ঈশিতা মুখার্জি
“এক রাজপুত্র, এক মন্ত্রীপুত্র, এক সওদাগরপুত্র, এক কোটালপুত্র— চার জনে খুব ভাব। কেহই কিছু করেন না, শুধু ঘোড়ায় চড়িয়া বেড়ান। দেখিয়া শুনিয়া রাজা, মন্ত্রী, সওদাগর, কোটাল বিরক্ত হইয়া উঠিলেন; বলিয়া দিলেন— ছেলেরা খাইতে আসিলে ভাতের বদলে ছাই দিও।“এই রূপকথার গল্পটা ইদানীং চারপাশের গতিবিধি দেখে মনে পড়ে গেল। গল্পটা একটু পালটে গেছে এখনকার ভারতে। এখানে পুত্রদের বদলে রাজা, মন্ত্রী, সওদাগর, কোটাল সকলেই ঘোড়ায় চড়ে বেড়াচ্ছে আর প্রজাদের প্রতি নির্দেশ দিচ্ছে যে আপনারা ভাতের বদলে ছাই খান। এটাই এখন আমাদের দেশের নতুন আখ্যান ‘সোনার কাঠি রুপার কাঠি”’। সোনা কেনা যাবে না, রান্নার তেলে সাশ্রয় চাই, কারণ হাল্লা চলেছে যুদ্ধে।
১৪ মে ২০২৬ নির্দেশ পেয়ে গেছে দেশের মানুষ। সোনা কম কিনতে হবে, রান্নার তেল কম কিনতে হবে, ঘর থেকে কাজ ( ডব্লুএফএইচ) করতে হবে যাতে পেট্রল ডিজেল কম খরচ হয়, দেশে চালু হয়েছে সাশ্রয়ের সময়। সংসার করে দেশের সাধারণ মানুষ। মাসমাইনের মানুষের মাসের শেষ বলে একটি বিষয় আছে। কিন্তু এখন সেসব দিন গেছে। মাসমাইনে পান এমন মানুষ হাতে গোনা। তাই সাশ্রয় তো এখন প্রতিদিন। চমকে উঠে প্রজারা তাই ভাবে, রাজার এমন দশা হলো কি করে? না, রাজার এমন দশা হয়নি, হয়েছে প্রজাদের। প্রজাদের সাশ্রয় করার কারণ দেশের আর্থিক গতিবিধি। যুদ্ধের কারণে নাকি এই দুরবস্থা ভারতের। কি ঘটেছে দেশে? দেশে বৈদেশিক বাণিজ্যিক লেনদেনে ঘাটতি বেড়ে গেছে। আমদানি বাবদ খরচ বেড়েছে, ওদিকে বাইরের দেশে তেমনভাবে রপ্তানি বাড়েনি, রপ্তানি থেকে আয় কমেছে। তাই যা হওয়ার তাই হয়েছে। লেনদেনে ঘাটতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের যুদ্ধ নিঃসন্দেহে এর জন্য দায়ী। হরমুজ প্রণালী বন্ধের কথা এতদিনে সবাই জানে। কিছুদিন আগেও দেশে মজুত বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ছিল ৬০০ থেকে ৬৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দিয়ে ১০ থেকে ১১ মাসের আমদানি খরচ মেটানো সম্ভব ছিল। কিন্তু সেই ভাণ্ডারে হঠাৎ টান পড়েছে, কয়েক দিনেই ৫.২% হারে কমতে শুরু করেছে এই ভাণ্ডার। দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে সোনা এবং তেল। ২০২৫-২৬ সালে সোনার আমদানি গত কয়েক বছরে ছিল সর্বোচ্চ যার পরিমাণ ছিল ৭১.৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকার তাই আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দিল। দাম বাড়লে ফাটকা কেনা বেচা বাড়ে। সোনাতেও হয়েছে ফাটকা কেনা বেচা।
সোনা কেনার উপর নিয়ন্ত্রণ সরাসরিভাবে সাধারণ পরিবারের সঞ্চয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ। মর্গ্যান স্ট্যানলির ২০২৫ সালের রিপোর্ট জানাচ্ছে যে দেশের পরিবারগুলির কাছে গচ্ছিত সোনার পরিমাণ হলো ৩৪,৬০০ টন। দেশের পরিবারগুলির কাছে যে পরিমাণ সোনা রয়েছে তার মূল্য ৪৫৬ লক্ষ কোটি টাকা। এ ছাড়া রিজার্ভ ব্যাঙ্ক,ইক্যুইটি ইত্যাদিতেও রয়েছে বেশ কিছু সোনা। দেশের সরকারও সোনা রাখে