নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনকে নোটিশ জারি করলো সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, আইন মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। কোনও সিদ্ধান্ত আইনবিরুদ্ধ প্রমাণিত হলে তা বাতিলও করতে পারে আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বেঞ্চে মামলাটি ওঠে। অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনারের অনুমোদন বা সম্মতি ছাড়াই একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। বিশেষ করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে কেন্দ্র করে এই অভিযোগ উঠেছে।
আবেদনকারীদের পক্ষে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ সিং। তিনি অন্তর্বর্তী নির্দেশ হিসেবে জ্ঞানেশ কুমারকে নতুন করে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখার আবেদন জানান। এমনকি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার দাবিও তোলা হয়।
তবে এই পর্যায়ে সেই আবেদন গ্রহণ করেনি শীর্ষ আদালত। বেঞ্চের বক্তব্য, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরিয়ে দিলে নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম কার্যত থমকে যেতে পারে। আদালত প্রশ্ন তোলে, “তাহলে নির্বাচন পরিচালনা করবে কে?” নির্বাচন কমিশনকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করতে হবে বলেও জানায় বেঞ্চ।
আবেদনকারীর আইনজীবী পাল্টা যুক্তি দেন, বাকি দুই নির্বাচন কমিশনারই কমিশনের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। তবে আদালত জানিয়ে দেয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্য না শুনে কোনও নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়।
বেঞ্চ আরও জানায়, আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নেওয়ার কথা থাকলে সেই বিধান মেনে চলতেই হবে। প্রধান বিচারপতি বলেন, কোনও সিদ্ধান্তে যদি সর্বসম্মতি বা প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকে এবং তা আইনবিরুদ্ধ হয়, তাহলে আদালত সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারে।
তবে আদালত একইসঙ্গে স্পষ্ট করেছে, শুধুমাত্র সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না। প্রধান বিচারপতি বলেন, সংবাদপত্রের রিপোর্ট পুরোপুরি সঠিক, আংশিক সঠিক অথবা ভুলও হতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রের বক্তব্য ও নথি খতিয়ে দেখার পরই আদালত কোনও সিদ্ধান্ত নেবে।
এই মামলার সূত্রপাত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার এসআইআর-সহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং কিছু সিদ্ধান্ত তাঁদের অনুমোদন বা সুপারিশ ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন অবশ্য জানিয়েছিল, কোনও প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক এবং কমিশনের সমস্ত নির্দেশ আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনেই জারি করা হয়েছে।
মামলাকারী রাকেশ কুমার সিংয়ের আবেদনের পাশাপাশি আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর করা আরেকটি আবেদনও শুনানির জন্য যুক্ত করেছে আদালত। ত্রিপাঠীর আবেদনে একাধিক দাবি একসঙ্গে থাকায় সেগুলি প্রয়োজনমতো সংশোধন করার নির্দেশ দিয়েছে বেঞ্চ।
রাকেশ কুমার সিংয়ের আবেদনে মূলত জানতে চাওয়া হয়েছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এককভাবে এমন কোনও ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন কি না, যা আইন অনুযায়ী পুরো নির্বাচন কমিশনের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের বিষয়। যদি তা হয়ে থাকে, সেই সিদ্ধান্তগুলিকে অননুমোদিত ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে।
আদালত জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি ও জবাব পাওয়ার পরই অভিযোগগুলির সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলির বৈধতা খতিয়ে দেখা হবে। অর্থাৎ, এই পর্যায়ে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কোনও অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা জারি না হলেও, কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে আদালত যে বিস্তারিতভাবে বিষয়টি পরীক্ষা করতে প্রস্তুত, সোমবারের শুনানিতে তা স্পষ্ট হয়েছে।
Supreme Court Gyanesh Kumar
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে কড়া বার্তা, নোটিস কেন্দ্র ও কমিশনকে
×
Comments :0