Gujarat Hindutva Attack on Readers

পড়া যাবে না আনা ফ্রাঙ্ক, মালালার বই! গুজরাটে বেধড়ক মারধর হিন্দুত্ববাদীদের

জাতীয়

পড়া যাবে না ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’, মালালা ইউসুফজাইয়ের ‘আমি মালালা’- এমন নিদান দিয়ে নৃশংস হামলা চালালো বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরঙ দলের গুন্ডারা। যারা বই পড়তে জড়ো হয়েছিলেন তাদের বেধড়ক মারধর করেছে আরএসএস-র দুই সংগঠনের দুষ্কৃতীরা। ঘটনাটি ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার গুজরাটের আমেদাবাদের বস্ত্রাপুর এলাকায়। আয়োজকরা সেখানে পড়ার জন্য সঙ্গে করে এনেছিলেন ভগৎ সিং, আম্বেদকর এবং নেহরুর বইও। হিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতীরা বইগুলি ছিঁড়ে ফেলেছে বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। শনিবার এই ঘটনা সামনে আসায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। 
গত ১১ আগস্ট আমেদাবাদের আনন্দ নিকেতন স্কুলের পড়ুয়াদের কিছু অভিভাবক অভিযোগ করেন একটি শিশুর খাবারের কাচের টুকরো পাওয়া গেছে। পরে একদল অভিভাবক অভিযোগ করেন যে, স্কুলে মালালা ইউসুফজাই এবং আনা ফ্রাঙ্কের বই পড়তে বাধ্য করার মাধ্যমে ধর্মীয় বৈষম্য চালানো হচ্ছে! এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্কুল একজন পাঠ্যক্রম পরামর্শদাতাকে বরখাস্ত করে। যিনি ওই স্কুলেরই প্রাক্তন পড়ুয়া। স্কুলে তিনি পাঠ্যক্রম প্রণয়নকারী এবং শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। ধর্ম পরিচয়ে তিনি মুসলিম। 
এই ঘটনার প্রতিবাদেই বেশ কিছু নাগরিক এবং স্টুডেন্টস অ্যান্ড ইউথ কালেক্টিভ আমেদাবাদ (এসওয়াইসিএ) এবং গুজরাট রিডস এনিওয়ে (জিআরএ) নামের দু’টি সংগঠন সিদ্ধান্ত নেয় ওই দু’টি বইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বইও পড়া হবে। সেই কারণেই শহরের অভিজাত এলাকা বস্ত্রাপুরের একটি পার্কে নাগরিকরা জড়ো হয়েছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল অ্যান ফ্রাঙ্কের ‘দ্য ডায়েরি অব আ ইয়ং গার্ল’ এবং মালালা ইউসুফজাইয়ের ‘আই অ্যাম মালালা’-সহ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত কিছু নির্বাচিত বই এবং স্মৃতিকথা পড়া। ওই দুই সংগঠন সচেতনভাবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, আনা ফ্রাঙ্ক এবং মালালা ইউসুফজাইয়ের বই দু’টি পড়ার। হিটলারের নাৎসী বাহিনীর অত্যাচারের বিবরণ রয়েছে ফ্রাঙ্কের ডায়েরিতে। যা ফ্যাসিবাদের বীভৎসাকে তুলে ধরে। দশকের পর দশক দুনিয়া জুড়ে অজস্র ভাষায় অনুদিত এই বই পড়েছে অসংখ্য মানুষ। পাশাপাশি ধর্মীয় মৌলবাদী তালিবানীদের হাত থেকে প্রাণে বেঁচে ফেরা পাকিস্তানের মালালার কথা রয়েছে তাঁর আত্মজীবনীতে। মৌলবাদ এবং ফ্যাসিবাদের বীভৎসা সম্পর্কে পড়তে কারা বাধা দিতে পারে তা আরও একবার স্পষ্ট এই ঘটনায়। 
