কৌশিক দাম
উত্তরবঙ্গের চা শিল্পে ফের একবার গভীর সংকটের কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। কাঁচা চা পাতা বিক্রি এবং সংগ্রহকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার জেরে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র চা চাষী চরম আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে উত্তরবঙ্গের কয়েক লক্ষ চা শ্রমিকের কর্মসংস্থানও খাদের কিনারায় এসে ঠেকেছে।
ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গের চা বলয়ে কাঁচা চা পাতার দাম ৩০ টাকা বা তার বেশি থেকে কমে ২৫-২৭ টাকায় নেমে এসেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে পাতা অবিক্রিত থেকে দাম ১৩-১৪ টাকায় ঠেকতে পারে, এমনকি চাষীরা সম্পূর্ণ মূল্য থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন বলে তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা এবং চায়ের গুণগত মান বজায় রাখতে ‘উত্তরবঙ্গ চা উৎপাদক সমিতি’র গত ২৪ জুলাইয়ের সভায় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৭ জুলাই অর্থাৎ আজ থেকে কোনো ‘বট লিফ ফ্যাক্টরি’ এনএবিএল বা চা বোর্ড অনুমোদিত ল্যাবের ‘এমআরএল কমপ্লায়েন্স টেস্ট রিপোর্ট’ ছাড়া কাঁচা পাতা গ্রহণ করবে না। কিন্তু এই নির্দেশিকা কার্যকর হতেই নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। উত্তরবঙ্গের চা উৎপাদনকারী এলাকায় এখনও পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার বা সহজলভ্য ল্যাব টেস্টের পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ময়নাগুড়ি বা ধূপগুড়ির মতো গ্রামীণ এলাকা থেকে ল্যাব টেস্টের জন্য শিলিগুড়িতে যাতায়াত করা ক্ষুদ্র চাষীদের পক্ষে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। পরিকাঠামো প্রস্তুত না করেই হঠাৎ এই নিয়ম চালু করায় চাষীরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। কারখানাগুলি পাতা না নেওয়ায় নামমাত্র দামে তা বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চা বলয় জুড়ে উদ্বেগ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এদিন মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গ সফরে এসেছিলেন। তার উপস্থিতিতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষুদ্র চা চাষীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। চাষীদের আশা ছিল, মুখ্যমন্ত্রী তাদের কথা ভেবে কিছু বলবেন। কিন্ত মুখ্যমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করেননি।
রাজগঞ্জের ক্ষুদ্র চা চাষী প্রকাশ রায় ক্ষোভপ্রকাশ করে জানান, এই সংকটের নেপথ্যে টি বোর্ড এবং রাজ্য সরকারের চরম নিষ্ক্রিয়তা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র চাষীদের স্বার্থ রক্ষায় কোনো কার্যকর আইনি কাঠামো বা কঠোর নজরদারি নেই। ক্ষতিকারক রাসায়নিকযুক্ত পাতা উৎপাদন রোধ এবং অবৈধ কীটনাশক ও ওষুধের দোকানগুলির বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে কারখানা মালিকদের স্বার্থ রক্ষিত হলেও সম্পূর্ণ ক্ষতির বোঝা টানতে হচ্ছে ক্ষুদ্র চা চাষীদের। ধূপগুড়ির ক্ষুদ্র চা চাষী সুবল রায়ের দাবি, প্ল্যান্ট বা কারখানাগুলির ভেতরেই যদি ল্যাবের ব্যবস্থা থাকত, তবে এই ভোগান্তি অনেকটাই লাঘব হতো।
চা পাতা বিক্রি বন্ধ বা ব্যাহত হলে চাষীরা যেমন চরম আর্থিক ধ্বংসের মুখে পড়বেন, তেমনই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে লক্ষাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী চা শ্রমিকের রুটি-রুজির ওপর। বিশেষ করে, বর্তমানে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গ সফরে থাকা অবস্থাতেই এমন সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষুদ্র চা চাষী মহলে ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত এই বিশাল শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এবং বাজারে অবৈধ ওষুধের দৌরাত্ম্য রুখতে অবিলম্বে সরকারি হস্তক্ষেপ ও সুনির্দিষ্ট পরিকাঠামো গড়ে তোলার দাবি জোরালো হচ্ছে।
কৃষক সভার জলপাইগুড়ি জেলা কমিটির সদস্য ও ক্ষুদ্র চা চাষি খরেন্দ্র নাথ রায় জানিয়েছেন যে, অনেক শিক্ষিত যুবক অন্য কোনো উপায় না পেয়ে আশায় বুক বেঁধে চা চাষে নেমেছিলেন। কিন্তু কাঁচা পাতার দাম অতিরিক্ত কমে যাওয়ায় তাঁরা আজ সার ও কীটনাশকের দোকান এবং পাতা ব্যবসায়ীদের কাছে লক্ষাধিক টাকার ঋণে জর্জরিত। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা টি-বোর্ড এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব দর্শক। তারা কোনো ফ্যাক্টরিতে তদন্ত করছে না কিংবা গুণমান অনুযায়ী সঠিক দাম নির্ধারণের ব্যবস্থা করছে না। টি-বোর্ড কার্যত নিজেদের সমস্ত দায়িত্ব কারখানা মালিকদের হাতে তুলে দিয়েছে। পাশাপাশি, রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ক্ষুদ্র চা চাষিদের স্বার্থ রক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা আইনি নজরদারি দেখা যাচ্ছে না।
উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির এই মেরুদণ্ড ও লক্ষাধিক চা শ্রমিকের রুটি-রুজির সঙ্গে জড়িত ক্ষুদ্র চা শিল্পের এই গভীর সংকটে অবিলম্বে সরকারি হস্তক্ষেপ, কারখানার ভেতরে ল্যাব টেস্টের সুনির্দিষ্ট পরিকাঠামো তৈরি এবং চাষিদের পাতার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সারা ভারত কৃষক সভা। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনের হুশিয়ারি দিয়েছেন কৃষক সভার নেতৃত্ব।
Comments :0