অপারেশন সিঁদুরের বর্ষপূর্তিতে পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে মোদী সরকার জোরালো হুঙ্কার ছাড়লেও তার পরেই পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার দরজা বন্ধ না করার পক্ষে সওয়াল করেছেন আরএসএস-র দ্বিতীয় শীর্ষকর্তা দত্তাত্রেয় হোসাবলে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে হোসাবলের এই মতকে পুরোপুরি সমর্থন করেছেন প্রাক্তন সেনা প্রধান নারাভানে। দু’দেশের মধ্যে চরম বৈরীতার সম্পর্ক বজায় রেখে সীমান্তে সর্বক্ষণ যু্দ্ধোন্মাদনা জারি রাখার উগ্র জাতীয়তাবাদী অন্ধ দেশপ্রেমের আবহে আলোচনার দরজা খোলার এই প্রস্তাব নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ফারুক আবদুল্লাহ সহ জম্মু-কাশ্মীরের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। বস্তুত তারা অনেকদিন ধরেই দু’দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু করার পক্ষে মত প্রকাশ করে আসছেন। বামপন্থীরা সহ দেশের অনেক বিরোধী দলও মনে করে যুদ্ধ সমাধানের পথ নয়। যুদ্ধ বিরোধ ও শত্রুতা বাড়ায়, সমাধান করতে পারে না। বামপন্থীরা বরাবরই চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা করার পক্ষপাতী। অতীতে এই মত প্রকাশের জন্য দেশদ্রোহী বলে জেলে বন্দি করা হয়েছিল। এখন হিন্দুত্ববাদী উগ্রদেশপ্রেমীরা সোশাল মিডিয়ায় এই মতাবলম্বীদের দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করে কুৎসিতভাবে আক্রমণ করছে। এখন বিজেপি-র মতাদর্শগত অভিভাবক আরএসএস-র পক্ষ থেকেই যখন আলোচনার পক্ষে সওয়াল করা হচ্ছে তখন মোদী-শাহ-রাজনাথরা মুখে কুলুপ এঁটেছেন।
অবশ্য দত্তাত্রেয় আচমকা এমন সওয়াল করেননি। নারভানেও চোখ বুঝে সমর্থন করেননি। তলে তলে আলোচনার জমি তৈরির প্রয়াস চলছে কয়েক মাস ধরে। দু’দেশের অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও সেনা কর্তারা এই আলোচনা চালিয়ে বরফ গলানোর চেষ্টা করছেন। দেশের বাইরে তৃতীয় কোনও দেশে দু’পক্ষের মধ্যে অন্তত তিনটি বৈঠক হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার পেছনে আরএসএস-র ভূমিকা নেই বলা যাবে না। তেমনি হোসাবেলের সাম্প্রতিক মার্কিন সফরের সঙ্গে এর সম্পর্ক উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। বস্তুত অপারেশন হিঁদুর বন্ধ করার সময় থেকেই ট্রাম্প দু’দেশকে আলোচনায় বসার জন্য চাপ দিচ্ছেন। মোদীরা তাতে সাড়া না দিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুবিধার জন্য নিরন্তর যুদ্ধ জিগির এবং পাকবিরোধী রণহুঙ্কার জারি রেখেছিলেন। বার্তা দেওয়া হয়েছে ভারত ভোলে না, ক্ষমাও করে না।
কিন্তু পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে তাতে হুঙ্কার ছেড়ে আলোচনার পথে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে পহেলগামের নৃশংসতার পর অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তানে যাবতীয় জঙ্গী ঘাঁটি ধ্বংস করার দাবি যতই মোদীরা করুন না কেন দেশের বাইরে সেই দাবির স্বীকৃতি মেলেনি। দেশে দেশে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে এবং সংসদীয় দল পাঠিয়ে চিড়ে ভেজানো যায়? কোনও দেশই ভারতের পক্ষে এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেয়নি। উলটে ভারতের মৃদু আপত্তিকে উপেক্ষা করে দেশে বিদেশে নানা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প অন্তত ৭০বার দাবি করেছেন পাক-ভারত যুদ্ধ বন্ধ করেছেন তিনি। এই বিরোধে আমেরিকা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বারে বারে পাকিস্তানের প্রশংসা করেছে, পাক মতকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই সময় পাকিস্তানের গুরুত্ব ও সম্মান বেড়েছে। সর্বশেষ পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত নিরসনে শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের উপরই আস্থা রেখেছে আমেরিকা। অর্থাৎ ভারত দ্রুত মর্যাদা হারিয়েছে। এরপরও যদি মোদীরা গো ধরে বসে থাকে তাহলে আরও অপদস্থ ও অসম্মানিত হবার আশঙ্কা থাকছে। এই গাড্ডা থেকে বেরতে হলে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো করার রাস্তায় পা বাড়াতে হবে। তাছাড়া অর্থনীতির সঙ্কট যেভাবে অন্ধকার ডেকে আনছে তাতে যুদ্ধোন্মাদের রাজনৈতিক বিলাসিতা আদতে বিপর্যয় ডেকে আনবে। আরএসএস তার আঁচ পেয়ে লাগাম শক্ত করতে চাইছে।
editorial
বিলম্বিত বোধোদয়
×
Comments :0