়েল ‘বাফার জোন’ হিসাবে চিহ্নিত করে সেখানে স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি রাখতে চাইছে।
তেহরান জানিয়েছে, সংঘর্ষ বিরতির প্রস্তাবে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যে কোনও চুক্তির মধ্যে লেবাননে হেজবোল্লার বিরুদ্ধে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার শর্ত থাকতে হবে। ইরানের এই দাবি আমেরিকার জন্য কূটনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইজরায়েল জানিয়েছে, লেবানন প্রসঙ্গে সমঝোতা প্রস্তাবে কোনও আলোচনা হতে পারে না। অর্থাৎ কোনও শর্তেই দক্ষিণ লেবাননের দখল নেওয়ার থেকে তাদের আটকানো যাবে না। আমেরিকার এক শীর্ষ কর্তা একই সুরে বলেছেন, ইরানের মদতপ্রাপ্ত সমস্ত গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করা স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত। মূল সমঝোতায় হেজবোল্লাকে কখনই অংশীদার হিসাবে তারা মানতে রাজি নয়।
এদিকে বৃহস্পতিবারেও পশ্চিম এশিয়া জুড়ে বিক্ষিপ্ত হামলা, পালটা হামলা চলেছে। বৃহস্পতিবার ইরান ইজরায়েলের দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে ইজরায়েলের মধ্য ও উত্তর অঞ্চলে সাইরেন বেজে ওঠে। তেল আভিভ ও তার আশপাশে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। কিছু হামলায় ইরান ক্লাস্টার বোমা ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে বেশ কয়েকটি জনবহুল এলাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
ইরানের নানা শহরেও হামলা চালিয়েছে ইজরায়েল। বিশেষ করে ইসফাহানের কৌশলগত পরিকাঠামো লক্ষ্য করে আবারও বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। এদিনের হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা তাঙশিরি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইজরায়েলী সেনা। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানী তেহরানের উত্তর দিকের শহরতলিতে একাধিক বিস্ফোরণের খবর মিলেছে।
লেবাননের দক্ষিণে ইজরায়েলী হানাদারদের সঙ্গে হেজবোল্লার সংঘর্ষ তীব্র আকার নিয়েছে। ইজরায়েলের উত্তর দিকে হেজবোল্লা রকেট ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। গত সপ্তাহ দুয়েক ধরে এই অঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করেছে ইজরায়েল। তবে এতে ইজরায়েলী সেনার ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। গুলির লড়াইয়ে ইজরায়েলের একাধিক সেনা কর্মী নিহত হয়েছেন।
এদিকে যুদ্ধ থামাতে বিভিন্ন মহলের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। তুরস্কও মধ্যস্থতায় আগ্রহ দেখিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে মিশরের বিদেশ মন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি জানান, তাঁর দেশের সরকারও মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে। তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের মন্তব্যে যুদ্ধ বিরতি নিয়ে আমেরিকার আদৌ সদিচ্ছা রয়েছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেজ এদিন বলেন, ফলন ঋতুর সময়ে হরমুজ প্রণালী এতদিন ধরে বন্ধ থাকায় তেল, গ্যাস ও সার পরিবহণ থমকে গিয়েছে। পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে এবং গোটা বিশ্বে এতে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব প্রশমনে রাষ্ট্রসঙ্ঘ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রভাব সীমিত রাখার সব থেকে সহজ উপায় যুদ্ধ পত্রপাঠ বন্ধ করা।
Iran
‘‘আমিই জিতেছি, স্বীকার না করলে ইরানে বোমা ফেলব!’’ হুঙ্কার ট্রাম্পের
×
Comments :0