STORY — MAYURI MITRA — RAJA RANI DABA KHELE — MUKTADHARA — 1 MARCH 2026, 3rd YEAR

গল্প — ময়ূরী মিত্র — রাজা রানি দাবা খেলে — মুক্তধারা — ১ মার্চ ২০২৫, বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

STORY  MAYURI MITRA  RAJA RANI DABA KHELE  MUKTADHARA  1 MARCH 2026 3rd YEAR

 

গল্প  


মুক্তধারা

  -------------------------------------------- 
   রাজা রানি দাবা খেলে
  -------------------------------------------- 

 

ময়ূরী মিত্র

 



বেলা এগারোটা নাগাদ যখন নলিনীদিদি এল আতা তাকে দুটি ডিমসেদ্ধ খেতে দিল ৷ আসলে নলিনীদিদি ডিম খুব ভালোবাসে ৷ মায়ের কাছ থেকে আতা তাই সকালেই ডিমসেদ্ধ নিয়ে নিয়েছে ৷ কেউ এলে নিঃশ্বাসটুকু পর্যন্ত না নিতে দিয়ে অতিথিকে খাবারের প্লেট এগিয়ে দেওয়াটাই আতার স্বভাব ৷ ঠাকুমার কাছে শুনে শুনে আতা শিখে গিয়েছে অতিথি নারায়ণ ৷ নারায়ণরা আতার কাছে এলেই খুব পেটুক হয়ে যায় ৷ ঝন্টু , বিমলি , কেশর , ননী , ফণী , নলিনীদিদি সবকটা ৷ তবে পনেরো বছরের আতার কাছে উনিশ বছরের নলিনীদিদি খুব স্পেশাল নারায়ণ ৷


--খাও নলিনীদিদি ৷ ফের গরম করেছি ডিমসেদ্ধ দুটোকে ! খেয়ে কথা বল ৷ নুনের পাশে গোলমরিচ গুঁড়ো করে দেব ?


বলেই মাথা চুলকে নিল আতা ৷ এই রে ! কোথ থেকে গোলমরিচ গুঁড়ো করবে সে ! ছুটির দিন বলে মা আজ দেরি করেই রান্না বসিয়েছে ৷ পাঁচপদ রান্নাও হবে ৷ আতার দাদা শুভেন্দু কাল বাড়ি ফিরেই নানা রকম মাছ রান্নার অর্ডার দিয়েছে ৷ আর দাদা বলা মানেই মা সেগুলো গুণে গুণে করবেনই ৷ সকালে উঠেই বাবাকে বাজারের থলে ধরিয়েছেন ৷ পার্ষে , পাবদা , ডিম ভরা তোপসে ৷ ধুস ৷ একটা মাছও আতার পছন্দ না ৷  বিকট দাম সবকটার ৷ কিন্তু মা কি তা বুঝবে ! বাবাকে লুকোবে আর একপিস দুপিস  হলেও কিনবে ৷ মামার বাড়িটা আতার বড়লোক আছে ৷ তাদের টাকা আর দাদার  অর্ডার !  মায়ের খুন্তি নড়বে বিরামহীন ! আজো দেখ ! কী আওয়াজ ! খুন্তির আওয়াজে ফেটে যাচ্ছে রান্নাঘরের টিনের চাল ৷ চোখ বুঁজে মায়ের ঘাম হলুদে ভরা হাতদুটো মনে পড়ল আতার ৷ যদিও খুব মুছিয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল মায়ের হাত কিন্তু এখন ওসব করতে গেলে পিঠে দড়াম হবে শিওর ৷


- আনবি বলে আনছিস না কেন রে গোলমরিচ !