আর্থিক নিরাপত্তার খাতিরে। ২০২৫ সালে ভারতের সোনা আমদানি ছিল বিশ্ববাজারের ২৬%, নেহাত কম নয়। ভারত সোনা কিনেছে সুইজারল্যান্ড, আরব দেশগুলি এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে। সোনা আমদানির ৪০% হয়েছে সুইজারল্যান্ড থেকে। দেশের মধ্যে যা সোনা রয়েছে তার বেশির ভাগটাই রয়েছে গয়নায়। গয়নায় রয়েছে গচ্ছিত সোনার দুই তৃতীয়াংশ। দেশে আর্থিক বৈষম্য বেড়েছে। কোটিপতিদের সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে স্বল্প আয়ের মানুষের সংখ্যা। কিন্তু সোনা রয়েছে কাদের কাছে? যাদের আয় বেশি তারা বেশি সোনা কিনছে না, কিনছে নিম্ন এবং মাঝারি আয়ের পরিবারগুলি। বছরে ৫ লক্ষ টাকার আয়ের চেয়ে কম আয়ের পরিবারগুলির হাতেই রয়েছে সোনার ৭০% সম্ভার। কেন কিনছে মানুষ এই সোনা? যুগ যুগ থেকে সোনা আর্থিক নিরাপত্তা যুগিয়েছে দেশের মানুষকে। দেশের সাধারণ পরিবারগুলি আজ বেকারত্ব, ঋণের দায়ে, এবং সঞ্চয়ের উপর সুদের হার কমে যাওয়ার জন্য কোথায় নিরাপদে সঞ্চয় করবে টাকা দুঃসময়ের জন্য, তা বুঝতে পারে না। দেশের মানুষের সেভাবে সঞ্চয়ের আর কোনও জায়গাই নেই সোনা আর জমি ছাড়া। জমিতে জমি মাফিয়ার উৎপাতে সেদিকে দেশের মানুষ যেতে পারে না। সোনার উপরেই তাদের নির্ভরতা বেড়েছে যত দিন গেছে। গয়নায় রয়েছে বেশির ভাগ সোনা এই কথা শুনে মনে হতে পারে এ দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মহিলারা খুব বিত্তশালী। আদৌ সেরকম ঘটনা নয়। সোনার গয়না বিপদের দিনে নিরাপত্তা দেয়, অনেক বেসরকারি সংস্থা বিজ্ঞাপন দিয়ে ঋণ দেয় এই সোনার বিনিময়ে। এইভাবেই আর্থিক দুঃসময়ের মোকাবিলা করেছে দেশের সাধারণ আয়ের পরিবারগুলি। তাদের আয়ের পথ কবেই সঙ্কুচিত হয়েছে, কিন্তু এইভাবে সঞ্চয়েও হাত পড়ল সরকারের।
দেশের আর্থিক বিপর্যয় সরাসরি চলে এল ঘরে ঘরে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তেলের আমদানি বাবদ ১৩.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি। গ্যাসেও রয়েছে এই হাহাকার। তেল নিয়ে দেশের সরকারও শোনা গেল অনেক খোঁজখবর করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পিছন পিছন ভেনিজুয়েলা থেকে তেল এনেছে চলতি মাসে কম খরচে। ভারতে রাশিয়া থেকে তেল আনা যাবে না—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই হুঁশিয়ারির ফলেই ঘটেছে এই সঙ্কট। আমাদের দেশে রাশিয়া থেকে তেল আসছে বহুদিন। কিন্তু দেশের পররাষ্ট্র নীতি যেহেতু বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, ট্রাম্প নীতি বলে এই পররাষ্ট্র নীতিকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এই নীতি পরিবর্তন না হলে দেশে তেলের সঙ্কট দূর হওয়া কঠিন।
