Chapadanga

তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন, ১৫ বছর জলবন্দি চাপাডাঙ্গা, দুর্ভোগে ৩০০ পরিবার

জেলা

কৌশিক দাম: ক্রান্তি
বাড়ির চারদিকে হাঁটুজল। গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার রাস্তাও জলের তলায় ডুবে রয়েছে। তিস্তার জলবন্দি দশা কাটেনি, মানুষের দুর্ভোগও বদলায়নি। তবু উৎসবের আনন্দে ভাটা পড়েনি। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে মণ্ডপে পৌঁছাতে এখন ভেলাই ভরসা ক্রান্তি ব্লকের চাঁপাডাঙা গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসুসুবা ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের। শিশু, বৃদ্ধ, মহিলা— সকলকেই ছোট ছোট শোলার ভেলায় চেপে যাতায়াত করতে হচ্ছে। পুজোর আনন্দের আড়ালেই সামনে এসেছে দীর্ঘদিনের জলনিকাশির সমস্যা এবং তিস্তার গতিপথ পরিবর্তনের পরিণতি।
গ্রামবাসীদের বাসুসুবায় বাড়ি থেকে মূল রাস্তায় উঠতে তিন ফুট চওড়া ও ছয়-সাত ফুট লম্বা ভেলায় চেপে যেতে হচ্ছে। কারও পুজো মণ্ডপে পৌঁছতে পাঁচ মিনিট, কারও আবার ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় ১৫ বছর ধরে চাঁপাডাঙার মাস্টারপাড়া, কেরানিপাড়া ও সেনপাড়ার প্রায় ৩০০ পরিবারকে বছরের একটা দীর্ঘ সময় জলবন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়।
বাসুসুবা বাজারে হাইস্কুলের পাশে নবজীবন সংঘের স্থায়ী মন্দির রয়েছে। এবারের পুজো ৫৯ তম বছর। পুজো কমিটির সম্পাদক দীপঙ্কর সেন জানান, ‘‘জলবন্দি পরিস্থিতিতেও পুজোর প্রস্তুতি ও উৎসাহে ঘাটতি নেই। পুজোর আয়োজন থেকে অঞ্জলি — সব ক্ষেত্রেই মহিলাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। পুজোর দিন প্রায় ১০০ জন মহিলা ভেলায় চেপে পুজোর সামগ্রী নিয়ে মণ্ডপে পৌঁছাবেন।’’
স্থানীয় বাসিন্দা হিমানী রায় ও সুষমা রায় জানান, ‘‘বিয়ের পর থেকেই এই পরিস্থিতি দেখে আসছেন। প্রথম দিকে ভেলায় যাতায়াতে ভয় লাগলেও এখন তা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নবমীর দিন গ্রামের বহু বাড়িতে রান্না হয় না। প্রসাদ খেয়েই দিন কাটে। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের পরিবর্তে প্রতিমাকে সামনে রেখেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
কিন্তু উৎসবের দিনেও এই ছবি আসলে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যারই প্রতিফলন। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দেড় দশক আগে তিস্তা চাঁপাডাঙা থেকে কিছুটা দূর দিয়ে বইত। বর্তমানে নদীর গতিপথ গ্রামের দিকে প্রায় ৩০০ মিটার সরে এসেছে। তাঁদের দাবি একই সঙ্গে নদীর নাব্যতা বা গভীরতা প্রায় তিন থেকে চার ফুট কমেছে।
পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাত বাড়লে তিস্তার জল চাঁপাডাঙা ও বৈদ্যাডুবি নদীর সঙ্গমস্থল দিয়ে উল্টো স্রোতে গ্রামে ঢুকে পড়ে। জলস্তর কমলেও দ্রুত জল বেরিয়ে যেতে পারে না। ফলে নিচু এলাকা গুলি দীর্ঘ সময় জলমগ্ন থাকে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বর্ষায় কয়েকশো বিঘা জমি জলের তলায় থাকায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। এক সময়ের বহু ফসলি জমির উপর নির্ভর করতে না পেরে অনেক কৃষককে দিনমজুরি বা অন্য পেশায় যেতে হচ্ছে।
পরিবেশপ্রেমী অভিযান সাহার মতে, তিস্তার নাব্যতা ও গভীরতা কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত বর্ষার জল দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারছে না। ধূপগুড়ি মহিলা কলেজের অধ্যাপক দেবর্ষি ঘোষও সমীক্ষার প্রসঙ্গ তুলে জানান, শুধু সাময়িক ভাবে জল বের করার ব্যবস্থা করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নদীর খাতে জমে থাকা পলি সরানো এবং জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ক্রান্তির বিডিও রিমিল সোরেইন জানিয়েছেন, নিচু এলাকায় জমে থাকা জল কীভাবে দ্রুত বের করা যায়, তা খতিয়ে দেখতে এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। সেচ দপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করে শীঘ্রই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।
প্রশাসনের এই আশ্বাসের পরেও স্থানীয়দের প্রশ্ন, বছরের পর বছর ধরে চলা জলবন্দি দশার স্থায়ী সমাধান কবে হবে? রাস্তা, কৃষিজমি ও স্বাভাবিক জনজীবনকে জলমুক্ত করার দাবি উঠছে। আপাতত তিস্তার জল পেরিয়ে ভেলায় চেপেই পুজোর আনন্দ ভাগ করে নিতে চাঁপাডাঙার মানুষ প্রস্তুত।

Comments :0

Login to leave a comment