রণদীপ মিত্র: মহম্মদবাজার
টুলু মণ্ডল এখনও অধরা। ‘নাগাল’ পায়নি পুলিশ। তবে তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে হানা দিয়ে চোখ ছানাবড়া হয়েছে পুলিশের। ব্যাগের পর ব্যাগ ভর্তি টাকা আর থরে থরে সাজানো সোনার বাঁটের সম্ভারে চমকে দেওয়ার মত ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মজুত নগদ আর সোনার বাঁট গোনা চলছে পনেরো ঘন্টা। তবু মোট কত টাকা মিলেছে পুলিশ খোলসা করেনি। বীরভূমের পাথর বলয়ের এই ঘটনা শোরগোল ফেলেছে চারিদিকে।
জাতীয় সড়ক ধরে সিউড়ি থেকে রামপুরহাট যাওয়ার রাস্তায় পড়ে দেউচা। দেউচা বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে রয়েছে সাদামাটা একটি দো-তলা বাড়ি। বাড়ির মালিক নাজিবুদ্দিন ওরফে মিনার মন্ডল। স্থানীয়দের সকলের কাছেই সে এক নিরীহ, শান্ত সরকারি পরিবহণ সংস্থার অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। সেই মিনার মন্ডলের বাড়িতে বুধবার ভোররাতে বীরভূম জেলা পুলিশের বিশাল বাহিনী হানা দেয়।
বুধবার নিয়ে আসা হয় পাঁচটি টাকা গোনার মেশিন। আনা হয় বড় বড় ট্রাঙ্ক। দুপুর নাগাদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক্স-হ্যান্ডলে দাবি করেছেন, ‘‘নগদ সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ও পনেরো কেজি সোনা উদ্ধার হয়েছে।’’ তবে রাত পৌনে ১১ টা নাগাদ ২৮ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা, ১৫ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। এই তথ্য দিয়েছেন পুলিশ সুপার বিদিত রাজ বুন্দেশ। সাংবাদিক সম্মেলন করে তিনি বলেন গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে মিনার মন্ডলের বাড়িতে হানা দিয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সোনা উদ্ধার হয়েছে। ভিডিওগ্রাফি করে তল্লাশি চলছে। তিনি বলেন জিজ্ঞাসাবাদে মিনার মন্ডল স্বীকার করেছে বালি পাথর মাফিয়া মহম্মদ নাজিমুদ্দিন ওরফে টুলু মন্ডলের সঙ্গে যুক্ত থেকে এই অপরাধমূলক সিন্ডিকেট চালাতেন। উদ্ধার হওয়া অর্থ সোনা সেই কারবারের অংশ। তবে বীরভূমে অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ পাথর-মাফিয়া টুলু মণ্ডল এখনও অধরা। ‘নাগাল’ পায়নি পুলিশ মুখ্যমন্ত্রী এক্স-হ্যান্ডলে এই ঘটনায় টুলু মন্ডলের নাম উল্লেখ করেছেন বালি-মাফিয়া বলে। আদতে টুলু কুখ্যাত পাথরের মাফিয়ারাজের জন্য। তা’হলে মুখ্যমন্ত্রী পাথরের উল্লেখ করলেন না কেন? প্রশ্ন রয়েছে রাঘব-বোয়াল টুলু মন্ডল কবে পড়বে জালে?
তৃণমূল আমলে বীরভূমের পাথর বলয় জুড়ে নকল ডিসিআরের কারবারের বেতাজ বাদশা হয়ে উঠেছিল টুলু মন্ডল। তাঁর কারবারের কথা জানেন সকলে। আগেও তিনি ইডি-সিবিআইয়ের হানার মুখে পড়েছিলেন। তাতে সামান্য আঁচ পড়েনি এই ব্যবসায়ীর কারবারে। পাথর থেকে রাজস্ব আদায়ের নামে নকল চালানের কারবারে দিনে কম করে কোটি টাকা কামিয়েছেন বছরের পর বছর ধরে। প্রশাসন থেকে পুলিশ, পুরোনো শাসকদল তো বটেই, গুঞ্জন এমনও যে নতুন শাসকদলেরও বহু মাথার কাছেও মাসোহারা পৌঁছেছিল নিয়ম মেনেই। টুলু মন্ডলের কারবার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এক পাথর ব্যবসায়ীই জানিয়েছেন, ‘‘নগদ অর্থ নিরাপদে রাখতে টুলু ব্যবহার করেছে এঁদেরকে। তাঁদের মধ্যেই একজন এই মিনার মন্ডল।’’
জানা গেছে, এই মিনার মন্ডল টুলু মন্ডলের আত্মীয়। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর টুলু মন্ডলের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে আসেন। টুলু নিজের ব্যবসার একাংশ দেখভালের দায়িত্ব দেয় এই মিনার মন্ডলকে। অনেকের মত, এই মিনারকেও টুলু ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছে।
অপরদিকে বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে পালাবদল হতেই অন্তরালে চলে গিয়েছে টুলু মন্ডল। ইতিমধ্যেই তাঁর একাধিক ডেরা থেকে বাজেয়াপ্ত হয়েছে বিপুল পরিমান বালির স্তূপ। ভোট পরবর্তী হিংসার মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন। তবুও পুলিশের কাছে এখনও ‘অধরা’ই। অবশেষে তাঁর শাগরেদের বাড়ি থেকে বিপুল নগদ উদ্ধার হলো। টুলুর হদিশ কবে মিলবে এই প্রশ্নই জোরালো হয়েছে।
বীরভূমের পুলিশ সুপার বিদিত রাজ বুন্দেশ বুধবার সন্ধ্যায় জানিয়েছেন, ‘‘এখনও প্রক্রিয়া চলছে। প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে তবে মন্তব্য করা সম্ভব হবে।’’
Comments :0