সঞ্চারী চট্টোপাধ্যায়
শ্রমিকের স্বার্থে আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এই কথা নিছক রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত বাক্যবন্ধ নয়, সংবিধান-নির্দেশিত এক মৌলিক অঙ্গীকার। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য নিয়ে ভারতের সংবিধান তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রেই রয়েছে শ্রমের মর্যাদা। সেই কারণেই সংবিধান প্রণেতারা শ্রমিক-সুরক্ষাকে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। রাষ্ট্রের অন্যতম সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। জীবনধারণযোগ্য মজুরি নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা, সামাজিক সুরক্ষা প্রদান, শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার রক্ষা এবং শ্রমের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা— এসবই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কারণ শ্রমিক শুধু উৎপাদনের উপাদান নন। তিনি রাষ্ট্রের একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক, যার জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা সমানভাবে মূল্যবান। সংবিধানের ৩৮, ৩৯, ৪১, ৪২, ৪৩ এবং ৪৩এ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে সামাজিক ন্যায়, জীবনধারণযোগ্য মজুরি, সুস্থ কাজের পরিবেশ, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা রয়েছে।
কিন্তু গত দেড় দশকে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের শ্রমনীতি যেন ঠিক বিপরীত পথেই এগিয়েছে। শ্রম আইন সংস্কারের নামে বহু ঐতিহাসিক অধিকার সঙ্কুচিত করা হয়েছে। স্থায়ী কর্মসংস্থানের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক, আউটসোর্সিং এবং প্রকল্পভিত্তিক নিয়োগকে নীতিগতভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এমনকি সেনাবাহিনীর মতো প্রতিষ্ঠানে ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্প চালু করে স্বল্পমেয়াদি নিয়োগকে স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা হয়েছে। ফলে এমন এক শ্রমবাজার তৈরি হয়েছে, যেখানে নিয়মিত কাজ আদায় করা যাবে, অথচ শ্রমিক হিসাবে স্বীকৃতি কিংবা আইনি সুরক্ষার দায় রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারবে। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাকেই ধীরে ধীরে নীতিতে পরিণত করা হয়েছে।
এই নীতির সবচেয়ে নির্মম শিকার দেশের প্রকল্প কর্মীরা। আশা, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকা, মিড ডে মিল কর্মী, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের চুক্তিভিত্তিক কর্মী, আইসিডিএস এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ কর্মী দেশের জনকল্যাণমূলক পরিষেবার প্রকৃত ভরকেন্দ্র। অথচ তাঁরা সরকারি কর্মচারী নন, আবার শ্রমিক হিসাবেও স্বীকৃত নন। এই দ্বৈত অবস্থান কিন্তু কোনও প্রশাসনিক ত্রুটি নয়। বরং রাষ্ট্রের সচেতন কৌশল। কারণ শ্রমিকের স্বীকৃতি দেওয়া মানেই ন্যূনতম মজুরি, পিএফ, গ্র্যাচুইটি, পেনশন, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, স্বাস্থ্যবিমা এবং চাকরির নিরাপত্তার মতো আইনি দায় রাষ্ট্রের কাঁধে এসে পড়বে। সরকারি কর্মী হিসাবে স্বীকার করলেও একইভাবে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়ানো যাবে না। তাই দায়িত্বের বোঝা ক্রমাগত বাড়লেও অধিকার থেকে তাঁদের বঞ্চিত রাখার পিছনে রাষ্ট্রের একটি স্পষ্ট স্বার্থ কাজ করে। প্রকল্প কর্মীদের সিংহভাগই মহিলা। শ্রমিকের প্রশ্নে নারী-পুরুষের আলাদা মূল্যায়ন হওয়া উচিত নয়, কারণ শ্রমের মর্যাদা লিঙ্গ নিরপেক্ষ। তবু এ কথা অনস্বীকার্য যে, মোদীর সরকার নারী শ্রমের অবমূল্যায়নকেই আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
