ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের প্রক্রিয়ায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের স্বৈরতান্ত্রিক ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে, তাকে দমন করতে মোদী সরকারের মরিয়া চেষ্টা সমস্তরকম নজির ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে দিল্লিতে বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ জানানোর জন্য সরকার অনুমোদিত জায়গা যন্তর মন্তরে বিরোধী রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন গণসংগঠন, সামাজিক সংগঠন বা ব্যক্তিদের জমায়েতকেও স্তব্ধ করতে যেভাবে দিল্লি পুলিশ ধরপাকড়, গ্রেপ্তার করছে তা ব্রিটিশ আমলের দমনপীড়নের সঙ্গেও তুলনীয় বলছেন কেউ কেউ। তা সত্ত্বেও সরকার বিরোধী এই আন্দোলনে তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন জি’র অংশগ্রহণ যেভাবে দেখা যাচ্ছে, সেটাও উল্লেখ করার মতো বিষয়।
এসআইআর নিয়ে ধূমায়িত ক্ষোভ এই প্রক্রিয়া শুরুর থেকেই দেখা যাচ্ছিল। এখানে যে বিপুল গরমিল হয়েছে, তা এই প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া থেকেই স্পষ্ট। বাতিল হওয়া নামের তালিকাতে বহু ন্যায়সঙ্গত ভোটারের নাম যেমন রয়েছে, কয়েক পুরুষ ধরে এদেশে বসবাস করছেন তাঁদের নামও রয়েছে। এমনকি, বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের নামও এই বাতিল তালিকাতে ছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার যে এই বাতিল করার প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ একতরফা, স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেই অভিযোগের বৈধতা দিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদন। দেখা যাচ্ছে, গত ১০ মাসে অপর দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানালেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সেগুলি যেভাবে অগ্রাহ্য করেছেন, তা সম্পূর্ণ অবৈধ, বেআইনি ও সংবিধান বিরোধী। সুপ্রিম কোর্টও এই অভিযোগের সপক্ষেই রায় দিয়ে বলেছে, নির্ধারিত আইন অনুযায়ী ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তিকরণের জন্য যে নির্দিষ্ট নিদর্শ (৬নম্বর ফরম) রয়েছে, তাতে যে বদল আনা হয়েছে, তা অবৈধ ও অননুমোদিত।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের এই সংবিধান বিরোধী ভূমিকায় তাঁকে অপসারণের দাবি উঠেছে দেশজুড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই দাবিতে পথে নেমেছে বিরোধী রাজনৈতিক দল, গণসংগঠনগুলি। গত দু’দিন ধরে দিল্লিতে এই বিক্ষোভে বিশেষ করে ছাত্রযুবদের বিক্ষোভ ব্যাপক আকার নিয়েছে। মোদী সরকারের বিরুদ্ধে দেশের তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’-দের এই প্রতিবাদ আন্দোলন মোদী-শাহ্ জমানার বড় চ্যালেঞ্জ। গত জুলাইয়ে নিট সহ বিভিন্ন সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা বিক্ষোভের চাপে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কোটি কোটি নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে এই আন্দোলনকে ‘যন্তর মন্তর ২.০’ বলা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রতিবাদ ঠেকানোকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় স্বারাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ্র অধীন দিল্লি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী যেরকম ধরপাকড় ও গ্রেপ্তারি শুরু করেছে তা সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কয়েক হাজার প্রতিবাদকারীকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়। পরে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে ও পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় তাঁদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার।
মোদী সরকারের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের এই বিক্ষোভের মূল কারণ দেশে তীব্র বেকারত্ব, চাকরির সুযোগ কমে যাওয়া, শিক্ষা ক্ষেত্রে অনিয়ম, শিল্প ও কৃষিতে ব্যাপক সঙ্কট। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। ককরোচ জনতা পার্টির মতো নবগঠিত প্ল্যাটফর্মগুলো অনলাইন মিম, স্লোগান এবং প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছে, যা তরুণদের পুঞ্জীভূত অসন্তোষকে প্রকাশ করছে। তরুণদের এই বিক্ষোভকে দমন করার রাস্তায় না হেঁটে সরকারের উচিত ছিল, যুব জীবনের সঙ্কটগুলি বিবেচনায় রেখে সমাধানে ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া। তা না করে দমনপীড়নের উলটো পথে হাঁটছে। এর পরিণাম কী হয় তা ইতিহাসে প্রমাণিত হয়েছে।
The Student Youth Resistence
এই যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবে কে
×
Comments :0