গার্গী চ্যাটার্জি
মাত্র কয়েকদিন আগে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রশাসনিক সক্রিয়তার নামে একের পর এক উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। ফুটপাত দখলমুক্ত করার অজুহাতে হকার উচ্ছেদ, তথাকথিত “অবৈধ নির্মাণ” বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া, স্টেশন চত্বর থেকে ছোট দোকান সরিয়ে দেওয়া— এসব যেন নতুন শাসনের প্রথম রাজনৈতিক ভাষ্য হয়ে উঠেছে। যদিও ইতিমধ্যেই আদালত জানিয়ে দিয়েছে, আইনকে পাশ কাটিয়ে কোনও উচ্ছেদ অভিযান চলতে পারে না। অর্থাৎ, যেভাবে প্রশাসন এগচ্ছিল, তা নিজেই আইনের সীমা অতিক্রম করছিল।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ— বিশেষত হকাররা। রাস্তার হকার হোন বা রেলের হকার, জীবিকার প্রশ্নে আজ তাঁরা ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরে সম্প্রতি যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, তা শুধু কিছু স্টল ভাঙার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার পরিবারের অন্নসংস্থান, বেঁচে থাকার লড়াই, এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক নীতির নিষ্ঠুর বাস্তবতা।
শিয়ালদহের কোলে মার্কেটের মুড়ি ব্যবসায়ী বিনয় মণ্ডলের কথাই ধরা যাক। তাঁর নিয়মিত ক্রেতারা ছিলেন ঝালমুড়ি বিক্রেতারা, যারা প্রতিদিন স্টেশনে বসে বা ট্রেনে ঘুরে ঘুরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। উচ্ছেদের পরে তারা আর আসছেন না। ফলে তাঁর ব্যবসাও কার্যত বন্ধ। অর্থাৎ, একজন হকার আক্রান্ত হলে তার অভিঘাত পড়ে আরও বহু ছোট ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষের ওপর। জীবিকার এই শৃঙ্খলকে না বুঝে “পরিষ্কার শহর” বা “উন্নয়ন” এর নামে উচ্ছেদ অভিযান আসলে সমাজের এক বৃহৎ শ্রমজীবী অংশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো— যে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে একসময় প্রচার হয়েছিল যে তিনি স্টেশনে চা বিক্রি করতেন, সেই সরকারের আমলেই আজ রেল হকারদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সংগঠিত আক্রমণ চলছে। নির্বাচনী প্রচারে ঝালমুড়ি বিক্রেতার কাছ থেকে ঝালমুড়ি কিনে খাওয়ার ছবি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় দিনের পর দিন প্রচার করা হয়, কিন্তু, নির্বাচন উতরে যাওয়ার পরই— বাস্তবে সেই ঝালমুড়ি বিক্রেতাদেরই উচ্ছেদ করা হচ্ছে, দ্বিচারিতা আজ স্পষ্ট।
আসলে সমস্যার শিকড় আরও গভীরে। হকার উচ্ছেদের প্রশ্নটি নিছক প্রশাসনিক নয়; এটি অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্ন। গত এক দশকে ভারতীয় রেলকে ধাপে ধাপে বেসরকারিকরণের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। “অমৃত ভারত স্টেশন” প্রকল্পের নামে দেশের স্টেশনগুলিকে ঝকঝকে বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসকেলেটর, এয়ারকন্ডিশনড ওয়েটিং রুম, ব্র্যান্ডেড শপিং জোন, ফুড কোর্ট—সবকিছুরই ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উন্নয়ন কার জন্য?
যে নিত্যযাত্রী ভোরবেলা ট্রেনে ঝুলে অফিসে যান, যে শ্রমিক অল্প টাকায় প্রতিদিন যাতায়াত করেন, তাদের জীবনে এই তথাকথিত উন্নয়নের বাস্তব উপযোগিতা কতটা? বরং আশঙ্কা, এই উন্নয়নের খরচ শেষ পর্যন্ত চাপবে সাধারণ মানুষের ঘাড়েই। বাড়বে ভাড়া, কমবে সস্তা পরিষেবা, আর রেল ধীরে ধীরে গণপরিবহণ থেকে কর্পোরেট মুনাফাভিত্তিক পরিষেবায় পরিণত হবে।
এই কর্পোরেট মডেলের সবচেয়ে বড় “সমস্যা” হলেন হকাররা। কারণ তারা ঝকঝকে শপিং মলের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খায় না। একটি স্টেশনে যদি দামি কফিশপ, ব্র্যান্ডেড আউটলেট এবং কর্পোরেট দোকান বসানো হয়, তাহলে সেখানে গরিব মানুষের পাঁচ টাকার চা বা দশ টাকার ঝালমুড়ির জায়গা থাকবে না। ফলে উন্নয়নের প্রথম ধাক্কা এসে পড়ে হকারদের ওপর।
আজ রেল হকারদের বিরুদ্ধে যা চলছে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, আরপিএফ’র লাগাতার অভিযান, কেস, জরিমানা, তোলাবাজি, মালপত্র নষ্ট করা, স্টল ভেঙে দেওয়া, যাত্রীদের সামনে হকারদের “অবৈধ” বলে প্রচার করা-এসবই আসলে রেলকে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ।
২০১৫ সালে বিবেক দেবরায় কমিটির সুপারিশে ভারতীয় রেলের “লিবারালাইজেশন” বা বাজারমুখী পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছিল। সরাসরি “প্রাইভেটাইজেশন” শব্দটি ব্যবহার না করলেও রিপোর্টের মূল বক্তব্য ছিল—রেলের বিভিন্ন পরিষেবা, রক্ষণাবেক্ষণ, টিকিটিং, স্টেশন উন্নয়ন, নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই বেসরকারি পুঁজির প্রবেশাধিকার বাড়ানো। পরবর্তীকালে রেল বাজেটকে সাধারণ বাজেটের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া, স্টেশন পুনর্নির্মাণে কর্পোরেট সংস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত, ১০৯টি রুটে বেসরকারি ট্রেন চালানোর উদ্যোগ— সবই সেই নীতির ধারাবাহিকতা।
এখন প্রশ্ন হলো—এই উন্নয়ন কি সত্যিই সাধারণ মানুষের জন্য?