পিরিয়াডিক লেবার ফোর্স সার্ভের তথ্য দেখিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের শ্রমবাজারে মহিলাদের অংশগ্রহণ উদ্বেগজনকভাবে কম। বিপুল সংখ্যক মহিলা শ্রম উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাঁদের কাজ হয় অদৃশ্য, নয়তো অবৈতনিক বা স্বল্পমূল্যের। প্রকল্প কর্মীদের অবস্থানও সেই বৈষম্যেরই বড় উদাহরণ। নারী শ্রমকে কম খরচে ব্যবহার করার যে অর্থনৈতিক মডেল আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, প্রকল্প কর্মীদের অবস্থান তারই আরেক নজির। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, হালে শুভেন্দু অধিকারীরাও মহিলাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে বিরাট বিরাট ভাষণ দেন। কিন্তু রাজ্যে রাজ্যে লক্ষ লক্ষ প্রকল্প কর্মীদের প্রতি রাষ্ট্রের এই মনোভাব প্রমাণ করে দেয়, ভারতীয় শ্রমনীতিতে নারী-শ্রম এখনও অধিকারসম্পন্ন শ্রম নয়, বরং সস্তায় খাটিয়ে নেওয়াই যেন সুবিধাজনক উপায়।
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রকল্প কর্মীদের কোনও খামতি নেই। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় কিংবা মহামারী—সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তাঁরা দেশের জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার বিস্তীর্ণ পরিকাঠামোকে সচল রাখেন। সংসদে কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ১৪ লক্ষ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র চালু রয়েছে। সেখানে কর্মরত ১৩ লক্ষেরও বেশি অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং বিপুল সংখ্যক সহায়িকা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রথম সারিতে রয়েছেন ১০ লক্ষেরও বেশি আশা কর্মী। তাঁদের ছাড়া মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুপুষ্টি, টিকাকরণ কিংবা প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মতো সরকারি কর্মসূচির বাস্তবায়ন কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু তাঁদের দায়িত্ব কেবল নির্দিষ্ট প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের খোঁজ রাখা, নবজাতকের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, টিকাকরণে সচেতনতা গড়ে তোলা, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু সহ নানা রোগ প্রতিরোধে প্রচার, রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ ও আপলোড করা— সবই তাঁদের দৈনন্দিন কাজ। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের দায়িত্বও একইভাবে বহুমাত্রিক—শিশুর পুষ্টি, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, গর্ভবতী ও প্রসূতিদের তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি জনগণনা, ভোটার তালিকা সংশোধন, সরকারি সমীক্ষা থেকে প্রশাসনিক নানা কাজও তাঁদেরই করতে হয়। মিড ডে মিল কর্মীরা প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীর খাবার রান্না ও পরিবেশন করার পাশাপাশি খাদ্যের গুণমান, মজুত ও হিসাবরক্ষণও সামলান। সাম্প্রতিক সময়ে আবাস যোজনা, আয়ুষ্মান ভারত, অন্নপূর্ণা যোজনা কিংবা ই-কেওয়াইসি— এসব প্রশাসনিক কাজও তাঁদের কাঁধেই চাপানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের সীমানা বহু আগেই অতিক্রম করেছে তাঁদের শ্রম। কিন্তু সেই শ্রমের মর্যাদা এখনও কাগজে-কলমে স্বীকৃতি পায়নি।
