পূজা বসু ও অরিজিৎ মণ্ডল: উত্তরপাড়া
প্রচার হচ্ছে কোন্নগরের কানাইপুরের বারোয়ারিতলায়। প্রতিদিনের মতো। সকাল থেকে দুপুর প্রার্থী পৌঁচ্ছাচ্ছেন ঘরে ঘরে। পিছনে লালঝাণ্ডার সারি। আর তাঁর সঙ্কে কথা বলতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন বাসিন্দারা।
কেন্দ্রের নাম উত্তরপাড়া। প্রার্থীর নাম মীনাক্ষী মুখার্জি। নির্বাচন বলে নয়, সারা বছর জনতার যন্ত্রণা নিয়ে প্রতিবাদে শামিল লালঝান্ডার নেত্রী প্রচারে বার্তা দিচ্ছেন লড়াইয়েরই।
বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী বলেছেন লড়াইয়েরই হবে একজোটে। বলেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিকল্প বামপন্থাই। বলেছেন, রাজ্যের বিধানসভার দিকে তাকিয়ে দেখুন, স্পষ্ট বুঝবেন কেন দরকার বামপন্থীদের। বামপন্থার পুনরুত্থানের বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে প্রচারে।
বিধানসভা নির্বাচনের আর খুব বেশি দিন বাকি নেই, ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলি তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করছে। শুক্রবার উত্তরপাড়ায় বারোয়ারিতলা বাজার থেকে প্রচার শুরু হয়। তারপর মীনাক্ষী পৌঁছে যান ওই এলাকারই ঘরে ঘরে। মধ্যবিত্ত বাড়ি থেকে কলোনি, বস্তি এলাকায়। সেখানকার যুবক, মহিলাদের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি, বাজার এলাকার বিভিন্ন দোকান ব্যবসায়ীর সঙ্গেও কথা বলেন।
মহিলাই নিজেদের সমস্যার কথা বললেন তাঁকে। কেউ কেউ গলায় পরিয়ে দেন রজনীগন্ধার মালা, কেউ উপহার হিসেবে দেন চকলেট। আবার কেউ রোদে কষ্ট হবে বলে হাতে দেন দইয়ের ভাঁড়। মীনাক্ষী মুখার্জিকে প্রার্থী হিসাবে পেয়ে এলাকার সকলে আশাবাদী। যন্ত্রণার কথা শোনার মতো কেউ একজন এলেন প্রার্থী হয়েছেন।
তেমনই একজন চক্রবর্তী পাড়ার বাসিন্দা শ্যামলী নস্কর। তিনি বললেন, ‘‘আগেরবার এই অঞ্চলের ভোটে জিতে বিধায়ক হন তৃণমূল কংগ্রেসের কাঞ্চন মল্লিক, তাকে তো কোনদিন চোখেই দেখিনি কিভাবে জানাবো আমাদের সমস্যার কথা। এলাকার নিকাশি ব্যবস্থা ভালো নয়, বৃষ্টি হলেই জল জমে যায় রাস্তায়। বেশ কয়েকবার বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করার পর রাস্তার কিছু কাজ হয়েছে ঠিকই, তবে যেদিন কাজ শেষ হয়েছে তারপরের দিনই পিচ বেরিয়ে গেছে এদিকে ওদিকে। পাশাপাশি ড্রেনের জমা জলে মশার বড় উপদ্রব। ফলে প্রতি বর্ষায় ডেঙ্গু ম্যালেরিয়ার প্রভাব বাড়ে এলাকায়। সেইসঙ্গে, এলাকার মাতৃসদন, স্বাস্থ্যসদনের মতো স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থাও তথৈবচ। তাই সাধারণ টিটেনাস নিতে হলেও ছুটতে হয় বেসরকারি হাসপাতালে।’’
প্রিয় মীনাক্ষীদির সঙ্গে পরিচিত হতে এসেছিল রাজদীপ ঘোষ নামে ক্লাস টুয়েলভে পড়া এক ছাত্রও। ওই এলাকার কাছের নবগ্রাম বিদ্যাপীঠের ছাত্র সে। সে বলল, ‘‘কয়েক বছর ধরে খোলাই হয় না তাদের স্কুলের লাইব্রেরি, ধুলো পড়ে নষ্ট হচ্ছে বহু বই। নিচের ক্লাসের ভাই বোনেদের মিড ডে মিলের যে খাবার দেওয়া হয় তা মোটেই ভালো নয়। ডিম সোয়াবিনের মত প্রোটিন জাতীয় খাবার থাকে না বললেই চলে। পাশাপাশি সরকারি স্কুল হলেও ফি বাবদ নেয়া হতো অনেকটা টাকাই, পরে এসএফআই গোটা ব্যাপারটা জানতে পেরে ওই স্কুলের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তারপরেই কিছুটা কমানো হয়েছে ওই বর্ধিত ফি।‘‘
ওই এলাকার বাসিন্দা পুলক লাহিড়ীর সঙ্গে কথা হলো। তিনি বললেন, ‘‘বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে নাট্যকার সফদার হাসমির স্মৃতিতে সাংস্কৃতিক মঞ্চ হয়েছিল। আর তৃণমূলের জামানায় ওই সাংস্কৃতিক মঞ্চগুলিকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বিজেপি-তৃণমূল মিলে এলাকার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ধ্বংস করে দিতে চাইছে।’’
আরেকদিকে বিজেপি এবং আরএসএস বিভিন্ন রকম নাম সংকীর্তনের নাম করে লোক জড়ো করছে। কিন্তু সমন্বয়ের ঐতিহ্য ভেঙে দিতে ঢালছে বিভাজনের বিষ। স্থানীয়রা বলেছেন যে বামফ্রন্ট যখন পঞ্চায়েত নির্বাচনে জিতেছিল তখন এলাকা জুড়ে সন্ত্রাস চালিয়েছে তৃণমূল-বিজেপি।
এবার তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে প্রার্থী দলের সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জির পুত্র। পুলক লাহিড়ীর মতো বাসিন্দা অনেকেই বলছেন যে কল্যাণ ব্যানার্জি দুর্ব্যবহারের বহু ঘটনা কারও অজানা নয়।
অমিত ব্যানার্জি এবং পারমিতা ঘোষের মতো স্থানীয়েরা বলছেন সাংসদপুত্রকে ঘিরেও এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার নয়।
পারমিতা ঘোষ বললেন, ‘‘আমাদের এখানকার মেয়েদের সুরক্ষা নেই। কিছুদিন আগেই এই এলাকার এক প্রতিবন্ধী মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে কি ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার? পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় তো পার্টি অফিসের সামনে একজনকে খুনও করে তৃনমূলের গুন্ডারা। সেই সঙ্গে, আরএসএস'ও নাম সংকীর্তনের নাম করে মহিলাদের বিভিন্ন রকম ভাবে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করে। তবে আমরা এই এলাকার মহিলারা বলছি, আমরা আর কারোর ভুল কথায় ভুলব না। বরঞ্চ আমাদের দুঃখ দুর্দশা যে ঘোচাতে পারবে তাকেই ভোট দেব।’’
Comments :0