রোগ সারানোর বদলে রোগীকে মেরে ফেলার দাওয়াই প্রয়োগ করতে চলেছে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। পঞ্চায়েতে তৃণমূলের দুর্নীতিকে অজুহাত হিসাবে দেখিয়ে এবার নির্বাচিত পঞ্চায়েতী ব্যবস্থাকেই পঙ্গু করার জন্য পঞ্চায়েত আইনে পরিবর্তন করতে চাইছে তারা। নতুন আইনে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের উলটো পথে হেঁটে ক্ষমতার আরও কেন্দ্রীকরণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পঞ্চায়েত দপ্তরের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বিধানসভায় ঘোষণা করেছেন, বিধানসভায় বিল এনে পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েতের প্রধানদের আর্থিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হবে। আর্থিক লেনদেনে সই করার ক্ষমতা সচিবদের হাতে দেওয়া হবে। এই বিল আইনে পরিণত হলে পঞ্চায়েতের তহবিল পরিচালনা, অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রধানের স্বাক্ষর আর বাধ্যতামূলক থাকবে না। এই ক্ষমতা পঞ্চায়েত সচিবের অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীর হাতে চলে যাবে। বর্তমান আইনে পঞ্চায়েতের নির্বাহী প্রধান হিসাবে আর্থিক লেনদেন, উন্নয়ন প্রকল্পের বিল অনুমোদন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, ঠিকাদারি চুক্তি, ট্রেড লাইসেন্স, বিভিন্ন শংসাপত্র ইস্যু সহ একাধিক ক্ষেত্রে প্রধানের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। প্রধান অনুপস্থিত থাকলে সেই দায়িত্ব পালন করেন উপপ্রধান। পঞ্চায়েতের আইন সংশোধনী কার্যকর হলে উপপ্রধানের সেই ক্ষমতাও আর থাকবে না বলেই জানা গেছে।
নতুন সরকারের অভিযোগ, পূর্বতন সরকার অর্থাৎ তৃণমূলের আমলে রাজ্যে পঞ্চায়েতগুলিতে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে। প্রায় সব পঞ্চায়েতগুলিই তৃণমূলের দখলে, কারণ ভোট লুট করে তৃণমূল পঞ্চায়েত পৌরসভায় জিতেছে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতির কারণে জনগণের ক্ষোভের ভয়ে পঞ্চায়েত প্রধানরা পালিয়েছে। এই অবস্থায় গ্রামীণ জনগণ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গ্রামে সরকারি প্রকল্পের টাকা নিয়ে দুর্নীতি বন্ধের জন্যই নাকি নির্বাচিত পঞ্চায়েত প্রধানদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে সরকারি কর্মচারী সচিবদের হাতে দেওয়া হচ্ছে।
স্পষ্টতই, তৃণমূল আমলের দুর্নীতির কারণে তৈরি হওয়া অচলাবস্থাকে অজুহাত করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা খর্ব করে আমলাতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চাইছে বিজেপি সরকার। পঞ্চায়েতে আমলাদের সর্বেসর্বা করে দিতে চাইছে। মানুষ যাঁকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন, তাঁর ক্ষমতা খর্ব হবে। মানুষের প্রতি পঞ্চায়েতের দায়বদ্ধতা দুর্বল হবে। পঞ্চায়েত কার্যত নবান্নের সম্প্রসারিত প্রশাসনিক অংশে পরিণত হবে। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে পঞ্চায়েতকে বলা হতো ‘গ্রামের সরকার’। ১৯৭৭ সালে সরকারে এসেই বামফ্রন্ট ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়নের ঘোষণা করেছিল। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ঘোষণাই ছিল, শুধু মহাকরণ থেকে সরকার চলবে না, সরকার চলবে গ্রাম শহরে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে। এই লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। এই বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার ফলেই গ্রামে বন্যা মোকাবিলা, ভূমি সংস্কার সহ নানা গ্রামোন্নয়ন প্রকল্পের সফল রূপায়ণ সম্ভব হয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল শুধু ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নয়, স্থানীয় স্বায়ত্ত শাসনকে অংশগ্রহণমূলক করে তোলা। এর জন্যই পরবর্তীকালে বামফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েত আইন সংশোধন করে গ্রাম সংসদ ও গ্রাম সভা বাধ্যতামূলক করেছিল। তৃণমূল সরকারের পনেরো বছরে সেগুলি ধ্বংস করা হয়েছে। মানুষ সমাধান প্রত্যাশা করেছিল, দুর্নীতিমুক্ত পঞ্চায়েত পৌরসভা প্রত্যাশা করেছিল নতুন সরকারের কাছে। কিন্তু বিজেপি পঞ্চায়েতী ব্যবস্থাকেই অস্বীকার করতে শুরু করেছে। দুর্নীতিতন্ত্র কায়েম হলে সেটা যে শুধু নিচু তলার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই হয় না, বরং উপরতলার ছাতা থাকলে আমলাতন্ত্রের মাধ্যমেও মারাত্মকভাবেই হতে পারে তার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত কলকাতা কর্পোরেশনেই আছে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীই কর্পোরেশনের ওএসডি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম করে তাঁকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন কয়েকদিন আগেই। সরকারে ক্ষমতাসীন শাসকদলের প্রশ্রয় থাকলে এমন অনেক কালীচরণ গজিয়ে উঠতে পারে পঞ্চায়েতে, পৌরসভায়। তাঁদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতে হবে না, কেবল শাসকদলের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখলেই চলবে।
Panchayat Municipality
কেন্দ্রীকরণের পশ্চাৎগতি
×
Comments :0