আতা চমকে উঠল ৷ নলিনীদি নাকের ডগায়

সেদ্ধ ডিমের প্লেট নাচ্চাচ্ছে ৷


- আজ এমনি খেয়ে নাও গো দিদি ৷ আজ রাতেই

গুঁড়ো সরাব ৷ পুরোনো পেন্সিলবাক্স আছে ,ওতে রেখে দেব ৷ পরদিন থেকে মরিচ মাখা কালো ডিম খাবে এখন ৷


- আতার বাড়াবাড়ি রকম হাসি দেখে গা জ্বলল

নলিনীর ৷ একে তো সামান্য গোলমরিচ এনে দিতে পারল না ! তারপর হ্যা হ্যা হাসি হাসছে !  দিয়েছে দুটো সেদ্ধ ডিম ,  তাও দেখো গরিব লোকের মতো কেমন পোলট্রির ডিম ধরিয়েছে ! গরিব আছিস বাপু ! তা গরিবই থাক না কেন ! কেউ তো বাধা দিচ্ছে না ! তা না খালি বড় বড় কথা !


-ও নলিনীদিদি , এস না গো ...তুমি এলে বাগানের সজনে ফুল হাসে ৷ আমার দাদার চোখে সূর্য আসে ৷ এস রবিবার করে ৷ কী খাবে বল।আমার ঠাকুমা বলত , অতিথি নারায়ণ ৷ সে যা খেতে চায় তাই আসন পেতে খাওয়াতে হয় !


আর এখন দেখো মরিচহীন পোল্ট্রি গিলতে গিয়ে গলায় আটকাচ্ছে ! মরিচ নুনে জিভে জল আসে ৷ ডিমের কুসুম লেই হয় ৷ কে বোঝাবে বোকা আতাকে !


-এই আতা জল দে শিগগির ! ন্যাকামি করে বাড়ি ডাকিস ! খাবারের সঙ্গে জল দিতে হয় জানিস না ?

কাচের গ্লাসে আন ৷ যা ...৷ ধুয়ে নিবি ৷ বড্ড নোংরা তোদের গ্লাস ৷ কাচ দিয়ে নিচের ময়লা যদি দেখি আজ ....!


তাহলে ওর বিনুনিটা টেনে খুলে দিবি নলিনী ৷

- দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল শুভেন্দু ৷ কলকাতায় পড়ে ৷ শনিবার করে বাড়ি আসে ৷ রবিবার সকাল থেকে নলিনী আতার সঙ্গে ক্যারাম খেলে ৷ দুপুরে মায়ের পাঁচরান্না খেয়ে পেছনের রাজার বাড়ির দালানে বসে সেতার বাজায় ৷ একটি মাত্তর ল্যাম্প দোলে ৷ বাজাবার সময় দাদার মুখ না দেখে কী যে অস্বস্তি হয় আতার !


বেণীতে টান পড়ল ৷ আতা জানে দাদা এবার বেণী নিয়ে লেচি পাকাবে ৷


-- দাদা ছাড় ৷ বৈকালে  দুধভর্তি চা পাবে না কিন্তু  !আতা চোখ পাকাল ৷


গলায় ডিম নিয়ে  হেসে ফেলল নলিনী -


ঠিক বলেছ শুভেন্দুদা ৷ জানো , গতহপ্তাতেও ও দু বেণী করে স্কুলে গেছে ৷ আজ এসে দেখছি ,ওমা !

একবেণী করে ফুল গুঁজেছে ৷ কী ফুল রে ! ধুতরা না ঘেঁটু ?  

-


আতা দেখল  নলিনীদিদির পদ্মচোখ গোক্ষুর হয়ে গেছে ৷ গোক্ষুরের চোখ কতবার বাগানে  দেখেছে !  আতা হাঁ করে চেয়ে আছে  ৷ কুসুম গলায় আটকে এতক্ষণ তো  বেশ কষ্টই হচ্ছিল নলিনীদিদির ! শরীরের কষ্টে চোখের দৃষ্টি এমন করে  বদলাল কখন !


জল দিয়ে  ধীরে ধীরে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় ৷ আজ আর নলিনীদিদির সঙ্গে কথাগুলো বলা হল না ৷ কবে বলবে ! এবার ভাইফোঁটায় তারা দুজন একসঙ্গে দাদাকে ভালো কিছু গিফট করবে ঠিক করেছে ৷ নলিনীদিদি নিতে না চাইলেও সে দামের অর্ধেকটাই দেবে ৷ মাসি এবার পুজোয় জামা না দিয়ে টাকা দিয়েছে ! সেই টাকা মায়ের কাছে জমা রেখেছে আতা ৷ কিন্তু গিফটটা ঠিক করতে হবে তো ! নলিনীদিদির কি কোনো ভ্রূক্ষেপ আছে ৷ দাদা নাহয় কিছু জানে না ৷ একটা ছুটির দিন  এসে বাড়ি  বাগান সব কথায় ভরিয়ে দিচ্ছে ! কিন্তু তুমি নলিনীদিদি ! তুমি সব ভুলে , এমনকি বিষমটাও ভুলে এখন গল্পে মেতেছ ! পুজো এসে যাচ্ছে ৷

