ভ্রমণ — বিদেশের / তিন শহরের ইতিকথা
সুমন চ্যাটার্জী
মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ৬ জুন ২০২৬
বসফরাসের এই দুই পাড়ের শহরটি স্নায়ুযুদ্ধের সময় কোন আনুষ্ঠানিক বিভাজনের অংশ না হলেও বাস্তবে তা এক অদৃশ্য সীমারেখার উপর দাঁড়িয়ে ছিল । একদিকে ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে পশ্চিমের সামরিক কাঠামোর অংশ, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় দোরগোড়ায় । এই দ্বৈত অবস্থান ইস্তাম্বুলকে কেবল ভৌগোলিক নয়, এক রাজনৈতিক সংযোগস্থলেও পরিণত করেছিল । এই সংযোগস্থল দৃশ্যমান ছিল না, কিন্তু তার প্রভাব শহরের ভেতর প্রবেশ করেছিল । পুরনো কিছু পাড়া, বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের আবাসন বা বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের আশেপাশে সেই সময়কার এক ধরনের কার্যকরী স্থাপত্য চোখে পড়ে । অলংকরণ বিহীন, সরাসরি ব্যবহারযোগ্য, প্রায় আইডেন্টিকাল ও রিপিটেটিভ । এগুলো কোন ঘোষিত মতাদর্শের নিদর্শন নয় কিন্তু তাদের গঠনেই বোঝা যায় শহরটি একসময় অন্য এক রাজনৈতিক অভিঘাতের স্পর্শ পেয়েছিল । একইভাবে কিছু ক্যাফে, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর কিংবা কিছু নির্দিষ্ট বৌদ্ধিক পরিসর যেখানে একসময় তুরস্কের বামপন্থী রাজনীতি, শ্রমিক সংগঠন বা ছাত্র আন্দোলনের আলোচনা চলতো, আজও আছে । কিন্তু তাদের ভাষা বদলে গেছে । আলোচনা হয়, কিন্তু উচ্চারণ বদলে গেছে । মতামত আছে কিন্তু তার প্রকাশ আর আগের মতন স্বাধীন বা সাবলীল নয় ।
এই পরিবর্তন কোন আকস্মিক রূপান্তর নয় বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলা এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া । ১৯৬০ থেকে ১৯৮০, এই সময়কালের মধ্যে তুরস্কের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং বামপন্থী সংগঠনগুলোর ওপর দমনপীড়ন শহরের ভেতরে এক ধরনের সতর্কতার সংস্কৃতি তৈরি করেছিল । সেই সংস্কৃতি পরবর্তীকালে রাষ্ট্রের পরিবর্তনের সাথেও টিকে থাকে, শুধু তার ভাষা পাল্টায় । ফলে, ইস্তাম্বুলে জনজীবনের পরিসর কখনোই সম্পূর্ণ ভাবে নিয়ন্ত্রণমুক্ত বা স্বাধীন হয়নি । এখানে স্বাধীনতা আছে কিন্তু তা সীমাবদ্ধ । এখানে নিয়ন্ত্রণ আছে, কিন্তু তা-ও সর্বদা ঘোষিত নয় । এই দ্বৈততার ভেতরেই শহরটি তার যাপনে আজ অভ্যস্ত।
ভাবতে অবাক লাগে, অর্থোডক্স খ্রিস্টান শাখার রোম বা ভ্যাটিকান এই ইস্তাম্বুল অথচ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই শহরের অধিকাংশ গির্জা হয় বন্ধ না হলে মসজিদে রূপান্তরিত । কোন এক সময়ে সেই শহরে ৩২% খ্রিস্টান জনসংখ্যা ছিল, আজকে তা দেড় থেকে দুই শতাংশে নেমে এসেছে । বালাত বা ফাতিহ অঞ্চলের পুরনো গলিগুলি দিয়ে হাঁটলে এই অনুভূতি আরও স্পষ্ট হয় । রঙচঙে বাড়ি, সরু রাস্তা, যুতসই ভাবে বানানো সিঁড়ি, সুসজ্জিত ক্যাফে, অসাধারণ সংগ্রহের পসরা নিয়ে অ্যান্টিকের দোকান, প্রচুর সময়ের বহমানতার সাক্ষী বাড়িঘর, সবকিছুই জীবন্ত । কিন্তু জীবনের সেই প্রবাহমানতার ভেতরেও একটি অনুপস্থিতির রেশ থেকে যায়, যা স্পষ্ট করে বোঝা যায় না কিন্তু প্রবলভাবে অনুভব করা যায় । এ যেন শহরটি তার অতীতকে পুরোপুরি ত্যাগ করেনি, আবার তাকে সম্পূর্ণ ভাবে গ্রহণও করেনি ।
বসফরাসের ধারে সন্ধ্যা নামলে এই চরিত্র আরও স্পষ্ট হয় । আলো কমে আসে, ফেরির শব্দ দূরে সরে যায় আর শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে মৃদু হয়ে আসে । এই সময়টাতেই বোঝা যায় ইস্তাম্বুল আসলে কোন স্থবির বা স্থিতিশীল শহর নয়, একটি বহমানতার আরেক নাম । এখানে অতীত শেষ হয়ে যায় না, বর্তমান স্থির থাকে না আর ভবিষ্যৎ কখনও সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয় না । গালাতা টাওয়ার তখনও দাঁড়িয়ে থাকে, একই ভাবে, নিরাসক্ত, নির্বিকার । সে কোন পক্ষ নেয় না, কোন ব্যাখ্যা দেয় না । শুধু দেখে । কিভাবে একটি শহর নিজের ইতিহাসকে বয়ে নিয়ে চলে, কখনও সামনে রেখে, কখনও আড়ালে সরিয়ে, কখনও এমন ভাবে বদলে ফেলে যে তা চিনে নেওয়াই কঠিন হয়ে যায় ।
ইস্তাম্বুল সেই শহর, যেখানে ইতিহাস মুছে যায় না, বরং বারবার নতুন করে সাজানো হয় বা এডিট করা হয় । ইস্তাম্বুলের এই চরিত্র, না সম্পূর্ণ মুছে ফেলা না সম্পূর্ণ সংরক্ষণ, বরং এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত স্মৃতি । প্রাগে ইতিহাসের মালিন্য চোখে পড়ে, ভিয়েনায় তা শৃঙ্খলার আড়ালে লুকিয়ে থাকে । ইস্তাম্বুলে মালিন্য আছে কিন্তু তা নিয়ন্ত্রিত । প্রকাশ এবং নীরবতার মধ্যে এক অদ্ভুত ভারসাম্য রক্ষা করা, একইভাবে দৈনন্দিন যাপন এবং নিয়মের বেড়াজালে ইস্তাম্বুল এগিয়ে চলে ।
চলবে
Comments :0