একেই সম্ভবত বলে ‘পীরিতির বড় জ্বালা’। ক্ষমতা হারানোর ভয় মনের গভীরে এতটাই জাঁকিয়ে বসেছে যে শয়নে-স্বপনে জেন-জি ভজনাই এখন মোক্ষলাভের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ ইঞ্চি বিশ্বগুরুর। শুধু নিজে শিং ভেঙে বাছুরের দলে ভেড়ার জন্য প্রাণপাত করছেন না অন্য মন্ত্রী-নেতাদের বলছেন তাঁকে অনুসরণ করতে। মোবাইলে সোশাল মিডিয়ার নানা প্ল্যাটফর্মে যেখানে প্রধানত অল্প বয়সিরা থাকে সেখানে অ্যাকাউন্ট খুলে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বলেছেন। তরুণ প্রজন্ম সাধারণভাবে বেশি রাতের দিকেই সোশাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকে। তাই বৃদ্ধ বিশ্বগুরু মাঝ রাতে ঘুম তাড়িয়ে বসে পড়ছেন ক্যামেরা হাতে। ফ্রন্ট ক্যামেরা নিজের মুখের দিকে তাক করে হাঁক দিচ্ছেন ‘ফ্রেন্ডস’ বলে। সত্যিই এক মজার ব্যাপার। এই নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় রঙ্গ-রসিকতায় ভরে গেলেও বিশ্বগুরুর সেদিকে নজর নেই। ৭৮ বছর বয়সে ১৮ বছর বয়সির ‘ফ্রেন্ডস’ তিনি হবেনই। সত্যিই ভোট বড় দায়।
গত ১২ বছর ধরে দিল্লির গদি দখলে রেখে একটার পর একটা রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিন চালু হলেও কোনও দিন তরুণ প্রজন্ম জেন-জি-দের কথা মনে হয়নি। হিন্দুত্বের অন্ধ ভক্তির পিটুলি গোলাই ছিল নতুন প্রজন্মের জন্য একমাত্র মহৌষধ। কোনও দিন শোনার বা বোঝার চেষ্টা হয়নি ছাত্র-যুবদের মনের কথা, তাদের স্বপ্নের কথা, যন্ত্রণার কথা, সমস্যার কথা, প্রতিনিয়ত স্বপ্নের সমাধি হবার কথা। সঙ্ঘ পরিবারের ছত্রছায়ায় কখনও বজরঙ দল, কখনও ভিএইচপি, কখনও গোরক্ষক, কখনও গেরুয়া ঠিকাদার রূপে তাদের উন্মাদনায় ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা হতো। দেশজুড়ে ধর্মের নামে, হিন্দু ভাবাবেগের নামে মস্তানি, দাদাগিরি, গুন্ডামির কাজে লেলিয়ে দেওয়া হতো এদের। মুসলিম, আদিবাসী, দলিতদের উপর অত্যাচারের পেছনেও থাকত এই বাহিনী। অর্থাৎ ধর্মান্ধার গোলোক ধাঁধার মধ্যে ঢুকিয়ে দেশের যুব সমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবার চেষ্টা হয়েছে। ভাবা হয়নি এদের জন্য আধুনিক উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার কথা, উপযুক্ত কর্মসংস্থানের কথা। আগামীর ভারত গড়ার যারা কারিগর তাদের এভাবে অযোগ্য অক্ষম রেখে এক সর্বনাশা ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবার ব্যবস্থা হয়েছে।
এই গোটা চালচিত্রটাই নিমেষে বদলে যায় দিল্লির যন্তর মন্তরে নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদের জেরে। প্রশ্নপত্র ফাঁসকে ঘিরে আন্দোলন দানা বাঁধলে ক্রমশ সামনে এসে যায় দেশের যুব সমাজের স্বপ্ন এবং স্বপ্ন ভঙ্গের বিস্তৃত পরিসর। আন্দোলন শুধু দানা বাঁধেনি ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। জেদি ও তেজি আন্দোলন বাধ্য করে ৫৬ ইঞ্চিকে ১৬ করতে।
এরপরই মোদী-ভাগবতরা বুঝে যায় হাওয়া প্রবলভাবে ঘুরছে উলটো দিকে। সাধের উন্নত ভারত আর হিন্দু রাষ্ট্রের সমাধি হবে এই জেন-জি’র হাতেই। তাই শিং ভেঙে বাছুরদের দলে ঢুকে তরুণের মন পেতে মরিয়া যেমন মোদী তেমনি ভাগবতও। তরুণদের কায়দা-কানুন রপ্ত করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সভা করে তরুণদের মন পেতে চাইছেন। কিন্তু এভাবে ভঙ্গি দিয়ে তরুণদের ভোলানো যাবে না। ফ্রেন্ডস বলে শুধু মুখে চিঁড়ে ভিজবে না। জবাব দিতে হবে বছরে দু’কোটি চাকরি কোথায় গেল? কেন দেশময় কাজের হাহাকার? কেন নামমাত্র বেতনে কাজ করতে হয় উচ্চ শিক্ষিত দক্ষ যুবক-যুবতীদের? কেন লক্ষ স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে? কেন শিক্ষার পরিকাঠামো অত্যন্ত নিম্নমানের। শিক্ষার বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ গরিব ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ কেন কেড়ে নিচ্ছে! কেন শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ কমে যাচ্ছে। আগে সব ছেলে-মেয়ের উন্নতমানের শিক্ষা ব্যবস্থা হোক, তাদের কাজের ব্যবস্থা হোক, তারপর নতুন প্রজন্ম ফ্রেন্ডস ডাকে সাড়া দেবে কিনা ঠিক করবে।
Modi and Gen Z
ফ্রেন্ডসরা সাড়া দিচ্ছে না
×
Comments :0