কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীন জাতীয় গুরুত্ব সম্পন্ন ২৮টি হাসপাতালে ২৩ হাজারেরও বেশি অনুমোদিত পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য হয়ে পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে দেশের অন্যতম প্রধান রেফারেল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান দিল্লির ‘এইমস’-এই ২৯২১টি শূন্যপদ রয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতির জেরে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং রোগীদের চিকিৎসা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সিপিআই(এম) সাংসদ ভি শিবদাসন।
রাজ্যসভায় শিবদাসনের প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অনুপ্রিয়া প্যাটেল এই তথ্য জানিয়েছেন। শিবদাসনের বক্তব্য, হাসপাতালের বেড সংখ্যা ও রোগীর চাপ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতাই এই বিপুল শূন্যপদের অন্যতম কারণ।
২০২৬-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দিল্লি এইমস’এ অনুমোদিত ১৩১৩টি ফ্যাকাল্টি পদের মধ্যে মাত্র ৮৭৩ জন কর্মরত রয়েছেন। অর্থাৎ ৪৪০টি পদ খালি, যা মোট অনুমোদিত ফ্যাকাল্টি পদের প্রায় ৩৪ শতাংশ, অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ। নন-টিচিং বিভাগেও একই ছবি। অনুমোদিত ১৩,৯১৩টি পদের মধ্যে পূরণ হয়েছে ১১,৪৩২টি। ফলে ২৪৮১টি পদ খালি, যা মোট পদের প্রায় ১৮ শতাংশ। ফ্যাকাল্টি ও নন-ফ্যাকাল্টি দুই বিভাগ মিলিয়ে দিল্লি এইমস-এই মোট ২৯২১টি পদ খালি।
প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য সুরক্ষা যোজনা (পিএমএসএসওয়াই)-র আওতায় থাকা দেশের ১৮টি এইমস-এ ২০২৫-২৬ সালে মোট ১৩,৮০৯টি শয্যা চালু রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি এইমস-এ গড়ে প্রায় ৭৬৭টি শয্যা। তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে চিকিৎসা পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও বড় বৈষম্য রয়েছে। এইমস ভোপালে ১২৭১টি, পাটনায় ১২৪০টি, যোধপুরে ১১৭৭টি এবং ভুবনেশ্বরে ১০২৮টি শয্যা চালু রয়েছে। অন্যদিকে বিবিনগরে মাত্র ২০০টি, রাজকোটে ২৮৮টি, দেওঘরে ৩৮০টি, বিজয়পুরে ৪৫০টি এবং গুয়াহাটিতে ৪৫৭টি শয্যা চালু রয়েছে।
দিল্লি এইমস বাদ দিয়ে পিএমএসএসওয়াই-র আওতাধীন ১৮টি এইমস-এ অনুমোদিত ৪৮০৮টি ফ্যাকাল্টি পদের মধ্যে পূরণ হয়েছে মাত্র ৩১৭১টি। ফলে ১৬৩৭টি পদ এখনও শূন্য, অর্থাৎ প্রায় ৩৪ শতাংশ ফ্যাকাল্টি পদে কোনও নিয়োগ হয়নি। কিছু প্রতিষ্ঠানে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এইমস রাজকোটে অনুমোদিত ১৮৩টি ফ্যাকাল্টি পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ৯৪ জন। গুয়াহাটিতে ১৮৩টির মধ্যে ১১৯টি, বিলাসপুরে ২১৭টির মধ্যে ১৩৯টি এবং গোরক্ষপুরে ২১৩টির মধ্যে মাত্র ১২১টি পদ পূরণ হয়েছে।
শিবদাসনের অভিযোগ, এইমস-র মতো প্রতিষ্ঠানে ফ্যাকাল্টির ঘাটতি শুধুমাত্র চিকিৎসা শিক্ষার সমস্যা নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশেষজ্ঞ ও সুপার-স্পেশালিটি চিকিৎসা, ক্লিনিক্যাল পরিষেবা, চিকিৎসা শিক্ষা এবং গবেষণার উপর। শূন্যপদের সমস্যা শুধু এইমস-এ সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানেও বিপুল সংখ্যক পদ খালি রয়েছে।