মফস্বলের দোকানে ভালো জিনিস আগে অর্ডার দিতে হয় ! লক্ষ্মীপুজো অব্দি হয়ত দোকানগুলো বন্ধ থাকবে ! তাহলে তো অর্ডার দু একদিনের মধ্যে দিতে হবে ! নাহ ! এখন রাগ করলে চলবে না ৷


--ও নলিনীদিদি ৷ আজ কী বলবে বলেছিলে ...?


ওদের হাসির শব্দ নিজের কথা নিজের কানে পৌঁছল না ৷


শরতের রোদ চড়েছে ৷

ঠাকুমা বলতেন -আতামণি  ও আমার আধমনি আতামণি , শরতের রোদ অত

হাঁ করে দেখোনি বাপু ! ও রোদে চোখ কানা হয়ে যাবে গো মণি !


ঠাকুমার  অনেক কথাই বুঝত না আতা ৷ কখনো ননী ফণী কখনো নলিনীদিদির সঙ্গে খেলার টানে বুঝতে হয়ত চাইতও না ৷ তারই মাঝে কোনো কোনো দিন আতার হয়ত পাকামি  করতে ইচ্ছে করত !


- কেন গো ঠাকমা ? সবাই যে বলে , আলো দেখলে চোখ ভালো থাকে ৷ তোমার যত উল্টোপাল্টা কথা !


সুধাময়ী হাসতেন ৷ আতার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কী যেন বলতেন ! কী যেন ....


নাহ আর কিচ্ছু মনে পড়ছে না আতার ৷ ঠাকুমা গেছে পাঁচবছর ৷ পনেরো বছরে দশবছরের কথা আলাদা ভাবে কিছুতে মনে করতে পারে না আতা ! চোখের জল মুছতে গিয়ে আতা দেখল , পরিমাণ

অল্প ৷ মাত্তর দু ফোঁটা দু কোলে জমেছিল ৷ কার কথায় ,তা ঠিক ধরতে পারল না আতা ৷


যাক ৷ লাইনারটা গলবে না তাহলে ৷

পুজোর জন্য কিনেছে ৷ আজ একটু টেস্ট করার জন্য চোখে লাগিয়েছিল ৷ মা কিনে দিয়েছে ৷

সস্তার লাইনার ৷ ওয়াটার প্রুফ নয় ৷



সপ্তমীর চাঁদে  দ্রুত পা  ফেলছে আতা ৷  গৌরী পিসির পুজোর শাড়িটা পৌঁছে দিতে হবে ৷ এবার পিসির শাড়িটা খুব সস্তার কিনেছে চিন্ময় ৷ টাকার খুব টান ৷ কোভিডের সময় থেকে ফুলওয়ালাদের বাজার সেই যে ডাউন হওয়া শুরু হয়েছে আর বাড়েনি ৷ বাজারে চিন্ময়ের ফুলের দোকান এখন ননী ফণীর বাবা  ভাড়া নিয়ে মুদির জিনিসপত্তর রাখে ৷ মাঝে মাঝে পুরোনো মুদিদের সঙ্গে দেদার ঝগড়া করে ননী ফণীর বাবা হরেনকা ৷ চাকরি হারিয়ে হরেনকা এখন মুদি হতে মরীয়া ৷ আতা সেদিন বন্ধুদের খাওয়াবে বলে সত্তরটাকার একটা সেলিব্রেশন কিনতে গিয়েছিল ৷ হাতে পঞ্চাশ মতো ছিল ৷ দিল না হরেনকা ৷ আতা পটানোর  শেষ চেষ্টা করেছিল -