সংক্রমিতদের খোঁজ রাখা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরিষেবা নিশ্চিত করা, টিকাকরণ কর্মসূচিকে সফল করা কিংবা দুর্যোগের সময়ে প্রশাসনের হাত হিসাবে কাজ করা— কোনও দায়িত্ব থেকেই তাঁরা পিছিয়ে আসেননি। কিন্তু কর্তব্য পালনের এই নিষ্ঠার বিনিময়ে রাষ্ট্র তাঁদের শুধু সাম্মানিক দিয়েই দায় ঝেড়ে ফেলছে। শ্রমের স্বীকৃতি নয়, অধিকারের নিশ্চয়তা নয়। বরং কাজের চাপ প্রতি বছর আরও বেড়েছে। নতুন নতুন প্রকল্প, সমীক্ষা, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য আপলোড, ডিজিটাল মনিটরিং, একাধিক দপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্ব— সবই চাপানো হয়েছে তাঁদের কাঁধে। যে কাজের সঙ্গে স্বাস্থ্য, পুষ্টি বা শিশু কল্যাণের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই, সেই কাজও নির্বিকারভাবে করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ পারিশ্রমিক, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা আইনি মর্যাদার প্রশ্নে সরকারের উদাসীনতা এতটুকু কমেনি। চাপের ভার বহন করতে না পেরে বহু প্রকল্প কর্মী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু এই মৃত্যুরও কোনও সরকারি হিসাব নেই। শ্রমের মূল্য যেমন অস্বীকার করা হয়, তেমনই অস্বীকার করা হয় সেই শ্রমিকের যন্ত্রণা।
কোভিডের সময় গোটা দেশ দেখেছে এই কর্মীদের অপরিহার্য ভূমিকা। গ্রাম থেকে শহর, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মহানগর— বাড়ি বাড়ি স্বাস্থ্য সমীক্ষা, নিভৃতবাসে থাকা মানুষের খোঁজ, টিকাকরণে উদ্বুদ্ধ করা, সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতনতা গড়ে তোলা— সব ক্ষেত্রেই প্রথম সারিতে ছিলেন আশা, অঙ্গনওয়াড়ি এবং জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের কর্মীরা। তখন তাঁদের ‘করোনা যোদ্ধা’ বলে সম্মান জানানো হয়েছিল। সংসদ থেকে বিধানসভা— সব জায়গায় তাঁদের প্রশংসা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু অতিমারী কেটে যেতেই সেই প্রশংসা মিলিয়ে যায়। রাষ্ট্র আবার ফিরে যায় তার পুরানো অবস্থানে।
কেন্দ্রের তথ্যই বলছে, দেশে ১০ লক্ষেরও বেশি আশা কর্মী, প্রায় ১৩.৮ লক্ষ অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং ১২ লক্ষেরও বেশি অঙ্গনওয়াড়ি সহায়িকা কাজ করছেন। মিড ডে মিল কর্মীদের যুক্ত করলে এই কর্মীবাহিনীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষে পৌঁছায়। অর্থাৎ দেশের জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও প্রাথমিক শিক্ষার গোটা ভিত কার্যত দাঁড়িয়ে রয়েছে লক্ষ লক্ষ মহিলা কর্মীর উপরেই। অথচ তাঁদের অধিকাংশই ন্যূনতম মজুরি পান না। শ্রমিক হিসাবে স্বীকৃতি নেই, পেনশন নেই, পিএফ নেই, গ্র্যাচুইটি নেই, স্বাস্থ্যবিমার নিশ্চয়তাও নেই। জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবাগুলি যাঁদের কাঁধে নির্ভর করে, সেই কর্মীরাই সামাজিক সুরক্ষার পরিধির বাইরে রয়ে গিয়েছেন।
এখানেই রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের প্রশ্নটি সবচেয়ে তীব্র হয়ে ওঠে। প্রতি বছর বাজেটে স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু উন্নয়ন কিংবা পুষ্টি প্রকল্পে বরাদ্দের অঙ্ক বাড়ানোর দাবি করা হয়। কিন্তু সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাঁদের উপর, তাঁদের সাম্মানিক সেই অনুপাতে বাড়ে না। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় না বাড়ায় তাঁদের প্রকৃত মজুরি ক্রমাগত কমতে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। তৃণমূল কংগ্রেসের দেড় দশকের শাসনকালে প্রকল্প কর্মীরা বারবার আন্দোলনে নেমেছেন। কখনও পাঁচশো, কখনও সাতশো, কখনও এক হাজার টাকা করে সাম্মানিক বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তাঁদের মূল দাবি— শ্রমিকের স্বীকৃতি, ন্যূনতম ২৬ হাজার টাকা মাসিক বেতন, পেনশন, ইপিএফ, ইএসআই, নিয়মিত ছুটি এবং সামাজিক সুরক্ষা— আজও অধরাই। বহু প্রতিশ্রুতি মিলেছে, কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রশ্নে সরকার কখনওই আন্তরিকতার পরিচয় দেয়নি।
