মোহনবাগান— ১ (কামিন্স)
ইস্টবেঙ্গল— ১ (এডমুন্ড)
— লিগ নির্ধারণী ডার্বি। যুবভারতীতে কানায় কানায় পূর্ণ। ৬২ হাজার উপস্থিত দর্শকের গর্জন। দুই প্রধানের ফুটবলারদের মরিয়া মনোভাব। তাতেই ম্যাচটা পরিণত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। একেবারে হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। সাম্প্রতিক সময়ে এতটা টানটান-প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বড় ম্যাচ হয়নি সল্টলেক স্টেডিয়ামে। ১৭ মে রুদ্ধশ্বাস ডার্বি সাক্ষী থাকলেন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন।
নাটকের পর নাটক। পরতে পরতে ম্যাচের পট পরিবর্তন। বিশেষ করে শেষ পনেরো মিনিট। পরিবর্ত হিসাবে নামা এডমুন্ড লালরিনডিকার গোলে ইস্টবেঙ্গলের এগিয়ে যাওয়া। চার মিনিটের মধ্যে জেসন কামিন্সের ফ্লিক হেডে মোহনবাগানের ম্যাচে ফিরে আসা। বিপিন সিংয়ের ফের সহজ সুযোগ নষ্ট। ম্যাচের সবচেয়ে সেরা মুহূর্তটি এল ৯৭ মিনিটে। অর্থাৎ যখন রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর প্রহর গুনছেন।
ঠিক তখনই গোলমুখ শট জেমি ম্যাকলারেনের। প্রভসুখন গিল বাঁ-পা বাড়িয়ে অবিশ্বাস্য সেভে রুখে দিলেন জেমির শটটি। ২০২২ বিশ্বকাপে ফাইনালে এমিনিয়ালো মার্টিনেজের সেভ মনে করিয়ে দিলেন গিল। জেমির গোলমুখী প্রয়াস আটকে দিয়ে শুধু হার বাঁচালেনই না! ইস্টবেঙ্গলের খেতাবের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখলেন। কোচ অস্কার ব্রুজোও জানালেন, ওই সেভ গিলের আত্মবিশ্বাসের ফসল। না হলে চোখের জলে-হৃদয়ভঙ্গের যন্ত্রণায় মাঠ ছাড়তে হতো লাল হলুদ সমর্থকদের। সম্ভাব্য খেতাব জয়ের আনন্দে মেতে উঠতেন মোহন জনতা। বাড়ির ফেরার সময় লাল হলুদ সমর্থকদের মুখে একটাই নাম প্রভসুখন...প্রভসুখন...।
শুধু গিল নয়! রক্ষণ জুটির জন্য বাগানকে রুখে দিতে পারল ইস্টবেঙ্গল। প্রতিযোগিতায় সেরা ম্যাচটা খেলল লোবেরার দল। পরিসংখ্যান বলছে, লাল হলুদের থেকে সব বিভাগে এগিয়ে বাগান। বল পজেশনেও। গোল লক্ষ্য শট ছ’টি। ১৩ টি কর্নার। অবশেষে সেটপিস থেকে গোল। আনোয়ার-সিবিল্লের জন্যই বাগানের গোল পেতে সময় লাগল ৮৯ মিনিট। ডিফেন্সে কেভিন সিবিল্লে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিঁখুত সব ফাইনাল ট্যাকেলে বারবার আটকে দিলেন সাহাল আব্দুল সামাদ, ম্যাকলারেনদের। অজি স্ট্রাইকারকে সারা ম্যাচে বোতলবন্দি করে রাখলেন। তেমনই পরিবর্ত হিসাবে নামা জেসন কামিন্স, দিমিত্রি পেত্রাটোসদের নড়তে দেননি। সিবিল্লের পাশে দুরন্ত আনোয়ার আলি। শুরুর দিকে একটা ভুল। তারপর থেকে রক্ষণে নিঁখুত ফুটবল খেললেন আনোয়ার। দুর্ধর্ষ খেলে জিততে না পারায় হতাশ পালতোলা নৌকার সওয়ারিরা। মোহনবাগান ভালো খেললেও,ক্লিয়ার চান্স বেশি পেয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। সুযোগ নষ্ট না করলে হ্যাটট্রিক করে ফেলতে পারতেন বিপিন সিং! তিন-তিনবার দুর্ধর্ষ গোলকিপিংয়ে দলের পতন রোধ করলেন বিশাল কাইথ। শুরুতেই অ্যান্টন সোবার্গের বাঁ-পায়ের শট বারে লেগে প্রতিহত হয়।
ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে আইএসএল ডার্বিতে অপরাজিতই রইল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। ১-১ অমীমাংসিত ডার্বি। গোটা ম্যাচে দু’দল অসংখ্য সুযোগ নষ্ট না করলে হয়তো ডার্বির ফলাফল হয়ে যেত। রবিবার হলো না লিগ নির্ধারণ। শেষ ম্যাচেই হবে ফয়সালা। পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষস্থানেই রইল লাল হলুদ। ১২ ম্যাচে ২৩ পয়েন্ট। সমসংখ্যক ম্যাচে সমান পয়েন্ট নিয়ে গোলপার্থক্যে পিছিয়ে দ্বিতীয় স্থানে সবুজ মেরুন। লিগ জিততে হলে দু’দলের সামনে সমীকরণ, আগামী ২১ মে ইন্টার কাশীর বিরুদ্ধে জিততেই হবে ইস্টবেঙ্গলকে। তেমনই স্পোর্টিং দিল্লির বিরুদ্ধে তিন পয়েন্ট পেতে হবে মোহনবাগানকে। ইস্টবেঙ্গল জিতলে, মোহনবাগানকে চ্যাম্পিয়ন হতে কমপক্ষে সাত গোলের ব্যবধানে জিততে হবে। লাল কার্ড দেখায় শেষ ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল পাবে না ডার্বির গোলদাতা এডমুন্ডকে। বড় ম্যাচে তাঁর জীবনে ট্র্যাজেডি! ২০১৯ সালের ডার্বিতে পরিবর্ত হিসাবে নেমে মার্কোসকে দিয়ে গোল করানোর পর, গুরুতর চোট পেয়ে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে। এদিন গোল করার ১৩ মিনিট পর জোড়া হলুদ কার্ড দেখলেন তিনি। তেমনই হলুদ কার্ড দেখায়, দিল্লি ম্যাচে নেই বাগান ডিফেন্ডার আলবার্তো রড্রিগেজ।
এদিন, কলকাতার সমস্ত রাস্তা এসে মিশেছিল যুবভারতী। অসংখ্য ম্যাটাডোর ভর্তি সমর্থকরা একে অপরকে টিপ্পনি ছুঁড়তে ছুঁড়তে মাঠে প্রবেশ করেন। বড় ম্যাচে প্রথম একাদশে জেমি ম্যাকলারেনকে ফেরালেন সের্জিও লোবেরা। তাঁর একটু পিছন থেকে নাম্বার টেনের ভূমিকায় সাহাল আব্দুল সামাদ। রবসনকে বসিয়ে মনবীরকে খেলিয়ে, লিস্টনকে তাঁর বামপ্রান্ত ফিরিয়ে দিলেন। মনবীর সিং’কে ডানপ্রান্ত। রক্ষণ জমাট করতে টম-আলবার্তো জুটির উপর ভরসা বাগান কোচের। উল্টোদিকে, চার ব্যাকে ফিরলেন অস্কার। রক্ষণে আনোয়ার-সিবিল্লে জুটির সঙ্গে জয়-রাকিপ। মাঝমাঠে জিকসন ও রশিদ। দুই প্রান্তে বিষ্ণু ও বিপিন। শনিবারের অনুশীলনেই ইঙ্গিত ছিল ইউসেফের পরিবর্তে শুরু করবেন অ্যান্টন। গোল করতে ব্যর্থ হলেও, তাঁর কার্যকারিতা ও কৌশলী ফুটবল প্রশংসার দাবিদার। এক ঘণ্টা মাঠে ছিলেন, বাগান রক্ষণকে চাপে রেখেছেন ড্যানিশ ডিনামাইট।
ডার্বির প্রথমার্ধ টানটান। সুযোগ তৈরি-সুযোগ নষ্টের খেলা। দু’দলই সুযোগ নষ্টের প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। সহজ সুযোগ হাতছাড়া করে ম্যাচে এগিয়ে যেতে ব্যর্থ ইস্টবেঙ্গল। শুরুতে মোহনবাগান ঝড়। লিস্টন-মনবীর জুটিতে বাগানের দু’প্রান্ত সচল হলো। মাঝমাঠে আপুইয়া ফেরায়, খেলায় ফিরল ছন্দ। ইস্টবেঙ্গলের মাঝমাঠে সাউল ক্রেসপো না থাকায় প্রচুর ফাঁকা জমি পেয়ে মোহনবাগানের ফুটবলাররা। ফলত, তাদের আক্রমণ শানাতে সুবিধাই হচ্ছিল। আঠেরোর মিনিটে স্পেলে ইস্টবেঙ্গল রক্ষণের নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছিল সবুজ মেরুন। আট মিনিটে আনোয়ার ভুলে বল পেয়ে ডানদিকে গতি বাড়িয়ে মনবীর ক্রস রাখেন বক্সে। বারের উপর দিয়ে শট মেরে সুযোগ হাতছাড়া সাহাল আব্দুল সামাদের।
