দেশ উন্নত হবে, অর্থনীতি বিকশিত হবে, জিডিপি তথা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন— এটা প্রতিটি নাগরিকই ভীষণভাবে প্রত্যাশা করেন। বস্তুত নাগরিকরা ভোট দিয়ে যে সরকার গঠন করে সেই সরকারের কাছে এটাই তাদের প্রধান চাওয়া। এটা কারও অজানা নয়। দেশের অর্থনীতি উন্নত বা বিকশিত হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, বেকারির হার কমবে, রুজি-রোজগার বাড়বে, সর্বোপরি জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। মানুষের এমন প্রত্যাশা স্বাভাবিক। যে কোনও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কাছে দায়বদ্ধ। রাষ্ট্রকে পরিচালনা করে যে সরকার তাকে তৈরি করে দেয় দেশের জনগণ। তেমনি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র ও দায়বদ্ধতা নির্দিষ্ট করা থাকে সংবিধানের ধারা-উপধারার মাধ্যমে। তাই সরকারকে সর্বাগ্রে দেশের জনগণের স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হয়। গণতন্ত্রের নির্বাচিত সরকার কোনও ধর্মের নয়, বর্ণের নয়, কোনও জাতি গোষ্ঠীর নয়, কোনও অঞ্চলের নয়, এমনকি কোনও শ্রেণিও নয়। সরকার তার প্রতিটি নীতি নির্ধারণ ও পদক্ষেপের পেছনে সকল অংশের নাগরিকের স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করবে, এক অংশের স্বার্থের বিনিময়ে অন্য অংশের বঞ্চনা গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার এমন কোনও নীতি বা প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে না যা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বঞ্চিত করে সংখ্যাগুরুদের সুবিধা দেবে। তেমনি শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধির নামে শ্রমিকদের বঞ্চিত করে মালিকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায় না।
বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিকে যে দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে সেখানে শ্রমিক-কর্মচারীরা শ্রম শোষণের উপাদান হিসাবে বিবেচিত হয়। মুনাফা বৃদ্ধিটাই প্রধান টার্গেট। তার জন্য শ্রমিক কমিয়ে, কাজের বোঝা বাড়িয়ে, কাজের সময় বাড়িয়ে, মজুরি না বাড়িয়ে, শ্রমিকদের কোনোরকম সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে মুনাফা বৃদ্ধিকে পাখির চোখ করা হয়। তথাকথিত উদারনীতি শোষণের এমন লাগাম ছাড়া ব্যবস্থাকে আরও তীব্র ও ব্যাপ্ত করে। উদারনীতি তথা সংস্কারের ধাপে ধাপে একের পর এক আইন সংশোধন করে শ্রমিকদের অধিকার কাড়া হচ্ছে আর মালিকদের জন্য সুবিধার পর সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। মালিকরা সস্তায় বা বিনা পয়সায় জমি পাবে, জঙ্গল-পাহাড়ের অধিকার পাবে, যথেচ্ছ জল ব্যবহারের স্বাধীনতা পাবে, সহজে যত খুশি ব্যাঙ্ক ঋণ মিলবে, শোধ করতে না পারলে মকুব হয়ে যাবে, মালিকদের ব্যক্তিগত আয় কর ও কর্পোরেট করের হার কমবে, কর না দিলে ছাড় মিলবে। সস্তায় বিদ্যুৎ মিলবে ইত্যাদি যখন যেমন সুবিধা চাইবে মিলবে। কিন্তু শ্রমিকদের জন্য নতুন সুযোগ সুবিধা তো দূরের কথা পুরনো সুযোগ সুবিধাও বাতিল হয়ে যাবে।
আগের যাবতীয় শ্রম আইন বাতিল করে যে চারটি শ্রম কোড হয়েছে তাতে শ্রমিকদের জন্য নতুন কোনও সুবিধা আসেনি। বরং তাদের অনেক অধিকার, সুবিধা, নিরাপত্তা বাতিল হয়ে গেছে। শিল্পের সংজ্ঞা বদল করে কোটি কোটি শ্রমিককে আইনি অধিকার ও সুযোগ সুবিধার আওতা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এখন সুপ্রিম কোর্টের ৯ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ ৩-৪ সদস্যের বিভাজিত রায়ে তাকেই কার্যত বৈধতা দিয়ে দিয়েছে। শ্রেণি বিভক্ত সমাজে বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার এবং বিচার ব্যবস্থা যে পুঁজির মালিকদেরই স্বার্থে কাজ করে এ ঘটনা আরও একবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
Deprivation at Every Stage
পদে পদে বঞ্চনা
×
Comments :0