মণ্ডা মিঠাই | গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে
ঋষিরাজ দাস
নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ১৭ মে ২০২৬ | কবিপক্ষ
"হে নূতন,
দেখা দিক
আর-বার
জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।।
..... ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের
চির বিস্ময় ।
...........চিরনূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।।"
প্রতিবছরের ৯ই মে তথা ২৫ শে বৈশাখ বাঙালির ঘুম ভাঙে বেতারে বেজে ওঠা অথবা পাড়ার রবীন্দ্র উৎসবের মাইকে বেজে ওঠা এই গানটির চিরন্তন ডাকে। কিন্তু রবি ঠাকুর ২৫ শে বৈশাখ বা ২২শে শ্রাবণের গণ্ডিতেই কেবল নয়, বরং প্রতিদিনের সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলন এবং প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতায় জড়িয়ে আছেন। হে নূতন গানটি কবির জীবনের শেষ জন্মদিনে (২৫ শে বৈশাখ ১৩৪৮ সন) রচিত একটি কালজয়ী গান যা অন্ধকারের কুহেলিকা ভেঙে নতুন আলোর প্রকাশ ও জীবনের আহ্বান জানায়। গানটিতে রিক্ততা বর্জন করে, কুহেলিকা ভেদ করে শুভক্ষণে নতুনত্বের আগমনের বার্তা জানিয়েছেন কবি। কবি পুরাতন, জীর্ণ ও ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নতুন কে আহবান জানিয়েছেন। জীবনের প্রতিটি বাঁক বা নতুন অভিজ্ঞতায় আবার যেন জন্মের মত নতুন আনন্দ ও প্রেরণা আসে, কবি সেই প্রার্থনা করেছেন। আবার কুয়াশা বা অন্ধকারের পর্দা সরিয়ে সূর্যের মতো উজ্জ্বল ভাবে নতুন কে আত্মপ্রকাশ করতে বলা হয়েছে। জীবনের রিক্ততা বা অভাববোধের বক্ষ বিদীর্ণ করে নিজের ভেতরের অসীম শক্তিকে জাগ্রত করার আহ্বান এই গানে নিহিত। সবশেষে সব বাধা পেরিয়ে জীবনের জয় এবং মানুষের ভিতরের অসীম সত্তার স্বরূপ প্রকাশ পাক -----এই আশাই ব্যক্ত হয়েছে। কবি জীবনের যা কিছু মানসিক জীর্ণতা, সংস্কারের প্রতিবন্ধকতা, দুর্বলতা, অজ্ঞতাকে বর্জন করে নতুন সম্ভাবনা ,স্বপ্ন ও শুভ চেতনাকে চিনে তাকে জাগ্রত করার বার্তাই সুরে সুরে, তালে তালে গেয়ে উঠেছেন।
আত্মার প্রতি আত্মার আকুলতা, আত্মসমর্পণ, প্রেম, গভীর ভালোবাসার কথা রবি ঠাকুরের গান ছাড়া আর কোথায় বা এত ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে। ১৯২১ সালের নভেম্বর মাসের শান্তিনিকেতনে প্রিয়জনের বিচ্ছেদের বেদনায় এক গভীর আবেগপূর্ণ অন্তরের নিভৃত তম আকুতি প্রকাশ পেল কবির সৃষ্টিতে। রচনা করলেন -
"দীপ নিবে গেছে মম
নিশীথসমীরে,
ধীরে ধীরে.........
প্রহরে প্রহরে আমি গান
গেয়ে জাগি.......
ক্লান্ত কন্ঠে মোর
সুর ফুরায় যদি রে।।"
গভীর নিশীথে প্রিয়তমা বা ভক্ত তার প্রিয়জনকে নিভে যাওয়া দ্বীপ জ্বালিয়ে দেওয়ার আকুল আবেদন জানায়। যা মূলত অন্ধকারের মাঝে মিলনের আশা এবং আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণের প্রতীক। কবি পরম বাঙ্ময় ঈশ্বরের প্রতি আর্তি জানিয়েছেন যেন ধীরগতিতে এসে হলেও তিনি দেখা দেন কারণ এই দীর্ঘ অপেক্ষার কোনো সমাপ্তি নেই। কবির 'রজনীগন্ধা' এবং 'মন্দির' হৃদয়ের পবিত্রতার প্রতীক। ভক্তের মন এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত, তার অপেক্ষা রজনীগন্ধার সুবাস এর মতন পবিত্র ও ব্যাকুল। তার অন্তর যেন একটি নীরব মন্দির যেখানে প্রিয়জনের আগমনের প্রতীক্ষা চলছে। সময় বয়ে যায় কিন্তু প্রিয়জনের অপেক্ষার শেষ হয় না। ক্লান্ত কন্ঠে সমস্ত ক্লান্তি ভুলে কেবল গান গেয়েই সেই অদৃশ্য সত্তার আগমনকে আহ্বান জানানো হয়। এই গানটি মূলত বাহ্যিক পরিবেশের অন্ধকারের চেয়েও মনের আভ্যন্তরীণ অন্ধকারের রূপক যা চিরকাল ধরে মিলনের প্রতীক্ষায় জেগে থাকে।
রবি ঠাকুর তার গানে গানে, ছন্দে ছন্দে, তালে তালে হতাশাকে জয় করে, ভয় ও অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে আসার সাহস ও বিজয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার উদ্যাম আহবান জানিয়েছেন। তাইতো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তার কলম গর্জে উঠে লিখে ফেলেছিল -
"নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়,
খুলে যাবে এই দ্বার......................