ননী ফণীকেও দেব কাকা ৷ নাহয় ওদের দুটুকরো করে দেব ৷ দাও না ! কুড়ি টাকা পরে দেব , প্রমিস ৷  বাবা দিয়ে দেবে ৷


খিঁচিয়ে উঠেছিল ননী ফণীর বাবা -

যা যা তোর বাবা দুটো মেয়েমানুষ নিয়ে এখন কাক হয়ে গেছে ৷ এর ওর খুবলে সংসার চালায় ৷ তোর ক্যাডবেরির দাম যোগাতে ওর হাফপ্যান্ট হলদে হয়ে যাবে ৷


ফণী পাশে ছিল ৷ বাবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিচ্ছিরি করে হাসল -


চ চ আতামণি ৷ স্টেশনের দোকানের লজেন্স কিনি চ ৷  বা চ দত্তপুকুর যাই ট্রেনে ৷ ট্রেনের লজেন্স খেতে খেতে ৷


ফণীর গালে দুটো চড় মেরে  চলে এসেছিল আতা ৷ ফণীর হাসি তখনো কানে ৷ ছেলেটা জানে ,বাবার

নিন্দে শুনলেই আতার কান লাল হয় ৷ তবু খেপাবে ! গৌরী পিসি আর বাবাকে নিয়ে খেপাবে ! নলিনীদিদি আর দাদাকে নিয়ে খেপাবে ৷ কতবার আতা বলেছে -

ফণী শান্ত হয়ে দাদার সেতার শোন একদিন ৷ দেখবি অঙ্কে মন বসবে ৷


ফণীর সেই এক কথা !

- কেন তোমার নলিনীদিদি তো শোনে ! হ্যাঁ রে আতা তোর দাদা ইচ্ছে করে পেছনের বারান্দার লাইটটা কম পাওয়ারের করে রেখেছে ! তাই না ? আরে বল না ! হাঁদু একদম ! বল না ! আমি তো তোর ক্লোজ !


বার বার চড় খায় ফণী ৷ আর বারবার ফণীর হাসি

জমা হয় আতার কানে !


আতা কাঁদে !


- ফণী তোর এই হাসি কানে নিতে পারি না ৷


ফণী শয়তান ৷ হেসেই যায় -

গাছের খোল  ভরে দেব এবার কানে ৷


মনে হতে হেসে ফেলল আতা !

ছেলেটা নোংরা হলেও স্ট্রেন্থ আছে বেশ ৷

নাহ ! গাছের মতো শক্ত হতেই হবে  আতাকে !


এই যে বাবা বাঁধা মেয়েমানুষের পুজোর বাজার

আতার হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিল , সে নরম বলেই না ! যে মাসে  পিসির খরচ দিতে দেরি হবে কি টাকাটা কম হয়ে যাবে , আতা যা ...আতা এবারটুকু যা !


সুধাময়ীর চিন্ময় গৌরী রাখা শুরু করেছিল মা চলে যাবার পর ৷  গৌরীর পুরু ঠোঁট , কড়া চোখ , লিকারের মতো গায়ের রঙ হঠাৎ খুব টেনেছিল ৷ সেই থেকে গৌরীর ঘরের ভাড়ার অর্ধেক দেয় , শাড়ি ব্লাউজ ব্রা প্যান্টি কিছু কিছু  কিনে দেয় আর চোদ্দবার গৌরী গৌরী করে ডাকে ৷  গৌরী চিন্ময়ের ব্যাপারে খুব আত্মবিশ্বাসী ৷ সে জানে দাম্পত্যকে সতেরো বছর ধরে পুরোনো করে যে তার কাছে এসেছে , সে থেকে যাবে ৷ পুরো অনন্ত না হলেও , কিছুদিনের মতো অনন্ত সে হবেই ৷  চিন্ময় চারবার ডাকে ,  গৌরীর উত্তর একবার ৷

 

হি হি হি ...


