editorial

অতি আস্ফালন ভালো নয়

সম্পাদকীয় বিভাগ

কলকাতার বুকে তারুণ্যের প্লাবন দেখে মাথা ঘুরে গেছে সদ্য ক্ষমতা পাওয়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। বরাবরই অসংলগ্ন ও অবান্তর কথাবার্তা বলায় অভ্যস্ত তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর আড়াই মাস কাটতে না কাটতে সেই মাত্রাটা অনেকটা বেড়েছে। অতিরিক্ত ক্ষমতা সব সময় সকলে হজম করতে পারেন না। ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদী এবং অতি জাতীয়তাবাদী ও রাষ্ট্রবাদী দলে যোগ দিয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতা পেয়ে গেছেন। ভাবতে শুরু করেছেন ভোটে যখন জিতেছেন বা মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন তখন তিনিই শেষ কথা। তিনি যা বলবেন যেমন চাইবেন তেমনটাই হবে। শুধু সব ঘোষণা বা হুঙ্কার ছাড়ার আগে মোদী এবং শাহ-কে স্মরণ করে নিতে হবে। এটুকু বুঝিয়ে দিতে চান তিনি নিমিত্ত মাত্র। সবই কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। গুরুদের হুকুম তালিম করাই ভক্তদের একমাত্র কর্তব্য। ভক্তদের নিজের কিছু বলার বা করার থাকতে পারে না। বিজেপি-তে যোগ দিয়ে এমন সনাতনী হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি দক্ষতার সঙ্গে রপ্ত করে ফেলেছেন অধিকারী মহাশয়। তাই যে সংবিধানের নামে শপথ করে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছেন সেই সংবিধানকেই প্রতিদিন উপেক্ষা ও অবমাননা করে যাচ্ছেন।
মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁর প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডে অগ্রাধিকার দেখা যাচ্ছে ধর্ম ও সরকারকে এক করে ফেলা। সরকারি কাজে, প্রকল্পে, ঘোষণায়, বরাদ্দে ধর্ম, ধর্মস্থান, ধর্মাচরণ সিংহভাগ জায়গা করে নিচ্ছে। সাধারণ মানুষের রুজি-রোজগার, কাজ, জিনিসপত্রের দাম, গরিব সাধারণ মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষা, গণপরিবহণ ইত্যাদি সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলি গৌণ বা কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তৃণমূল দুর্গাপূজায় সরকারি টাকা ঢেলেছে, শুভেন্দুও ঢালবেন। অতিরিক্ত এবার রথ যাত্রাও সরকারি টাকা পেয়েছে। তারকেশ্বর যাত্রায় পূণ্যার্থীদের মাথায় লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে হেলিক্প্টার থেকে ফুল ছড়াচ্ছেন। প্রতিদিন মুখ্যমন্ত্রীর কর্মসূচির অর্ধেকই প্রায় ধর্মানুষ্ঠানকে ঘিরে। সব কর্মসূচিতে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ অবধারিতভাবে ধর্মীয় বিভাজন ও বিদ্বেষমূলক। সংখ্যালঘুদের কুৎসিতভাবে আক্রমণ তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ রাজ্যে শক্তিশালী গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়তে তাঁর মুখে কোনও কথা শোনা যায় না। একেবারে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সর্বত্র অর্ধেকের বেশি শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর পদ শূন্য। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে সারা বছরে পাঠদান বা ক্লাস নেবার জন্য বরাদ্দ সময়ের অর্ধেক সম্ভব হয় না শিক্ষকের এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর অভাবে। ফলে শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহণের মান উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস পেয়ে গেছে। একে শিক্ষক নেই, যারা আছেন তাদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে শিক্ষা বহির্ভূত সরকারি কাজে। শিক্ষকহীন একজন বা দু’জন শিক্ষক যুক্ত বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের একাংশ শিক্ষার আঙিনা থেকে চিরতরে বিদায় নিচ্ছে। আরেক অংশ বিপুল অর্থের বোঝা মাথায় নিয়ে বেসরকারি স্কুলে যাচ্ছে। কিছুদিন পর তারাও ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দেশে শিক্ষার বেসরকারিকরণে শিক্ষা বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষা গরিব মানুষের নাগাল থেকে সরে যাচ্ছে। তারপর পরীক্ষায় জালিয়াতি, প্রশ্ন ফাঁস টাকার জোরে সার্টিফিকেট কেনার রাস্তা প্রশস্ত করেছে। এসব নিয়েই আজ গোটা দেশে ছাত্র-যুব সমাজ উত্তাল। সে সব নিয়ে কোনও কথা নেই। শুভেন্দু প্রতিবাদী-বিক্ষোভকারীদের মধ্যে কেবল দেশদ্রোহী খুঁজে বেড়াচ্ছেন। নাগপুরের শিক্ষার প্রথম পাঠই হলো সরকার এবং শাসক আরএসএস-বিজেপি বিরোধীদের রাষ্ট্রবিরোধী বলে দাগানো। শুভেন্দু সেটা রপ্ত করেছেন। ছাত্র সমাজ যেখানেই সরকারের শিক্ষানীতি-দুর্নীতির বিরুদ্ধে গর্জে উঠছে সেখানেই শুভেন্দুর পুলিশ ডাইনি খোঁজার মতো দেশদ্রোহী খুঁজে বেড়াচ্ছে। অবশ্য ওটা বাহানামাত্র। আসল লক্ষ্য বামপন্থীরা। কারণ বাম ছাত্র-যুবদেরই সবচেয়ে বেশি ভয় হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্তদের। শুক্রবারের যৌবনের জোয়ার তাদের মস্তিষ্কের রক্তচাপ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই শুভেন্দু তালজ্ঞান হারিয়ে বেপরোয়া হুমকি দিচ্ছেন। মনে রাখবেন রাজ্যের অর্ধেক ভোটারও আপনাদের ভোট দেয়নি। জনসমর্থনে সরকার কিন্তু সংখ্যালঘু। ক্ষমতার দম্ভ কীভাবে ভাঙতে হয় দেশের ছাত্র-যুবরা যন্তর মন্তরে সেই বার্তাই দিচ্ছে।

Comments :0

Login to leave a comment