প্রতিবাদের আঁচ টের পেয়ে গেছে মোদী-শাহ সরকার। রাজধানী সামলাতে দিনভর সরকার যে স্বৈর আগ্রাসন দেখালো তার নজির মেলা ভার। শুক্রবারই রাজধানীর মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, নয়া দিল্লি আর হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে ঢোকা ট্রেন বাতিল করার নির্দেশ ছিল, দিল্লি ঢোকার পথে ব্যারিকেড, গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি, হোটেল-পিজিতে নাকাবন্দি, দিল্লির রাজপথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহলদারি, ইন্টারনেট বন্ধ-কার্যত দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেই নেমেছিল সরকার। যন্তর মন্তরে একটা প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ঘিরে, তাকে আটকাতে মোদী সরকারের এই মহা আয়োজন কেন? বিভিন্ন রাজ্যে কেন প্রায় ১০ হাজার মানুষকে আটক বা গৃহ বন্দি করা হয়েছে যাতে দিল্লি পৌঁছাতে না পারে। এই বিধিনিষেধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন যেমন দেশবাসীর, প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্টও।
তারপরও যা ঘটল তা নজিরবিহীন তো বটেই, দেশের গণতন্ত্রের পক্ষে লজ্জার দিন হিসাবে চিহ্নিত হয়ে রইলো। ক্ষমতার মোহে যে শক্তি প্রদর্শন করল বিজেপি সরকার তাকে কাপুরুষতা ছাড়া আর কি বলা যায়! গণতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনায় সম্পূর্ণ অক্ষম যে মোদী সরকার, তার পরিচয় আরেকবার পেয়ে গেল সাধারণতন্ত্রের ভারত।
এখন সরকার মানুষকে ভয় পাচ্ছে। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এদিন যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ দেখানোর ডাক ছিল। সেই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে শামিল হয়েছিল সিপিআই(এম)। এজন্য স্থগিত করা হয় এ দিনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাও। কারণ লড়াই চলছে বহুভাবে, বহু পথে। এই সরকার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে। নির্লজ্জভাবে কেড়ে নিচ্ছে সংবিধানিক সমস্ত অধিকার। এই লড়াই তাই হয়ে উঠেছে দেশের নাগরিক বনাম সরকারের লড়াই।
সকাল থেকেই উত্তপ্ত দিল্লি, যন্তর মন্তর যাওয়ার পথে ধর-পাকড়, টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া। সিপিআই (এম) দপ্তর হরকিষাণ সিং সুরজিৎ ভবন ঘিরে ফেলে কেন্দ্রীয় বাহিনী। এসএফআই, ডিওয়াইএফআই কর্মীরা একেজি ভবন থেকে মিছিল করে যন্তর মন্তর যেতে গেলে রাস্তা আটকায় পুলিশ। আটক করা হয়েছে একাধিক কর্মী সমর্থককে। গ্রেপ্তার করা হয় এমএ বেবি, বৃন্দা কারাত, পিনারাই বিজয়ন, মানিক সরকার সহ শীর্ষ সিপিআই(এম) নেতৃবৃন্দকে। পুলিশি ঘেরাটোপে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে দিল্লি থেকে অনেক দূরে। দিল্লি এয়ারপোর্টে বিমান নামার সাথে সাথে অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কাকে বিমানের মধ্যে থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়। এই প্রতিবাদ কর্মসূচির খবর করতে গিয়ে আটক হয়েছেন বহু সাংবাদিকও। যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথে আটক করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদেরও।
২০২৫সালের জুনে বিহার থেকে শুরু হওয়া এসআইআর পরবর্তীতে দেশের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে এবং ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। প্রকাশ্যে এসেছে গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী এসআইআর এবং ভোটার-তালিকা সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪বার নথিভুক্ত আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কাজ চালিয়ে গেছেন নেপথ্য আজ্ঞায়, আর বিজেপির’ জয় এসেছে একের পর এক রাজ্যে, একের পর এক কেন্দ্রে। আর সে কারণেই নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে এত প্রশ্ন। সিপিআই (এম) সহ সমস্ত বিরোধী দলের দেশব্যাপী দাবি জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং এসআইআর বাতিলের। বিরোধী দলগুলির দাবি, বাদ পড়েছে এমন প্রকৃত ভোটারদের নাম দ্রুত ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে দিতে হবে। সরকার ভয় পেয়েছে এখানেই। আন্দোলন যত তীব্র হচ্ছে সরকার তত কোণঠাসা হচ্ছে, দমনপীড়নের মাত্রাও তত বাড়াচ্ছে। স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে সরকারের ভয়।
editorial
সরকারের স্বৈর আগ্রাসন
×
Comments :0