সপ্তমীর অল্প চাঁদ রাস্তায় ছড়িয়েছে ৷ তার মধ্যেই হাসতে লাগল আতা ৷


গৌরীর বারান্দায় ঘরের আলো পড়েছে ৷ বসে বসে চা খাচ্ছিল গৌরী ৷ টোস্ট বিস্কুটের কুড়কুড় আওয়াজ ৷ আতাকে অফার করেছিল ৷ আতা নো

করে দিয়েছে ৷ বাবার বান্ধবীর সঙ্গে চা খাওয়া বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে ! মায়ের  চেপে থাকা ঠোঁট খালি চোখে ভাসে ! সবথেকে ভয় ফণী !  আর কেউ কিছু না বলুক , ফণী নেবে একহাত ! ওর দাদাটা যেমন শান্ত ফণীটা তেমনি পাকু !


--পিসি , শাড়িতে ফলস লাগিয়ে দিয়েছি ৷ তাই সপ্তমী হয়ে গেল গো ! বাবা সেই কবে থেকে বলছে ,যা আতা দিয়ে আয় ৷ তোর গৌরী পিসির এই একটাই শাড়ি হয় ৷ ওই আমি যা দিতে পারি তাই শুধু পরে ! এতো দেরি করলে চলে ! কী বলব বল পিসি ! ফলসের মেয়েটা আজ কাল করতে করতে একেবারে সপ্তমী করে ফেলল ! কালার পছন্দ হল ? দেখো না ভাল করে ...


--ঘরে গিয়ে দেখব ভালো করে ৷ এখন উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না ৷ চা না খাস , দুটো টোস্ট বিস্কুট খা ৷ আজকাল টোস্ট বিস্কুটকে কী বলে জানিস ! ড্রাই কেক ৷ রঙ্গ কত ....লেড়ো আবার কেক ...


আতা উঠে পড়ল ৷ যাওয়ার পথে একটু সাদা তেল নিতে হবে ৷ অষ্টমীতে তারা ভাত খায় না ৷ কাল পরোটা হবে ৷ চলে যেতে গিয়েও থামল আতা ৷

সাইড ব্যাগের চেন টানল ...


-ও পিসি ৷ এই জিনিসটা একটু দেখো তো ! এখনো টাকা দিই নি ৷ তুমি ওকে করলে তবে ...


টেবিল ল্যাম্পটা হাতে নিল গৌরী ৷


- বাহ ! কত বড়  রে ! কোথায় লাগাবি ?


- কোথাও না ৷ দাদাকে দেব ভাইফোঁটায় ৷ দাদা যখন বারান্দায় সেতার বাজাবে তখন একটা টুলের ওপর বসিয়ে জ্বালিয়ে রাখবে ! ভালো হবে না পিসি ? বাজনা বাজাবার সময় দাদার মুখটা ভালো করে

দেখতে পাব ৷ একটা গিফট কাগজ এনেছি ৷ মুড়িয়ে দেবে ?


গৌরী দ্রুত হাতে ল্যাম্প প্যাক করে বলল -


মা  প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে থাকে তো বার কর ব্যাগ থেকে  ৷ তেল আমি দিয়ে দিচ্ছি ৷ আমারও লুচি ৷ তোর বাবাই চালু করেছে ৷ আর দোকানে যেতে হবে না  ৷ তেল নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি যা ৷

একগাদা খরচ করে টেবিল ল্যাম্প কিনে মরলি !

মা একটুও দেখে না ...


-আদ্ধেক নলিনীদিদি দেবে ৷ বাকি মাসীর দেওয়া পুজোর টাকা থেকে ...


বোতল টেবিলল্যাম্প নিয়ে গেট পেরোচ্ছে আতা ৷


-অন্ধকার ৷ মাটির দিকে তাকিয়ে চল ৷ রাস্তায় কি টেবিলল্যাম্প জ্বালাবি !


গৌরীর ঝাঁঝালো গলায় উদ্বেগ ৷


বাড়ির একটু দূরে ফণী পাকড়াল ৷ ননী হাসছে মিটিমিটি ৷ মুখ খোলার আগেই টেবিলল্যাম্প ছোঁ ৷


- কার জন্য আতা ? আমার না ননীর ?


