Delhi Student Protest

পুলিশি নিরপেক্ষতা হারিয়ে যাচ্ছে, ছাত্র আন্দোলনে বলপ্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়ার

জাতীয়

ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশ আধিকারিকদের সরাসরি হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া। শুক্রবার অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস আধিকারিক যশোবর্ধন আজাদের লেখা ‘Policing the Republic’ বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, পুলিশের কাছ থেকে যে নিরপেক্ষতা ও সংযম প্রত্যাশিত, তা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, ‘তরুণ আইপিএস আধিকারিকদের নিজের হাতে বিক্ষোভকারী ও প্রতিবাদকারীদের উপর হামলা করতে দেখা অত্যন্ত দুঃখজনক।’ তার কথায়, ‘পুলিশ আধিকারিকদের কাছ থেকে যে নিরপেক্ষতা প্রত্যাশিত, তা যেন কোনওভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।’
ছাত্র আন্দোলনে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্য, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন না করেও কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। সাধারণ মানুষের কাছে রাস্তায় বাঁশি ও লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুলিশকর্মীই রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতীক। তাই কোনও নাগরিক অন্যায়ের শিকার হলে পুলিশের কাছেই সাহায্যের জন্য যান। ফলে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ইতিমধ্যেই সমালোচনা শুরু হয়েছে। ছাত্রদের বিক্ষোভ ও সংসদ অভিযানকে কেন্দ্র করে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে শীর্ষ আদালত একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি আর সুবাষ রেড্ডির নেতৃত্বাধীন ওই কমিটি বিক্ষোভকারীদের উপর লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, পেলেট গান ও ইলেকট্রনিক ব্যাটন ব্যবহারের অভিযোগ খতিয়ে দেখবে। মহিলা বিক্ষোভকারীদের নিশানা করে হয়রানি বা শ্লীলতাহানির অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে। পাশাপাশি সংঘর্ষের সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ ও বিভিন্ন ভিডিও রেকর্ডিংও পরীক্ষা করা হবে।
পুলিশ হেপাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনাতেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিচারপতি ভূঁইয়া। তার কথায়, আইনের শাসন দ্বারা পরিচালিত কোনও সভ্য সমাজে হেপাজতে মৃত্যু অন্যতম গুরুতর অপরাধ। তদন্ত বা জিজ্ঞাসাবাদের সময় কিংবা অন্য কোনও পরিস্থিতিতে নির্যাতন, নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ কোনওভাবেই বরদাস্ত করা যায় না।
সরকারি আধিকারিকরাই যদি আইন ভঙ্গ করেন, তার পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলেও সতর্ক করেন বিচারপতি। তিনি বলেন, সরকারি কর্মীরা নিজেরাই যদি আইনভঙ্গকারী হয়ে ওঠেন, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের অবজ্ঞা বাড়বে এবং সমাজে আইনভঙ্গের প্রবণতাও উৎসাহিত হবে। কোনও সভ্য রাষ্ট্রই এমন পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে না।
এই প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কোনও পুলিশকর্মী কোনও নাগরিককে গ্রেপ্তার করলেই কি সেই নাগরিক তার মৌলিক অধিকার হারিয়ে ফেলেন?’
পুলিশি ‘এনকাউন্টার’ বা ভুয়ো সংঘর্ষের ঘটনাতেও কঠোর অবস্থানের কথা জানান বিচারপতি ভূঁইয়া। ২০১১ সালের একটি সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ভুয়ো এনকাউন্টার আইনের শাসনের মূল চেতনাকেই নষ্ট করে দেয়। কোনও কর্মরত পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে বিচারপর্বে ভুয়ো এনকাউন্টারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘এনকাউন্টার দর্শন একটি অপরাধমূলক দর্শন। এটি কখনও পুলিশি ব্যবস্থার অংশ হতে পারে না।’
পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং সাধারণ মানুষের আস্থা রক্ষাকেই যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত, বিচারপতি ভূঁইয়ার বক্তব্যে সেই বার্তাই উঠে এসেছে।

Comments :0

Login to leave a comment