পিজিএমইআর চণ্ডীগড়ে ১৯৩৬টি, জেআইপিএমইআর পুদুচেরিতে ১২২৩টি, সফদরজঙ হাসপাতালে ১১৭৯টি, আরআইএমএস ইম্ফলে ৫৯৯টি, নিমহ্যান্স বেঙ্গালুরুতে ৫০৭টি, রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে ৪৬৯টি এবং শিলঙের এনইআই গিআরআই এইচএমএস-এ ৩৮৬টি শূন্যপদ রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করে। জেআইপিএমইআর-এ ২২৮০টি, পিজিএমইআর চণ্ডীগড়ে ১৯৫৮টি, সফদরজঙ হাসপাতালে ২৯৯৫টি, রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে ১৮০০টি এবং নিমহ্যান্স-এ ১০৯৬টি বেড রয়েছে।
শিবদাসনের অভিযোগ, সরকার একদিকে প্রয়োজনীয় স্থায়ী পদে নিয়োগ করছে না, অন্যদিকে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত স্থায়ী পদের সংখ্যাই কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ ও তার অধীনস্ত হাসপাতালগুলিতে অনুমোদিত স্থায়ী পদের সংখ্যা ২০২৩-২৪ সালে ৩৩৮৭ থেকে কমে ২০২৫-২৬ সালে ২৮৪১ হয়েছে। অর্থাৎ ৫৪৬টি স্থায়ী পদ কমেছে। রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে ২০২১-২২ সালে অনুমোদিত স্থায়ী পদ ছিল ৪০৯৩টি। ২০২৫-২৬ সালে তা কমে হয়েছে ৩১৫২টি। পাঁচ বছরে ৯৪১টি স্থায়ী পদ কমেছে।
অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে বেড়েছে। ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টিউবারকলোসিস অ্যান্ড রেসপিরেটরি ডিজিসেস’-এ চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা ২০২১-২২ সালে ২৫৯ থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ সালে ৩১১ হয়েছে। আরআইএমএস ইম্ফলে ৩৬৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪০৪ এবং জেআইপিএমইআর-এ ২০২২ সালের ৮২ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ১২০। শিবদাসনের অভিযোগ, স্থায়ী কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের উপর নির্ভর করেই কেন্দ্রীয় সরকার স্বাস্থ্য পরিষেবা চালানোর চেষ্টা করছে।
শিবদাসন বলেন, স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না করার পাশাপাশি কেন্দ্রের এই নীতির পরিবর্তন প্রয়োজন। নতুন হাসপাতাল ভবন তৈরি বা বেড সংখ্যা বাড়ানোর ঘোষণা করলেই স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়ন হয় না। সেই পরিকাঠামোকে কার্যকর করার জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগও জরুরি। রোগীদের সময়মতো এবং মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, নার্স, প্যারা-মেডিক্যাল কর্মী, টেকনিশিয়ান এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মীর সমস্ত শূন্যপদ পূরণ করতে হবে। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করে বেসরকারি হাসপাতাল ব্যবসাকে সুবিধা দেওয়া উচিত নয়।
হাসপাতালের বেড সংখ্যা, রোগীর চাপ এবং চিকিৎসার চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় স্থায়ী পদ নতুন করে তৈরি করতে হবে এবং বর্তমানে খালি থাকা সমস্ত পদ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পূরণ করতে হবে। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সিপিআই(এম) সাংসদ দাবি করেছেন। শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য শুধু পরিকাঠামো নয়, পর্যাপ্ত ও স্থায়ী মানবসম্পদ নিশ্চিত করাও কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
AIIMS Vacant Posts
এইমস দিল্লিতেই এক-তৃতীয়াংশ পদ খালি
×
Comments :0