-ইয়ার্কি করবি না ৷ দে ..ভেঙে যাবে বলছি ৷


ফণী লুকিয়ে গেছে রাজবাড়ির পাঁচিল টপকে ৷ এ বাড়ির শরিকরা ছড়িয়ে গেছে গয়া ,কাশি , হিউজটন ৷ তবে গতবছর থেকে উত্তরের চাতালে

খেলাধুলোর অধিকার পেয়েছে পাড়ার ছেলেমেয়েরা ৷ ননী ফণীর সঙ্গে কেশর বিল্টু ঝিমলি সবাই খেলে এখানে ৷ জায়গাটা পালা করে পরিষ্কার রাখে ৷ আজ ফণী আতার চাতাল ঝাঁটাবার ডেট ছিল ৷


কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে কোথায় লুকোল ফণী ! সাপ খোপ থাকলে ....!


আতা আর ননী চাতালে এল ৷

ফণীর সাড়া নেই ৷ আকাশ  দেখল আতা ! ওমা ! চাঁদ তো যে কে সেই ৷ সরু হয়ে আলো দিচ্ছে ৷ এখানে পৌঁছচ্ছে না কেন !


-- এই ফণী ৷ আয় না বেরিয়ে ৷ আমাদের ভয় করছে ৷


শক্ত করে ফণীর  দাদার  হাত চেপে ধরেছে আতা ৷ পেয়ারা আর পেঁপের গুঁড়িতে দড়ি

বেঁধে  টানটান নেট ৷


ওহ ! বড় গাছের পাতায় আটকে গেছে নেট ৷ তাই বলি ! আকাশের চাঁদ গেল কোথায় ! ননীদা তোর ভাই এত বকে ! তুই ওকে বকতে পারিস না ! ফণী কি তোর দাদা যে তুই ছোট ভাই সেজে থাকিস ! ডাক ওকে ...জোরে জোরে ডাক ..ধমক মার !


উম্মহ ...!


একদলা গরম চুমু আতার গালে ৷

শান্ত চোখে ননী ৷

এই মুহূর্তে ভাইকে খোঁজার তাড়া নেই ৷


আতা দেখতেই চাইল না ,চুমু দিল কে !

ইচ্ছে করছিল না আরকি !

 


বোন নেই বলে ভাইফোঁটার দিন চিন্ময়ের কোনো চাপ নেই ৷ বড়লোক শালাগুলো বোনটাকে ডেকে নেয় বাড়িতে ! আতা কতবার বলেছে মামাদের -

 

এবার ভাইফোঁটা আমাদের এখানে হোক না মামা ৷ আমি আর নলিনীদিদি তো দাদার জন্য  রান্না করিই ৷ তোমাদের জন্যও করব ৷ মা নাহয় সারাদিন তোমাদের সঙ্গে গল্প করবে ! আমরা তোমাদের পাত সাজিয়ে ডাকব একেবারে !


ফোনের ওপারে মামার হাসি পায় আতা ৷ আর যথারীতি ভোর হতে না হতে চান টান করে মা হাঁটা দেয় মামার বাড়ি ৷ আতা একটু দুঃখ পেলেও চিন্ময় হাঁফ ছাড়ে ৷ এ দিন সে  শুধু আতার ৷ মেয়ের পছন্দমতো বাজার করে ৷  মেয়ের কূটনো কাটায় ছুরি নিয়ে বসে যায় ৷ পিঁয়াজ সুধাময়ীর নাতনি

সহ্য করতে পারে না ৷ চিন্ময় চূড়ো করে পিঁয়াজ কেটে লাল করে ভেজে দেয় ৷ বাকি কিছু নলিনী কখনো বাড়ি থেকে আনে ৷ কখনো  এবাড়িতে এসে ফের গ্যাস জ্বালে ৷ চিন্ময়ের ছেলেটার খাওয়ার খুব জুত ৷ ভাইফোঁটায় দু বোন শুধু পরস্পরকে সারপ্রাইজ দিয়ে যায় ৷ কী

যে সারপ্রাইজের ঝোঁক এদের ৷ ফোনে মেনু ঠিক হয়ে গেল ! তারপরও নলিনী এসে টিফিনকৌটো

খুলে বলে -


এই দ্যাখ আতা ! আমড়া পোস্তর টক করেছি ৷ শুভেন্দুদার খুব পছন্দ ! তোর তো মনেই ছিল না !