যখন অধিকাংশ স্টেশনে টিকিট কাউন্টার অপ্রতুল, সাবওয়ে অপরিষ্কার, এসকেলেটর বিকল, ট্রেন সময়মতো চলে না, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে মানুষ নিত্যদিন দুর্ভোগে পড়েন—তখন ঝাঁ চকচকে স্টেশন নির্মাণ কি প্রকৃত সমস্যার সমাধান? না কি মানুষের দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল?
আসলে এই উন্নয়নের লক্ষ্য সাধারণ যাত্রী নয়; লক্ষ্য কর্পোরেট মুনাফা। স্টেশনকে শপিং মলে পরিণত করা, বাণিজ্যিক হাবে রূপান্তর করা, জমি ও সম্পত্তিকে পুঁজির হাতে তুলে দেওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়ায় শ্রমজীবী মানুষের কোনও স্থান নেই। ফলে হকারদের সরিয়ে দেওয়া এই প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু রাষ্ট্র কি ভুলে যেতে পারে যে হকাররাও শ্রমজীবী মানুষ? যে মানুষ পেটের দায়ে পথে নামে, তার পক্ষে কি ১০–২০ লক্ষ টাকা দিয়ে দোকান কেনা সম্ভব? যখন তাকে কোনও স্থায়ী জায়গা দেওয়া হয় না, লাইসেন্স দেওয়া হয় না, তখন রাস্তাই তো তার একমাত্র ভরসা। তাহলে সেই মানুষ যদি রাস্তায় বসে, তার অপরাধ কোথায়?
এই কারণেই হকারদের প্রথম দাবি—পেশার স্বীকৃতি। ২০১৪ সালের Street Vendors (Protection of Livelihood and Regulation of Street Vending) Act দেশের স্ট্রিট ভেন্ডারদের জীবিকার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু রেল হকাররা এখনও সেই সুরক্ষার বাইরে। অথচ ভারতীয় রেলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বহু দশকের। ট্রেনযাত্রার সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে ঝালমুড়ি, চানাচুর, চা, বাদাম, বই বা খেলনার ফেরিওয়ালারা। তারা শুধু পণ্য বিক্রি করেন না; তারা রেলযাত্রার এক জীবন্ত সামাজিক বাস্তবতা।
তাই রেল হকারদের দাবি একেবারেই ন্যায্য— লাইসেন্স প্রদান করে পেশার স্বীকৃতি দিতে হবে, পুনর্বাসন ছাড়া কোনও উচ্ছেদ নয়, Street Vendors Act-এর আওতায় আনতে হবে, সামাজিক সুরক্ষা, ইএসআই ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, উন্নয়নের নামে জীবিকা ধ্বংস করা চলবে না।
এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে পশ্চিমবঙ্গ রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়ন, সিআইটিইউ। দীর্ঘদিন ধরেই এই সংগঠন রেল হকারদের অধিকার রক্ষার লড়াই চালিয়ে আসছে। রাজনৈতিক সন্ত্রাস, প্রশাসনিক অত্যাচার, জোর করে ইউনিয়ন দখল— সবকিছুর বিরুদ্ধে তারা রেল হকারদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন সময়ে তৃণমূলপন্থী ইউনিয়নের আক্রমণ, হুমকি, এমনকি সদস্যদের জোর করে দলবদলের চেষ্টার বিরুদ্ধেও তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
আজ যখন নতুনভাবে হকারদের ওপর আক্রমণ নেমে এসেছে, তখনও পশ্চিমবঙ্গ রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়ন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে— এই লড়াই শুধু রেল হকারদের নয়; এটি সমস্ত শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার লড়াই। কারণ আজ হকার আক্রান্ত, কাল আক্রান্ত হবেন সাধারণ যাত্রী, শ্রমিক, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ।
রেলের বেসরকারিকরণ মানে শুধু মালিকানা বদল নয়; এর অর্থ সামাজিক দায়বদ্ধতার অবসান। কর্পোরেট সংস্থা কখনোই সস্তায় গণপরিষেবা দিতে আসে না; তারা আসে মুনাফার জন্য। ফলে আগামী দিনে যদি রেল পুরোপুরি কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষই। বাড়বে টিকিটের দাম, কমবে ভরতুকি, সঙ্কুচিত হবে দরিদ্র মানুষের যাতায়াতের অধিকার।
তাই আজ প্রয়োজন বৃহত্তর ঐক্যের। রেল হকার, রাস্তার হকার, যাত্রী সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন— সবাইকে একসঙ্গে লড়াইয়ে নামতে হবে। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়ন মানুষের বিরুদ্ধে হতে পারে না। যে উন্নয়ন মানুষের জীবিকা কেড়ে নেয়, তাকে উন্নয়ন বলা যায় না; সেটি কর্পোরেট লুটের আরেক নাম।
আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই—হকার উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসন চাই।জীবিকার অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে।রেলকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া চলবে না।
পশ্চিমবঙ্গ রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়ন, সিআইটিইউ’র নেতৃত্বে এই সংগ্রাম অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ এই লড়াই কেবল কিছু স্টল রক্ষার লড়াই নয়— এটি শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও বেঁচে থাকার লড়াই। আসুন, সকলে মিলে এই লড়াইয়ে পথে নামি ।
Comments :0