১৩ মিনিটে আলবার্তোর ভুলে বল পান অ্যান্টন। তাঁর বাঁ-পায়ের শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ১৯ মিনিটে, লিস্টন ড্রিবলে ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্ডার পরাস্ত করে পাস বাড়ান, কেউ পায়ে বল ছোঁয়াতে পারলেন না। বাগানের ঝড় আটকে গোলের প্রথম সুযোগ তৈরি করে ইস্টবেঙ্গলই। ম্যাচের ২২ মিনিট। মাঝমাঠ থেকে জিকসনের থ্রু। বল পেয়ে বিপিন সিং। ফাঁকায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অ্যান্টন সোবার্গ। বিপিন নিজে শট নিয়ে অ্যান্টনকে পাস দিলেই এগিয়ে যেতে পারত ইস্টবেঙ্গল। বিশাল কোণ ছোট করে এগিয়ে এসে দলের পতন রোধ করেন। ৩৬ মিনিটে ফের সুযোগ পায় লাল হলুদ। মিগুয়েলের ঠিকানা লেখা থ্রু। গোলকিপারকে একা পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হন অ্যান্টন। বিশাল কোণ ছোট করে এগিয়ে এসে ফের দলের পতন রোধ করেন। এরপর রশিদের পাস থেকে বিপিনের মিস। একাধিক মিসে, প্রথমার্ধ গোলশূন্য অবস্থায় শেষ হয়।
বিরতির পর, আক্রমণ-পালটা আক্রমণে খেলা শুরু হয়। আবারও বড়লোকের বাউন্ডুলে ছেলের মতো সুযোগ নষ্ট করলেন বিপিন। ৫৫ মিনিটে মনবীরের সুযোগ হাতছাড়া। ম্যাচের এক ঘণ্টা কাটার পর, দু’পরিবর্তন করেন অস্কার। বিষ্ণুর পরিবর্তে এলেন এডমুন্ড। অ্যান্টনের বদলি হিসাবে ইউসেফ। পাঁচ মিনিট বাদে চাল দেন লোবেরা। সাহালকে তুলে নামান পেত্রাটোসকে। এরপর আরও দু’টি পরিবর্তন করেন বাগানের স্প্যানিশ কোচ। জোড়া ডিফেন্ডার তুলে নেওয়ায় বাগানের রক্ষণে চাপ পড়ে। মিগুয়েল-এডমুন্ডরা মিলে বিপক্ষ রক্ষণের নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছিলেন। অতঃপর তাঁদের যুগলবন্দি এগিয়ে দিল ইস্টবেঙ্গলকে। ৮৫ মিনিটে মিগুয়েলের মাপা পাস থেকে বক্সে মধ্যে থেকে ডান পায়ের নিঁখুত ফিনিশ এডমুন্ডের। গ্যালারিতে গর্জন মাত্রা ছাড়ালো। এগিয়ে যাওয়াই কিছুটা আত্মতুষ্ট করে ফেলে ইস্টবেঙ্গলকে। মুহূর্তের শিথিলতা। দিমিত্রির কর্নার থেকে আনমাকর্ড অবস্থায় হেড করে দলকে ম্যাচে ফেরান কামিন্স। সংযুক্তি সময় গিলের বাঁ-পায়ে আটকে গেল মোহনবাগানের জয়ের স্বপ্ন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ইস্টবেঙ্গলের গ্যালারিতে। খেলার শেষে অ্যাম্বুলেন্সে মাঠ ছাড়েন বিপিন। যদিও গুরুতর কিছু নয়।
ইস্টবেঙ্গল— গিল, জয়, আনোয়ার, কেভিন, রাকিপ, জিকসন, রশিদ, বিষ্ণু (এডমুন্ড), বিপিন, অ্যান্টন (ইউসেফ)
মোহনবাগান— বিশাল, শুভাশিস, আলবার্তো (কামিন্স), টম (রবিনহো), অভিষেক, অনিরুদ্ধ, আপুইয়া (টাংরি), লিস্টন, সাহাল (পেত্রাটোস), মনবীর (মেহতাব), ম্যাকলারেন
Comments :0