কেমন সারপ্রাইজ দিলাম !


আতাও কম যায় না ৷ সঙ্গে সঙ্গে পিঁয়াজ দিয়ে পোস্তভাজা ঢেলে দেয় দাদার পাতে


আমারও আছে নলিনীদিদি ৷ আমারও পোস্ত সারপ্রাইজ !


চিন্ময় দুটোই পায় ৷ খাওয়ার শেষে জর্দা পান চিবোয় ৷ পানের দায়িত্ব নলিনীর ৷ নলিনীর পানে দামি জর্দা ভুরভুর করে ৷ নলিনীর বাবা প্রফেসর ৷ শুভেন্দুর খারাপ রেজাল্টের পর তিনি শুভেন্দুকে নিজের কলেজে ভর্তি করেছেন ৷


আজো পান চিবোতে চিবোতে ওঘরে নলিনী শুভেন্দুর গলা পেল ৷ কী নিয়ে যেন খুব হাসছে ওরা ! ছেলেমানুষের মতো তিনটে কিশোরের খেলায় ঢুকতে চাইল চিন্ময় !


ঘরে শুধু নলিনী আর শুভেন্দু ৷ নতুন একটা শার্ট

গায়ে ফেলে মাপছে নলিনী ৷


-কী গো শুভেন্দুদা ? আরেক সাইজ বড় নেব তাহলে ....


চেঞ্জ করলে ভালো হয় নলিনী ৷ এতো দামি ব্র্যান্ড ..

ঠিকঠাক সাইজ না হলে ...


--ওকে ডান ৷ চল বিকেলে দুজনে মিলে পাল্টে আনব ! আতা ...কই গেলি ...আরে টেবিলল্যাম্পের আদ্ধেক যা দেব বলেছিলাম দেব তো ...শোন এদিকে ...


নলিনী খুঁজছে আতাকে ৷ আরে পায়েসটা এবার দিতে হবে তো শুভেন্দুদাকে !


চিন্ময় দেখল ,খাটের একপাশে টেবিলল্যাম্প।মোড়ক খোলা হয়নি অবশ্য ! শুভেন্দু আরো  একবার জামার মাপ দিতে শুরু করেছে !



বিশুদা বিরক্ত হল -


দামের ট্যাগ খুলেছ কেন ? ট্যাগ খুললে  ফেরত হয় না জানো না !


-প্লিজ বিশুদা ৷  আমি তো টাকা চাইছি না ৷ ওই দামে তিনটে দোলানো ল্যাম্প কিনব ৷


আতার গলা ঝকঝকে ৷


বিশুর বিরক্তি কাটেনি -


ওতে কিন্তু বেশি পাওয়ারের বাল্ব খাটবে না ৷ আবার ফেরত দিতে আসবে না তো ?


-না ফাইনাল এবার ৷ তুমি বাল্ব গুলো ফিট করে দাও একেবারে ৷


তিনটে ঝোলানো ল্যাম্প নিয়ে বেরিয়ে এল আতা ৷ একটা লাগাবে পিছনের বারান্দায় ৷ ওদিকে কুয়ো আছে ৷ একটা এক্সট্রা আলো থাকা ভালো ৷ মা রাতের দিকে কুয়োর জলে একবার চান করবেই ৷


আরেকটা লাগাবে রাজবাড়ির চাতালে  ৷ শীত আসছে ৷ ওহ ! সকাল সন্ধে শুধু ব্যাটমিন্টন আর ব্যাটমিন্টন ৷ কী মজা !কীইই মজা ! ভাবতে গিয়ে ছোট্ট  ছোট্ট লাফ দিচ্ছে আতা ! আর  কেশর ফণী বিল্টুরা যা চালু , ঠিক পাশের বাজার থেকে লাইন টাইন টেনে ব্যাপারটা করে ফেলবে ৷ আর একটা বাবাকে দিয়ে দেবে ৷ বাবা ঠিক দিয়ে আসবে ৷ সবার  আগে তিনটে ল্যাম্পের সঙ্গে একটা সেলফি ৷ খিচিক ...!


ভাগে ব্যস্ত  সুধাময়ীর নাতনী ৷



Comments :0

Login to leave a comment