বই পড়া শুরু হওয়ার আগেই ওই পার্কে ৪০-৫০ জন বজরঙ দল এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দুষ্কৃতীরা জড়ো হয়ে যায়। সেখানে যারা উপস্থিত হয়েছিলেন তাদের লাঠি-ডান্ডা দিয়ে মারতে থাকে। মহিলাদের উপরেও আক্রমণ চালায় হিন্দুত্ববাদীরা। তাদের চড়-থাপ্পর, ঘুষি মারে ভিএইচপি-বজরঙ দলের গুন্ডারা। যারা নীরবে বসে বই পড়ছিলেন, তাদের উপরে জয় শ্রীরাম স্লোগান দিয়ে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা বই পড়ুয়াদের কাশ্মীর-বিরোধী বলেও দাগিয়ে দেয়। হিংস্র বাহিনী যারা বই পড়তে এসেছিলেন তাদের বেসবলের ব্যাট, মোটা কাঠের লাঠি এবং তাদের গেরুয়া ঝান্ডার লোহার রড় দিয়ে বেপরোয়া মারধর করে। 
পার্কে বই পড়তে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের এক সদস্য জয় ঠাক্কর বলেছেন, এই হামলা পূর্বপরিকল্পিত ঘৃণা-অপরাধ এবং হামলাকারীরা বই-পড়ুয়াদের পিটিয়ে মারতে চেয়েছিল। তিন জনকে হিন্দুত্ববাদীরা টেনে নিয়ে যায়, তাদের মারধর করে। তাদের এরা পিটিয়ে মেরেই ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশ আসায় পেরে ওঠেনি। তবে পুলিশের সামনেও বই-পড়ুয়াদের মেরেছে ভিইএচপি-বজরঙ দলের লোকজন। হামলাকারীরা বই পড়তে আসা লোকজনকে উগ্রপন্থী বলেছে। ঠাক্কর বলেছেন, তারা এমন কথাও বলেছে, প্যান্ট খুলে দেখতে এরা মুসলিম কি না!
শনিবার এই ঘটনা সামনে আসার পরে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। বিজ্ঞান প্রচারক, কবি ও সমাজকর্মী গওহর রাজা বলেছেন, হিটলারের আমলের জার্মানিতে ঠিক এটাই ঘটেছিল। আমাদের চোখের সামনে ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আনন্দ নিকেতন স্কুলে লাইব্রেরিতে অ্যান ফ্রাঙ্ক, মালালা ইউসুফজাইয়ের বই রাখার জন্য কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। একজন মুসলিম পাঠ্যক্রম প্রণয়নকারীকে বরখাস্ত করেছে। এর প্রতিবাদে নাগরিকরা বই পড়ার একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিলে সেখানে আরএসএস-বিজেপি’র গুন্ডারা হামলা চালাচ্ছে। পুলিশ এফআইআর নিতে রাজি হচ্ছে না। গুজরাটের কংগ্রেস বিধায়ক জিগনেশ মেওয়ানি বলেছেন, তাদের অপরাধ কী? ‘আই অ্যাম মালালা’ এবং ‘দ্য ডায়েরি অব অ্যান ফ্রাঙ্ক’ পড়া। মালালা পড়তে চেয়েছিল বলে তালিবান তাকে গুলি করেছিল। আর এই গুন্ডারা তাঁর জীবনের গল্প পড়ার জন্য একটি পাবলিক পার্কে সাধারণ মানুষকে মারধর করেছে। একই ভয়। শিক্ষার প্রতি একই ঘৃণা। একই কাপুরুষতা। প্রথমে তারা একটি স্কুলকে এই বইগুলি বাদ দিতে বাধ্য করেছিল। এখন তারা নাগরিকদের বই পড়ার জন্য আক্রমণ করছে। মহিলাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। বইগুলি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। 
এসএফআই সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বলেছেন, ফ্যাসিস্ত হিটলারের জার্মানিতে বই পুড়িয়ে দেওয়া হত। বই আসলে স্বাধীনভাবে দেখতে, ভাবতে শেখায়। ফ্যাসিবাদীদের কাছে বই তাই আজও আতঙ্কের। আরএসএস-বিজেপি সেই কারণেই বইয়ের ওপরে, বই-পড়ুয়াদের হামলা চালাচ্ছে। সৃজন বলেন, আমেদাবাদের প্রগতিশীল মানুষ এই হামলার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন বলে আশারাখি। তিনি জানিয়েছেন, প্রয়োজনের এসআইআই-র উদ্যোগে প্রকাশ্যে এই বইগুলি পড়া হবে আমেদাবাদে।

Comments :0

Login to leave a comment