ইজরায়েল ও আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র হানায় নিহত হয়েছেন ইরানের ‘সর্বোচ্চ নেতা’ আয়তোল্লা আলি খামেইনি। রবিবার সকালে ইরানের সরকার খামেনির মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে। তাঁর মেয়ে, নাতি এবং জামাইও এই হামলায় নিহত হয়েছেন। খামেনির উপদেষ্টা আলি শামখানি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদে, মিলিটারি ব্যুরোর প্রধান মহম্মদ শিরাজি, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের প্রধান মহম্মদ পাকপোর এবং গোয়েন্দা প্রধান সালেহ আসাদিও ইজরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন।
সর্বোচ্চ নেতার ‘শাহাদতে’ ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ইরানের সাধারণ মানুষ। এদেশের সরকার ৪০ দিনের জাতীয় শোকের ঘোষণা করেছে। আয়তোল্লা হত্যার প্রতিশোধে ইজরায়েল, আমেরিকা ও তার দোসরদের কঠিন শাস্তি দেওয়ার ঘোষণা করেছে তেহরান। শনিবার রাতভর ইজরায়েলের তেল আভিভ ও হাইফা থেকে শুরু করে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার সহ বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশে ইরান ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। রবিবার সারাদিন এই হামলা অব্যাহত থেকেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দু দিন ইরান এমন বহু ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে যা আগে কখনও তাদের ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। এর মধ্যে বহু ‘হাইপারসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র থাকায় ইজরায়েল ও মার্কিন আকাশপথ প্রতিরক্ষা মাধ্যম (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) তা আটকাতে পারেনি। হামলা, পালটা হামলার এই ধারাবাহিকতায় গোটা পশ্চিম এশিয়া অঞ্চল এক দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের মুখোমুখি।
খামেনির মৃত্যুর পর, রবিবার ভোরবেলা থেকে ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত এবং বিস্তৃত। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা ইজরায়েলের একের পর এক শহর এবং পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক পরিকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ইরানের সেনা কর্তারা জোর দিয়ে বলেন, এই সমস্ত হামলা কোনও অহেতুক আগ্রাসন নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আত্মরক্ষার বাধ্যবাধকতা থেকে সংগঠিত।
জাতির উদ্দেশ্য দেওয়া প্রথম ভাষণে ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়াকে ‘বৈধ কর্তব্য’ বলে ব্যখ্যা করেন। খামেনিকে হত্যা করার মাধ্যমে ইজরায়েল ও আমেরিকা সমস্ত মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে শিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে বলে দাবি করেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের ইসলামী সাধারণতন্ত্র নিশ্চিত করবে যাতে আয়তোল্লার হত্যাকারীরা ‘তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়’। পেজেশকিয়ানের এই ঘোষণার পরেই আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সোশাল মিডিয়া পোস্টে পালটা হুমকি দিয়ে বলেন, ‘‘ইরান এইমাত্র জানিয়েছে, ওরা আজ খুব জোরালো আঘাত করতে চলেছে। ওদের আগের যে কোন আঘাতের চেয়েও তা নাকি বেশি শক্তিশালী হবে। তবে ওদের এমনটা না করাই ভালো, কারণ তা করলে আমরা পালটা এমন শক্তি দিয়ে আঘাত করব যা আগে কখন দেখা যায়নি!’’
