প্রতীম দে
রাজধানী দিল্লির অদূরে অবস্থিত নয়ডা ভারতের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। আইটি পার্ক, বহুজাতিক কোম্পানির সদর দপ্তর থেকে শুরু করে অসংখ্য গার্মেন্টস ও ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটের কারণে নয়ডা এখন কর্মসংস্থানের এক বড় কেন্দ্র। কিন্তু এই চকচকে বহুতল আর বিশাল কলকারখানার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর বঞ্চনার ইতিহাস। সাম্প্রতিক সময়ে নয়ডায় হওয়া ধারাবাহিক শ্রমিক বিক্ষোভ শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং এটি সমগ্র ভারতের শ্রমজীবী মানুষের বর্তমান সংকটের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ।
নয়ডার বিভিন্ন শিল্প তালুকে শ্রমিকদের অসন্তোষ নতুন কিছু নয়, তবে সম্প্রতি এই ক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো — বকেয়া বেতন না দেওয়া, কোন পূর্ব ঘোষণা বা আইনি ক্ষতিপূরণ ছাড়াই আকস্মিক ছাঁটাই, অমানবিক দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি প্রদান না করা। বিশেষ করে ঠিকা শ্রমিক বা চুক্তি ভিত্তিক কর্মীদের পরিস্থিতি সবচেয়ে শোচনীয়।
বহু কারখানায় শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার, যেমন নিরাপদ কাজের পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। যখন বেঁচে থাকার ন্যূনতম দাবিগুলো বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে উপেক্ষিত হয়, তখন শ্রমিকরা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নামেন। অনেক সময় পুলিশি হস্তক্ষেপ বা মালিকপক্ষের চাপের মুখে এই বিক্ষোভগুলো সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়ে গেলেও, শোষণের মূল কারণগুলো অমীমাংসিতই থেকে যায়।
নয়ডার এই চিত্রটি সমগ্র ভারতের শ্রমজীবী মানুষের সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। ভারতের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯০ শতাংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের না আছে চাকরির স্থায়ী নিরাপত্তা, না আছে স্বাস্থ্যবীমা, প্রভিডেন্ট ফান্ড বা পেনশনের মতো ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা। করোনা অতিমারির পর থেকে এই ক্ষেত্রে শ্রমিকদের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। সঞ্চয় ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেককেই বাধ্য হয়ে অত্যন্ত কম মজুরিতে কাজ করতে হচ্ছে।
এর পাশাপাশি বর্তমানে যুক্ত হয়েছে 'গিগ ইকোনমি'র রমরমা। ডেলিভারি বয়, রাইড-শেয়ারিং অ্যাপের চালক বা অস্থায়ী কর্মী হিসেবে কর্মরত লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী কার্যত কর্মী হিসেবে আইনি স্বীকৃতিই পান না। কর্পোরেট ভাষায় তাঁদের বলা হয় 'পার্টনার', যার ফলে শ্রম আইনের আওতাধীন সুবিধাগুলো তাদের নাগালের বাইরে থেকে যায়।
দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লেও, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ছে না। ফলে তাদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে এবং জীবনযাত্রার মান ক্রমশ নিম্নমুখী হচ্ছে। পাশাপাশি, সরকারের আনা নতুন শ্রমকোড নিয়েও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। তাদের মতে, এই নতুন বিধি ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ বা সহজে ব্যবসা করার নীতিকে উৎসাহিত করতে গিয়ে নিয়োগকারীদের হাতে অনেক বেশি ক্ষমতা তুলে দিয়েছে, যার ফলে শ্রমিকদের অধিকার আরও খর্ব হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সিআইটিইউ প্রথম থেকেই এই আইনের বিরোধিতা করে এসেছে। দেশ জুড়ে তারা আন্দোলনের পথে নেমেছে। শ্রমকোড যেমন কাজের কোন গ্যারেন্টি দেয় না, তেমন ভাবে শ্রমিকদের যেই অধিকার সেই গুলো তারা কেড়ে নিচ্ছে। ট্রেড ইউনিয়ন করার কোন অধিকার নেই। অর্থাৎ পুঁজিপতি বা মালিক শ্রেণির হাতের পুতুল হয়ে থাকতে হবে তাদের।
কিন্তু হে মার্কেটের শ্রমিক আন্দোলন গোটা বিশ্বের শ্রমিক আন্দোলনকে পথ দেখিয়ে ছিল। আট ঘন্টার কাজের জন্য সেই লড়াই আজও পৃথিবীর শ্রমিক আন্দোলনের কাছে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৮৮৬ সালের সেই আন্দোলনের ফলে দিনে আট ঘন্টা কাজের আইন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময় আদানি, আম্বানিদের কথায় সেই আইনকে তুলে দিতে চাইছে বিজেপি। শ্রম কোডে উল্লেখ নেই আট ঘন্টা কাজের কথা। মালিক পক্ষ তার ইচ্ছা মতো একজন শ্রমিককে কাজ করাতে পারবেন। আজ ভারতে লড়াই শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার।
নয়ডার শ্রমিক বিক্ষোভ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কেবল জিডিপি বৃদ্ধি বা বড় বড় কলকারখানা স্থাপনই প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। শিল্পের বিকাশ তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার পেছনের কারিগররা, যাদের ঘামে এই অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে একটি সম্মানজনক ও সুরক্ষিত জীবন পাবেন।
Comments :0