বারে বারে তোরে
ফিরে পেতে হবে
বিশ্বের অধিকার।।
......................
চিরদিন তুই
গাহিবি যে গান
সুখে দুখে লাজে ভয়ে।.........................
ছন্দে যে তোর
স্পন্দিত হবে
আলোক অন্ধকার।।"
"হবে হবে জয়"--- এটি একটি অটল বিশ্বাস। কবি মনে করেন, সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকলে জয় অনিবার্য। "খুলে যাবে এই দ্বার" পংক্তিটির মাধ্যমে নতুন সুযোগ ও মুক্তির কথাই বলা হয়েছে। কবি বারে বারে ভিন্ন ভিন্ন চরণের মাধ্যমে ব্যক্তিগত, সামাজিক বা জাতীয় পর্যায়ের সমস্ত বিশৃঙ্খল বেড়াজালের পরাধীনতা, কুসংস্কার বা ভয় ভেঙে ফেলার বার্তা দিয়েছেন। কবি অন্ধকার থেকে জেগে উঠে নিজের অধিকারের বিষয়ে আত্মসচেতন হতে বলেছেন। মানুষকে তার হৃতগৌরব ও বিশ্বের অধিকার বারে বারে ফিরে পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
মৃত্যু কবির কাছে কোনো ভীতির বিষয় নয়। বরং মৃত্যুকে জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করে ভালোবাসার মাধ্যমে অমরত্বের গান গেয়েছেন কবি। নশ্বর জীবনের অবসানের পর পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মে বয়ে চলাকে সহজ ভাবে গ্রহণ করেছেন। যেখানে ব্যক্তিগত অস্তিত্বের অবসান হলেও সৃষ্টির আনন্দ চিরন্তন।
"যখন পড়বে না মোর
পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইবো না মোর
খেয়া তরী এই ঘাটে...................
যখন জমবে ধুলা
তানপুরাটার
তারগুলায়...........
তখন আমায় নাইবা
মনে রাখলে,...........
তখন কে বলে গো
সেই প্রভাতে নেই আমি।
.........................
তারার পানে চেয়ে চেয়ে
নাইবা আমায়
ডাকলে।।"
কবি জানেন একদিন তার কর্মব্যস্ত জীবন থেমে যাবে, এই পৃথিবীতে তার চলাচলের চিহ্ন মুছে যাবে। এই নষ্টতাকে তিনি গভীর প্রশান্তি ও সাহসের সাথে মেনে নিয়েছেন। কবি ভালো করে জানেন, তার ব্যক্তিগত কর্মযজ্ঞ শেষ হলেও জগতের স্বাভাবিক কাজ , হাটের কোলাহল প্রাকৃতিক নিয়মে থেমে থাকবে না। যদিও পার্থিব শরীরে তিনি না থাকলেও কবি বিশ্বাস করেন তার গান সৃষ্টি ও স্মৃতির মাধ্যমে তিনি রয়ে যাবেন। কবি নিজের বিষয়ে নির্লিপ্ত। কেউ তাকে মনে রাখুক বা না রাখুক, তাতে কবির কোনো আক্ষেপ নেই। মৃত্যুর পরও প্রকৃতির মাঝে তার অস্তিত্ব মিলেমিশে থাকবে এমন এক নির্লিপ্ত ভাবই তার গানে প্রকাশ পেয়েছে।
সবশেষে বলতে পারি সহজ ভাষায়, সহজ কথায়, মৃত্যুর ভীতি নয়, বরং মৃত্যুকে জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে গ্রহণ করে, ভালবাসার মাধ্যমে, সাহসের মাধ্যমে এগিয়ে চলার অমর বার্তায় কবির গানে, তালে, ছন্দে জগতকে ভরিয়ে রেখেছে। তাই কবিগুরুর চরণে ভক্তের শত কোটি কোটি প্রণাম।
নবম শ্রেণী, কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ
খড়দহ, উত্তর ২৪ পরগনা
Comments :0