টাকার দাম পড়ছে হুহু করে। টাকার দাম পড়ে যাওয়ার এক বড় কারণ হলো বহু বিনিয়োগকারী এদেশ থেকে তার বিনিয়োগ অন্য দেশে সরিয়ে নিয়ে চলে গেছে গত কয়েক মাসে। স্টক বাজারে ওঠানামা এই দিকেই দিকনির্দেশ করছে। ভারতের মাটিতে বিনিয়োগ করে কোনও আর্থিক লাভ হবে না, বিদেশি এবং দেশি বহু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এইরকমই মনে করছে। ঘুরে ফিরে চলে আসছে সেই বৈদেশিক বাণিজ্যে লেনদেনের ঘাটতি ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া। এই আর্থিক সঙ্কটের সূত্র দেশের মানুষের বেশি সোনা কেনায় নেই। এই আর্থিক সঙ্কটের কারণ দেশের আর্থিক ভিত্তি এবং বিশ্বাসযোগ্যতায় বিনিয়োগকারীদের ভরসা নেই। দেশের আর্থিক দুঃসময়ের কথা সাধারণ মানুষকে যেমন ভয় পাওয়ায়, দেশি-বিদেশি কোনও বিনিয়োগকারীকেই ভরসা দেয় না। তাই সাধারণ মানুষ তার নিজের ঘরে তেল কমিয়ে রান্না আর সোনা কেনা বন্ধ করলেই কি দেশের সমস্যার সমাধান হবে? কমবে বেড়ে যাওয়া বৈদেশিক বাণিজ্যে লেনদেনের ঘাটতির পরিমাণ? বাড়বে বিনিয়োগে ভরসা? গত কয়েক মাস ধরে টাকা সরিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীরা অন্য দেশে। এই ভরসা জোগাবে কি করে প্রজারা? এই ভরসা তো জোগাতে হবে রাজা, মন্ত্রী, সওদাগর, কোটালকেই। এর কি আর অন্য উপায় আছে?
ওদিকে প্রজার হাতে রপ্তানির বৃদ্ধির চাবিকাঠিও নেই। বৈদেশিক বাণিজ্যিক লেনদেনে তো আমদানি- রপ্তানি দু’দিক দিয়েই পর্যুদস্ত আমাদের দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক যুদ্ধের পড়ে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে দেখা যায় দেশের রপ্তানি ১১.৮% কমে গেল। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় পেট্রোপণ্যে, যা আমদানি নির্ভর।
আমাদের দেশের রপ্তানি বৃদ্ধির জন্যেও প্রয়োজন দেশের পররাষ্ট্র নীতি এবং কূটনীতি। এই মুহূর্তে বিশ্বে ভারতের বন্ধু দেশ প্রায় নেই বললেই চলে। কিছুদিন আগেই আমাদের দেশের সাংসদেরা নানা দেশে গিয়েছিলেন সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে ভারত কিভাবে মোকাবিলা করছে তা বোঝানোর জন্য; কিন্তু কোনও নতুন মিত্র দেশই এগিয়ে আসলো না। বন্ধু দেশ কমে গেলে বিশ্ববাজারে ভারতের পণ্যেরও বাজার সঙ্কুচিত হয়ে আসে। এমনিতেই বিশ্ব রপ্তানির খুব নগণ্য অংশ ভারতের রপ্তানির অংশ। তাই রপ্তানি বাড়িয়ে বৈদেশিক বাণিজ্যে লেনদেনের ঘাটতি মেটানো খুবই কঠিন। এই পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষের ঘরে সঙ্কট প্রবেশ করেছে। প্রশ্ন হলো দেশের বিপুল সংখ্যক নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের খরচ বাঁচিয়ে কি দেশ বাঁচাতে পারবে? দেশের অতি ধনী এবং উচ্চবিত্ত তো স্টক এক্সচেঞ্জে টাকা রেখে অন্য দেশে বিনিয়োগ করে দেশের আর্থিক দুরবস্থা থেকে নিজেকে শুধু বাঁচাবে না, নিজের মুনাফাকেও বাড়িয়ে নেবে। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের সাশ্রয় তো ভবিষ্যতের নাগরিকের মানবিক পুঁজি গঠন বাধাপ্রাপ্ত হবে। আগামী প্রজন্মের শিক্ষা, স্বাস্থ্য গঠন ব্যাহত হবে, এতে আপাতত হয়ত রাজা, মন্ত্রী, সওদাগর, কোটাল আশ্বস্ত হবে, কিন্তু প্রজাদের আশ্বস্ত হওয়ার কোনও বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। বর্তমান যে তিমিরে, ভবিষ্যৎও সেই তিমিরেই।
Comments :0