তবে ট্রাম্পের এসব হুমকিতে কোন কাজ দেয়নি। শনিবার থেকে রবিবারের মধ্যে পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত অন্তত ২৯টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ করেছে ইরান। এই সমস্ত হামলায় অন্তত ৩ জন মার্কিন সেনা কর্মী নিহত হয়েছে। রবিবার রাতে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনে ইরান ৪টি ক্ষেপণাস্ত্র সহকারে আক্রমণ করে। এই হামলায় মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও আমেরিকা এই দাবি অস্বীকার করেছে। পাশাপাশি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে আক্রমণের জেরে ওদেশের ৩ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
অন্যদিকে ইজরায়েলের বেশ কয়েকটি বড় শহরের জনবহুল অঞ্চল ইরানের হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে। শনিবার রাতের হামলায় তেল আভিভের অন্তত ৪০টি বহুতল ধ্বংস হয়েছে। এছাড়াও জেরুজালেম, হাইফা, তিরাত কারমেল ও বেত শেমেশের নানা জনবহুল অঞ্চল পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইজরায়েলে দু’দিন ধরে ইরানের প্রতিনিয়ত হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন।
গত দু’দিন ধরে ইজরায়েলের নানা প্রান্তে ইরানের পাঠানো ক্ষেপণাস্ত্র লাগাতার ধেয়ে আসতে থাকায় প্রধান শহরগুলিতে সাইরেনের আওয়াজ বন্ধ হওয়ার নাম নেই। গত ৩৬ ঘণ্টা ধরে সাধারণ মানুষ বম্ব শেল্টারেই থাকছেন। শনিবার মধ্য রাতে হাইফা বে অঞ্চলে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায় এবং তিরাত কারমেলের এক বহুতল আবাসন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বস্ত তেল আভিভ এবং জেরুজালেমের কাছেও অসংখ্য ড্রোন আক্রমণ চালানো হয়। রবিবার ভোরে জেরুজালেমের কাছে এক বহুতল আবাসনে ইরানের ছোড়া মিসাইল আছড়ে পড়লে ৬ জন নিহত হন। এই সময়ই বেত শেমেশ শহরে আরও কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কমপক্ষে ১০ জন নিহত হন। রাত পর্যন্ত আরও অনেকের নিখোঁজ থাকার ঘটনা জানা যায়।
প্রথম দিকে অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ইজরায়েলের নিজস্ব ‘আয়রন ডোম’ এবং আমেরিকার দেওয়া ‘পেট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’ আটকে দিতে সক্ষম হয়। তবে কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই তার কার্যকারিতা কমে যায়। অতএব ইরানে নিক্ষেপ করা বহু মিসাইল ইজরায়েল তার লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়। নানা শহরে প্রভূত ক্ষতি হয়। রবিবার সারা সকাল এই সমস্ত অঞ্চলে উদ্ধারকাজ চলতে থাকে।
রবিবার আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের আরও বেশ কয়েকটি অসামরিক পরিকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। ইরানে নিহতের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। এরই মধ্যে রবিবার ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানেয়াহু সগর্বে দাবি করেছেন, গত এক দিনের মধ্যে ইরানে তারা নাকি ১২০০ বোমা ফেলেছে। বলা বাহুল্য এর মধ্যে একাধিক বোমা ইরানের মিনাব শহরের এক মেয়েদের প্রাথমিক স্কুলে ফেলা হয়। রবিবার এই ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৫০ হয়েছে। নিহতদের বেশির ভাগের বয়স পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে।
এদিন দুপুর ও সন্ধ্যায় একাধিক দফায় ইরানের বিভিন্ন শহরে অবস্থিত সামরিক স্থাপনা, কমান্ড সেন্টার ও পারমাণবিক পরিকাঠামোয় ইজরায়েল ও আমেরিকা জোরদার বিমান হামলা চালিয়েছে। ইজরায়েলী নেতারা জনসমক্ষে তাদের এই অভিযানের সাফল্য উদ্যাপন করেছেন এবং খামেনির মৃত্যুকে ইরানের বর্তমান শাসনের জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রবিবার চীন ও রাশিয়া মার্কিন–ইজরায়েলী অভিযানের কড়া নিন্দা জানিয়ে একে ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে আখ্যা দেয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের আরও অন্যান্য দেশও ইরানের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে। এর বিপরীতে ইউরোপীয় দেশগুলি— ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেন— সরাসরি নিন্দা এড়িয়ে দুই পক্ষকে সংযম দেখাতে বলেন। উলটে ইরানকেই আমেরিকা চাপিয়ে দেওয়া শর্ত মেনে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। খামেনির মৃত্যু নাকি ইরানের মানুষের জীবনে এক নতুন আশার সঞ্চার ঘটাবে বলে দাবি করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্তারা। এদিকে আমেরিকার দোসর পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ইরানের পালটা হামলার নিন্দা করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এদিন রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয়পক্ষের হামলার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে সংঘর্ষ বিরতি ও আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান। এদিকে শনিবার রাতে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে প্রতিনিধিরা এই উত্তেজনার দায়ভার নিয়ে তীব্র বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। ইরানি কূটনীতিকরা আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দাবি করেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিনিধিরা তাদের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে দাবি করেন।
Iran-Israel
খামেইনির হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইজরায়েলে মিসাইল-বৃষ্টি ইরানের
×
Comments :0