আবার বিজেপি ক্ষমতায় এসে ভিন্ন কোনও দৃষ্টান্ত দেখাতে পারেনি। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার, আয়ুষ্মান ভারত সহ একাধিক সরকারি প্রকল্পের আবেদনপত্র বিলি, তথ্য সংগ্রহ, প্রচার কিংবা ই-কেওয়াইসি’র মতো অতিরিক্ত কাজ প্রকল্প কর্মীদের উপর চাপানো হয়েছে। অথচ নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, প্রতিটি মহিলাই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের আর্থিক সহায়তা পাবেন। পরে জানানো হলো, প্রকল্প কর্মীরা যেহেতু সরকারের কাছ থেকে সাম্মানিক পান, তাই তাঁরা এই প্রকল্পের আওতায় পড়বেন না। অর্থাৎ সরকারি কর্মচারী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না, আবার সাধারণ নাগরিকের জন্য ঘোষিত প্রকল্পের সুবিধাও মিলবে না। এই দ্বিচারিতা নিছক প্রশাসনিক অসঙ্গতি নয়। শ্রমের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিরই নগ্ন প্রকাশ।
প্রকল্প কর্মীদের সঙ্গে এই দ্বিচারিতার সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রভাব পড়ছে দেশের শিশুদের উপর। মিড ডে মিল প্রকল্পের রান্নার দায়িত্ব ধাপে ধাপে ইসকন-পরিচালিত অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশনের মতো কেন্দ্রীভূত সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ তারই প্রমাণ। যে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, অপুষ্টি কমানো এবং স্কুলছুট রোধ করা, সেই প্রকল্পকেই আজ আদর্শগত পরীক্ষাগারে পরিণত করা হচ্ছে। শিশু কী খাবে, তার খাদ্যতালিকায় ডিম থাকবে কি থাকবে না, আমিষ না নিরামিষ— এসব সিদ্ধান্তও ক্রমশ পুষ্টিবিজ্ঞান বা স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতে নয়, ধর্মীয় বিশ্বাসের নিরিখে নির্ধারিত হচ্ছে। রাষ্ট্রের কাজ ছিল শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, কিন্তু সেই জায়গায় খাদ্যাভ্যাসের উপর ধর্মীয় প্রভাব চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক।
এরই পাশাপাশি রান্নার কাজ এভাবে ধর্মীয় সংগঠনের সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার অর্থ হাজার হাজার মিড ডে মিল কর্মীর জীবিকা অনিশ্চিত করে তোলা। বহু রাজ্যে অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত রান্নার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরে খাবারের মান, পরিবেশনে দেরি, স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস উপেক্ষা এবং ডিমের মতো পুষ্টিকর খাদ্য বাদ দেওয়া নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের আপত্তি উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, শিশুদের পুষ্টি কি ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী নির্ধারিত হবে? মিড ডে মিল প্রকল্প কোনও ধর্মীয় সংগঠনের আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্র হতে পারে না। এই প্রকল্পগুলিকে যদি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু লক্ষ লক্ষ প্রকল্প কর্মী নন, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও।
Scheme Workers ASHA ANGANWADI
শ্রমের স্বীকৃতি নেই, শোষণই কাঠামো
×
Comments :0