মণ্ডা মিঠাই | হকার উচ্ছেদ: উন্নয়নের নামে জীবিকার উপর আঘাত
অরিজিৎ মিত্র
নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ৩১ মে ২০২৬
এই প্রবন্ধে মূলত সেই সমস্ত মানুষের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে চেয়েছি যাদের ঘাম মিশে আছে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে—সেই হকারদের পক্ষ নিয়ে, যারা রেলস্টেশন, প্ল্যাটফর্ম ও ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবিকার জন্য লড়াই করেন।
বর্তমানে Eastern Railway এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্থা প্ল্যাটফর্ম ও ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুক্তি দেওয়া হচ্ছে—“সাধারণ মানুষের যাতায়াতে অসুবিধা হয়”, “শৃঙ্খলা নষ্ট হয়”, “শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হয়”। কিন্তু আমি প্রশ্ন করতে চাই—এই সমস্যাগুলো কি আজ হঠাৎ সৃষ্টি হয়েছে?
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বছরের পর বছর লোকাল ট্রেন, বাস, ট্রাম ও ফুটপাত ব্যবহার করে আসছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করেছেন। তখন কি প্রশাসনের চোখে এই অসুবিধা ধরা পড়েনি? যদি এতদিন সমস্যা না হয়, তাহলে আজ হঠাৎ গরিব মানুষের পেটের ভাত কেড়ে নেওয়ার প্রয়োজন কেন?
আসলে, হকাররা সমস্যা নন—সমস্যা হলো পরিকল্পনার অভাব।
যে দেশে কর্মসংস্থানের সংকট বাড়ছে, যেখানে বহু শিক্ষিত যুবক পর্যন্ত চাকরি পাচ্ছেন না, সেখানে একজন হকার নিজের পরিশ্রমে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার চেষ্টা করছেন। তিনি কারও কাছে ভিক্ষা চান না, কারও উপর বোঝা হন না। বরং সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিস কম দামে সহজলভ্য করে দেন।
স্টেশনের চায়ের দোকান, ফুটপাতের বই বিক্রেতা, ফলওয়ালা, জামাকাপড়ের দোকান—এরা শুধু ব্যবসায়ী নন, এরা শহরের জীবন্ত সংস্কৃতি। একজন অফিসযাত্রী সকালে দ্রুত চা পান করেন, একজন শ্রমিক কম দামে খাবার পান, একজন ছাত্র অল্প দামে বই-খাতা পায়—এই সমস্ত সুবিধা কে দিচ্ছে? সেই তথাকথিত “অবৈধ” হকাররাই।
আজ সরকার বলছে ফুটপাত মানুষের হাঁটার জন্য। অবশ্যই ফুটপাত মানুষের জন্যই। কিন্তু সেই মানুষদের মধ্যেই তো হকাররাও পড়েন! তাদেরও তো বাঁচার অধিকার আছে। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে জীবিকা নির্বাহের অধিকার দিয়েছে। তাহলে কেন শুধুমাত্র গরিবদের উপরেই প্রশাসনের কঠোরতা নেমে আসে?
আমরা দেখেছি, বড় বড় শপিং মল রাস্তার পাশে পার্কিং করে যানজট সৃষ্টি করলেও তেমন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বড় ব্যবসায়ীরা নিয়ম ভাঙলেও প্রশাসন অনেক সময় নীরব থাকে। কিন্তু একজন গরিব হকার প্লাস্টিকের ত্রিপল টাঙালেই বুলডোজার চলে আসে! এই দ্বিচারিতা কেন?
উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের শহর নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করা। যদি উন্নয়নের নামে হাজার হাজার পরিবারকে পথে বসতে হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন মানবিক নয়।
আমি বলছি না যে সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা চলুক। প্রশাসন চাইলে নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করতে পারে, লাইসেন্স দিতে পারে, নিয়ম তৈরি করতে পারে। কিন্তু উচ্ছেদ কখনও সমাধান নয়। কারণ উচ্ছেদ মানে শুধু একটি দোকান সরানো নয়—একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেওয়া।
আজ যে হকারকে প্ল্যাটফর্ম থেকে তাড়ানো হচ্ছে, তার ঘরে হয়তো বৃদ্ধ বাবা অপেক্ষা করছেন, হয়তো একটি শিশু বই কেনার আশায় বসে আছে। সরকার কি তাদের দায়িত্ব নেবে?
আমি বলতে চাই—
“ফুটপাত শুধু রাস্তা নয়, বহু গরিব মানুষের জীবনের শেষ আশ্রয়।”
“হকারদের উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসন চাই।”
“জীবিকার অধিকার কেড়ে নিয়ে উন্নয়নের বুলি শোভা পায় না।”
দশম শ্রেণী কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা কল্যাণনগর খড়দহ
Comments :0