Bashtala Lighthouse

ধ্বংসের মুখে উলুবেড়িয়ার ঐতিহাসিক বাঁশতলা লাইট হাউস

জেলা

মনিরুল হক:  উলুবেড়িয়া

উলুবেড়িয়ার বাঁশতলা এলাকায় হুগলি নদীর তীরে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন ইটের টাওয়ার। স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত ‘বাঁশতলা লাইট হাউস’ নামে। বহু বছর ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ সেই ঐতিহাসিক স্থাপনা ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। অথচ নথিপত্র বলছে, এটি নিছক একটি পুরনো ইটের স্তম্ভ নয়—হুগলি নদীর ঐতিহাসিক নৌ-নেভিগেশন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হুগলি নদী ছিল এবং এখনও রয়েছে অত্যন্ত জটিল নৌপথ। নদীর চর, বালুচর, বাঁক, জোয়ার-ভাটা এবং নাব্যতার পরিবর্তনের কারণে কলকাতার বন্দরের দিকে জাহাজ চলাচল সহজ ছিল না। পুরনো কলকাতা বন্দর-ব্যবস্থায় জাহাজের পথ নির্দেশ করার জন্য লাইট হাউস, লাইট ভেসেল, লাইটেড ও আনলাইটেড বয়া, ট্র্যাকমার্ক এবং নদীর তীরে নির্মিত টাওয়ার ব্যবহার করা হত।
নেভিগেশনাল তথ্যভান্ডার লাইট হাউজেস অফ ইন্ডিয়া : পশ্চিমবঙ্গে এই কাঠামোটি ‘উলুবেড়িয়া  রীচ  রেঞ্জ রিয়ার’ নামে তালিকাভুক্ত। সেখানে এটিকে প্রায় ২২ মিটার উচ্চতার, দুই-স্তরবিশিষ্ট একটি নেভিগেশনাল টাওয়ার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, এটি উলুবেড়িয়র দক্ষিণে হুগলি নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এবং দক্ষিণমুখী জাহাজের নৌপথ নির্দেশনার কাজে ব্যবহৃত একটি রেঞ্জ লাইট। 
হুগলি নদীপথে জাহাজ চলাচল কখনও সহজ ছিল না। নদীর বাঁক, চর, বালুচর, জোয়র-ভাটা এবং নাব্যতার পরিবর্তন নাবিকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করত। তাই কলকাতা বন্দরের নৌপথে বাতিঘর, বয়া, নদীর তীরের নেভিগেশনাল টাওয়ারসহ বিভিন্ন সহায়ক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। 
উলুবেড়িয়া  রীচ  রেঞ্জ রিয়ারের গুরুত্ব বোঝা যায় ১৯৪৩ সালের কলকাতা পোর্ট রুলস্‌ থেকেও। সেখানে উলুবেড়িয়া  রীচের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ফলতা পয়েন্ট পর্যন্ত নৌচ্যানেলের উল্লেখ রয়েছে এবং এই অংশকে নিয়ন্ত্রিত নেভিগেবেল  চ্যানেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। 
আজও উলুবেড়িয়া  রীচ  নৌ-পরিচালনার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা বন্দরের ২০২৪-২৫ সালের প্রশাসনিক রিপোর্টে এই রীচ-এ নিয়মিত হাউড্রোগ্যাফিক সাউন্ডিং এবং নৌচ্যানেলের গভীরতা পর্যবেক্ষণের তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ নদীপথটি এখনও ব্যবস্থাপনার আওতায় রয়েছে, অথচ তার সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিক নেভিগেশনাল কাঠামোটিই পড়ে রয়েছে অবহেলায়। 
বর্তমানে বাঁশতলার টাওয়রের গায়ে গজিয়ে উঠেছে গাছপালা। গাছের শিকড় ইটের গাঁথুনির ভিতরে ঢুকে পড়েছে। উপরের কংক্রিট কাঠামো ও লোহার রেলিংয়ে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘদিনের ক্ষয় ও মরচে। কোনো দৃশ্যমান সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা ঐতিহাসিক পরিচয়ফলকও নেই। এই অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কাঠামোটির অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।
প্রশ্ন উঠছে, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির দায়িত্ব কার? এটি কি এখনও নেভিগেশনাল সম্পদ হিসেবে বিবেচিত? এর স্টাকরাল সেফটি অডিট হয়েছে কি? এর ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করা হয়েছে কি? কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট নৌ-নেভিগেশন কর্তৃপক্ষ এবং হেরিটেজ সংস্থাগুলির কি কোনো সংরক্ষণ পরিকল্পনা রয়েছে?
বাঁশতলার এই টাওয়ারকে শুধু একটি পুরনো ‘লাইট হাউস’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হুগলি নদীপথ, কলকাতা বন্দর এবং বাংলার নদী-নির্ভর বাণিজ্যিক ইতিহাসের একটি দৃশ্যমান সাক্ষ্য। তাই অবিলম্বে সরকারি বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে এর জরিপ, স্টাকরাল সেফটি অডিট, গাছের শিকড় পরিস্কার করে, উপযুক্ত মেরামত করে সংরক্ষণ এবং ইতিহাস সম্বলিত ফলক স্থাপন করা দরকার।
যে কাঠামো একদিন নদীপথে চলা জাহাজকে পথ দেখিয়েছিল, আজ সেই কাঠামোটিই যেন সংরক্ষণের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ইতিহাস একবার ভেঙে গেলে তাকে আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। বাঁশতলার এই ঐতিহাসিক টাওয়রকে বাঁচানোর উদ্যোগ তাই এখনই নেওয় দরকার।

Comments :0

Login to leave a comment