Maharashtra

অক্টোবরেই জলসংকটের আশঙ্কা মহারাষ্ট্রে! নাগপুর-পুণেতে জল ব্যবহারে কড়াকড়ি, জল নষ্ট করলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা

জাতীয়

অক্টোবর মাস এখনও শেষ হয়নি। অথচ তার আগেই মহারাষ্ট্রের একাধিক শহরে দেখা দিতে শুরু করেছে তীব্র জলসংকটের আশঙ্কা। একদিকে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে দুর্বল বর্ষা ও এল নিনোর প্রভাবে চাপে পড়েছে জলাধারগুলির জলস্তর। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জল সংরক্ষণে একাধিক জরুরি পদক্ষেপ করেছে রাজ্য সরকার। নাগপুর ও পুণেতে জল অপচয় রুখতে কড়া বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। অন্যদিকে, মারাঠওয়াড়া অঞ্চলের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে বাঁধের জল বাষ্পীভূত হয়ে বিপুল পরিমাণে কমে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
জল অপচয় করলে মোটা অঙ্কের জরিমানা, বেআইনি সংযোগের বিরুদ্ধে এফআইআর এবং নির্দিষ্ট দিনে জল সরবরাহ বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জলসংকট মোকাবিলায় কার্যত ‘জল কার্ফু’-র পথে হাঁটতে হচ্ছে প্রশাসনকে।
প্রশাসনের আশঙ্কা, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী দিনে জলসংকট শুধু জনস্বাস্থ্য ও জীবিকার সমস্যা হয়ে থাকবে না, তা আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
মহারাষ্ট্রের দ্বিতীয় রাজধানী নাগপুরে জলাধারগুলির মোট ধারণক্ষমতার মাত্র ৫৮ শতাংশ জল মজুত রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে একাধিক বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছে নাগপুর পুরনিগম (এনএমসি)।
পুরনিগমের নির্দেশ অনুযায়ী, পানীয় জল অপচয়ের প্রতিটি ঘটনায় ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। গাড়ি ধোয়া, রাস্তা বা উঠোন পরিষ্কার করা, বাগানে জল দেওয়া এবং নির্মাণকাজে পানীয় জল ব্যবহার সবই এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে।
শুধু জরিমানাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না প্রশাসনের পদক্ষেপ। বেআইনি জলের সংযোগ এবং জলের মিটারে কারচুপি রুখতে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হবে।
বৈধ সংযোগের ব্যবস্থা সহজ করতে পুরনিগমের জোনভিত্তিক শিবির আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি, প্রতিটি জলের সংযোগে মিটার বসানো বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জলাধারের উপর চাপ কমাতে পুরনো কুয়োগুলি পরিষ্কার করে সেখানে সৌরশক্তিচালিত পাম্প বসানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। নিকাশি জল পরিশোধন কেন্দ্র থেকে পাওয়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য জল পার্কে জল দেওয়া এবং নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হবে।
মহারাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র পুণেতেও জলসংকটের আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে। ১২ অক্টোবর পর্যন্ত শহরে জল সরবরাহকারী খড়কওয়াসলা বাঁধ-শৃঙ্খলে ২৬.২২ টিএমসি জল মজুত ছিল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৬ অক্টোবর থেকে অন্তত ১০ শতাংশ জল ব্যবহার কমানোর নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। ২০২৭ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত যাতে মজুত জল দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল, প্রতি বৃহস্পতিবার শহরজুড়ে জল সরবরাহ বন্ধ রাখা। ১৫ অক্টোবর থেকে এই ব্যবস্থা চালু করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়াও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি গাড়ি ধোয়ার কেন্দ্রগুলি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্মাণকাজ, বাগান পরিচর্যা এবং সুইমিং পুলে পানীয় জল ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পৌরসভার জল বা বোরওয়েলের জল দিয়ে গাড়ি, উঠোন এবং ফুটপাথ ধোয়ার উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে।
আবাসনগুলিকে নিজস্ব নিকাশি জল পরিশোধন কেন্দ্র চালু রাখতে বলা হয়েছে। বাগানে জল দেওয়া এবং শৌচাগারে ব্যবহারের জন্য পরিশোধিত জল ব্যবহারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। বেআইনি জলের সংযোগ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হবে। পাশাপাশি, কোথাও জলের পাইপে ফুটো বা লিকেজ দেখা গেলে দ্রুত পুণে পুরনিগমের ‘পিএমসি কেয়ার’ প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানানোর আবেদন করা হয়েছে বাসিন্দাদের কাছে।
নাগপুর ও পুণেতে যেখানে জল অপচয় নিয়ন্ত্রণে কড়া পদক্ষেপ করা হচ্ছে, সেখানে খরাপ্রবণ মারাঠওয়াড়া অঞ্চলের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে উদ্বেগের অন্য কারণ। শহরের জল সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস জয়কওয়াড়ি বাঁধ থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জল বাষ্পীভূত হয়ে যাচ্ছে।
প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, জয়কওয়াড়ি বাঁধ থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৬.৪৯ লক্ষ ঘনমিটার জল বাষ্পীভূত হচ্ছে। লিটারের হিসাবে যার পরিমাণ প্রায় ১৬৪.৯ কোটি।
অক্টোবর মাসেও তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে থাকায় এই জলক্ষয়ের পরিমাণ আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে বলা হচ্ছে, এক দিনে বাঁধ থেকে বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়া জলের পরিমাণ ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের প্রায় ১৮ লক্ষ বাসিন্দার সাত দিনের জল ব্যবহারের সমান।
শহরটির প্রতিদিনের জলের চাহিদা প্রায় ২০০ থেকে ২৩০ মিলিয়ন লিটার। চলতি বছরে শহরের জন্য ১৮৪ মিলিয়ন ঘনমিটার জল সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। কিন্তু তাপমাত্রা বেশি থাকায় এবং জলাধারগুলির উপর চাপ বাড়তে থাকায় সেই জল কত দিন পর্যন্ত চাহিদা মেটাতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, জলসংকট আর শুধু গরমের মরশুমের সমস্যা নয়। দুর্বল বর্ষা, এল নিনোর প্রভাব, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং জলাধার থেকে জলের ক্ষয় সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
নাগপুরে জল অপচয় রুখতে জরিমানা ও আইনি পদক্ষেপ, পুণেতে জল সরবরাহে বিধিনিষেধ এবং ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে বাষ্পীভবনের কারণে বিপুল জলক্ষয় তিনটি শহরের পরিস্থিতি সমস্যার ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরছে।
প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, বর্তমানে যে পরিমাণ জল মজুত রয়েছে, তা দিয়ে আগামী কয়েক মাসের চাহিদা মেটানো। শুধু জল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ নয়, জল পুনর্ব্যবহার, বেআইনি সংযোগ বন্ধ করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
জল সংরক্ষণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না করা গেলে, আগামী দিনে মহারাষ্ট্রের একাধিক শহরে পানীয় জলের সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

Comments :0

Login to leave a comment